সুলতান, আমরা তূর্যবাদন শুনেছি, শিলাস্তরের উল্লম্ব উপরিতল থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। হুমায়ুন উপরের দিকে তাকায়। তার লোকদের কয়েকজন তাঁদের মুখাবয়বের বৈশিষ্ট্য, এবং তাদের পরণের কমলা রঙের পোষাকের রঙ আর ছাট দেখে বোঝা যায় তাঁরা তাঁর অনুগত রাজপুত রাজার সৈন্য- শিলাস্তরের উপরিভাগে পৌঁছাতে সফল হয়েছে এবং কিনারা দিয়ে এখন নীচের দিকে উঁকি দিচ্ছে। হুমায়ুন যখন পুনরায় তাঁর আক্রমণকারীর মুখোমুখি হবার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। তার মনে হয় শিলাস্তরের নিম্নভাগে যারা আটকা পড়েছিল তাঁদের ভিতরে কেবল সে একাই বেঁচে আছে- রাজপুত বাহিনীর একজন সৈন্য কালো শরযষ্টিযুক্ত একটা বাণ ছুঁড়ে মারতে শেরশাহের একজন্য অশ্বারোহীর ঘোড়া মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরবর্তী তীরটা আরেকজন যোদ্ধার পায়ে বিদ্ধ হয়। হুমায়ুনকে আক্রমণকারী লোকগুলো এবার নিজেদের গুটিয়ে নেয় যেন তারা তাদের পরবর্তী করণীয় সম্বন্ধে নিজেদের ভিতরে আলোচনা করবে। তারা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত সেই কয়েক সেকেণ্ডের ভিতরে রাজপূত তীরন্দাজ নিজের মাথার কমলা রঙের পাগড়ি খুলে ফেলে। সে কাপড়ের টুকরোটার একটা প্রান্ত কাপড়টা প্রায় দশফিট লম্বা হবে শিলাস্তরের কিনারা থেকে নীচের দিকে ছুঁড়ে দেয়, কাপড়টা হুমায়ুনের মাথার ফিট খানেক উপরে এসে শেষ হয়, যেখানে এটা বাতাসে মৃদুমন্দ দুলতে থাক।
সুলতান আমার পাগড়ির কাপড়টা শক্ত করে আকড়ে ধরেন। আমি আপনাকে নিরাপদ স্থানে টেনে তুলে আনব।
হুমায়ুন নিজের চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখে এবং ইতস্তত করে। বাবা ইয়াসভালো এখনও খাড়া শিলাস্তরের যেখানে আহত হয়েছিলেন সেখানেই শুয়ে আছেন। খোঁচা খোঁচা ধুসর চুলযুক্ত তার শিরোস্ত্রাণবিহীন মাথা এই মুহূর্তে বুকের উপরে ঝুঁকে আছে এবং এখনও তার নাক আর ঠোঁটের কিনারা দিয়ে টপটপ করে রক্ত তার বুকের কাছে বর্মে চুঁইয়ে পড়ছে। তাঁর হাত দুটো দেহের দুপাশে পড়ে আছে কিন্তু তার দুই পা দুদিকে ছড়ান এবং তলপেট থেকে এখনও বর্শার ফলাটা বের হয়ে আসে। তিনি নিশ্চিতভাবেই মারা গেছেন এবং হুