আমরা তাহলে ঘোড়া নিয়ে বের হই এবং আমাদের পক্ষে আমাদের সৈন্যবাহিনীর যতবেশী জনকে সম্ভব পুনরায় নতুন করে দলভুক্ত করি।
২.৪ ভাইয়ে ভাইয়ে রেষারেষি
০৯. ভাইয়ে ভাইয়ে রেষারেষি
উষ্ণ, নিথর হয়ে থাকা বাতাস, ইতিমধ্যে আর্দ্রতায় ভারী হয়ে উঠেছে যা সপ্তাহখানেকের ভিতরেই আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়বে, অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তার পরনের ইস্পাতের শিকল দিয়ে তৈরী বর্ম আর মিহি সুতির কাপড় দিয়ে তৈরী জোব্বার নীচে, হুমায়ুনের পিঠ বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। তাঁর মুখাবয়বেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। অসহিষ্ণুভাবে সে একটা রুমাল দিয়ে মুখটা মুছতে গিয়ে টের পায়ে নোনতা বিন্দুগুলো প্রায় সাথে সাথে আবার পূর্বের আকৃতি লাভ করেছে। সে পুতবেগে যখন, সামনে দেহরক্ষী আর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের একটা দল তাঁর অনুগত কমলা রঙের আলখাল্লা পরিহিত রাজপুতরা সেখানে রয়েছে তাঁর পেছনে পেছনে আসছে, আগ্রা অভিমুখে ফিরে চলেছে তাঁর তাম্রবর্ণের ঘোড়াটার খুরের ছন্দোবদ্ধ বোলে, মনে হয় যেন তিক্ত একটা বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। পরাজয় আর ব্যর্থতা। পরাজয় আর ব্যর্থতা। শব্দ দুটো তার মাথার ভিতরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে কিন্তু তারপরেও যা ঘটে গিয়েছে সেই পুরো। বিষয়টা তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
সে সৈন্যদের যে দলকে পুনরায় সমবেত করার আশা করেছিল তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছে। কেউ কেউ তাদের নিজ নিজ প্রদেশে ফিরে গিয়েছে কিন্তু বেশীরভাগই শেরশাহের অগ্রগামী বাহিনীর সামনে থেকে পালিয়ে গিয়েছে। তারা বিশ্বাস করে যে এক অন্ত্যজ ঘোড়ার কারবারীর ছেলে মোগলদের ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম… যে কোনো দৈহিক ক্ষতের চেয়েও এর বিশালতা অনেকবেশী যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু তারচেয়েও মারাত্মক এই ভাবনাটা যে যুদ্ধক্ষেত্রে সে অমিত সাহসের সাথে লড়াই করা সত্ত্বেও সে এমন একটা ব্যাপার মেনে নিয়েছে।
তার সৌভাগ্য এখন কোথায় গেল? পানিপথে, টসটসে পাকা একটা ডালিমের মতো হিন্দুস্তান মোগলদের হাতে এসে ধরা দিয়েছিল। বাহাদুর শাহ আর লোদি রাজ্যাভিযোগীকে হেলাফেলা করে মাত দেবার পরে তাঁর বুঝি ধারণা হয়েছিল মোগল সাম্রাজ্য অজেয়। সে সম্ভবত তাঁর নতুন সাম্রাজ্যের প্রকৃতি এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি- বিদ্রোহ এই অঞ্চলের সহজাত বৈশিষ্ট্য। সে যত অভ্যুত্থানই দমন করুক, যত বিদ্রোহীকেই কবন্ধ করুক, তারপরেও আবারও বিদ্রোহের সম্ভাবনা ঠিকই রয়ে যাবে। শেরশাহের সাফল্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, শক্ররা এখন দক্ষিণ আর পশ্চিমদিক থেকে আর সেই সাথে পূর্বদিক থেকেও হুমকি দিতে আরম্ভ করেছে।
হুমায়ুন নিজের হতাশায় বিমূঢ় হয়ে তার দস্তানা পরিহিত হাত দিয়ে এতোই জোরে তার ঘোড়ার পর্যানের সামনের দিকে উঁচু হয়ে থাকা বাঁকানো অংশে আঘাত করে যে, ঘোড়াটা ভড়কে গিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে আর চিহি শব্দ করে বেমক্কা একদিকে দৌড়াতে শুরু করে যে আরেকটু হলে সে নিজেই ঘোড়া থেকে পড়ে যেত। হাঁটু দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে সে জন্তুটাকে বশে আনে, তারপরে লাগামে ঢিল দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে এবং জন্তুটার ঘামে ভেজা গলায় আলতো চাপড় দিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করে। সে মনে মনে ভাবে, যাই হোক, ভাগ্য সহায় থাকলে রাতের আগেই সে আর তার সাথের অগ্রবর্তী দলটা আগ্রা পৌঁছে যাবে। তাঁর অবশিষ্ট সৈন্যসামন্তের যদিও কামানবাহী শকট, মালবাহী গাড়ি, আর হাজারের উপরে ভারবাহী পশুর দল- আরো এক সপ্তাহ বা হয়তো আরো বেশী দিন লাগবে শহরে পৌঁছাতে, পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করার জন্য তাঁর হাতে খুব একটা বেশী সময় নেই। তার গুপ্তদূতদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেরশাহ তাঁর অগ্রযাত্রা স্থগিত রেখেছেন, অন্তত সাময়িকভাবে হলেও, কনৌজেই তিনি অবস্থান করছেন। তিনিও সম্ভবত রসদপত্রের মজুদ মিলিয়ে দেখছেন…
বস্ততপক্ষে মধ্যরাতের অনেক পরে, যমুনার পাড় বরাবর আগ্রার অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়কের উপর দিয়ে হুমায়ুনের পরিশ্রান্ত ঘোড়াটা তাঁকে নিয়ে আগ্রা দূর্গের দিকে উঠে আসে। দূর্গের মূল তোরণদ্বারের উপরে রক্ষিত নাকাড়াগুলো রাতের আবহে গমগম করে উঠতে, দূর্গপ্রাকারের উপরে মশালদানিতে রাখা জ্বলন্ত মশালের দপদপ করতে থাকা কমলা আলোর মাঝে অশ্বারূঢ় হয়ে সে খাড়াভাবে দূর্গ অভিমুখে উঠে যাওয়া পথটা দিয়ে সোজা ভিতরের প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হয়। হুমায়ুন পরিশ্রান্ত অবস্থায় ঘোড়ার পর্যান থেকে নীচে নেমে আসতে একজন সহিস দৌড়ে এসে তার হাত থেকে ঘোড়ার লাগামটা নিয়ে নেয়।
সুলতান। কালো আলখাল্লায় মোড়া একটা অবয়ব সামনের দিকে এগিয়ে আসে। অবয়বটা আরো কাছে আসতে, সে তার নানাজান বাইসানগারকে চিনতে পারে। স্বাভাবিকভাবে বেশ সবল, এমনকি বলিষ্ঠ, তাঁর চোখেমুখে দুশ্চিন্তার বলিরেখা দেখা যায়, তাঁর বাহাত্তর বছর বয়সে এই প্রথম সবাই তার এই চেহারা দেখছে এবং তাঁর দিকে এক পলক তাকিয়েই হুমায়ুন সাথে সতর্ক হয়ে উঠে যে অপরিজ্ঞেয় আর অনাকাঙ্খিত কিছু একটা ঘটে গেছে।
কি ব্যাপার? কি হয়েছে?
আপনার আম্মিজান অসুস্থ। গত ছয় সপ্তাহ ধরে তিনি তাঁর বুকে একটা ব্যাথা অনুভব করছিলেন, এতোটাই তীব্র তাঁর মাত্রা যে কেবলমাত্র আফিম দিয়েই তাঁর কষ্টের খানিকটা উপশম ঘটতো। হাকিমেরা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল তার ব্যাপারে তাঁদের কিছুই করার নেই। আমি আপনার কাছে বার্তাবাহক প্রেরণ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু তিনিই আমাকে নিষেধ করেছেন সামরিক অভিযানের সময় আপনার মনোযোগ ভিন্নমুখী করা আমার উচিত হবে না…কিন্তু আমি এটাই জানতাম আপনাকে এক পলক দেখার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে আছেন। এই একটা আকাঙ্খাই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল…
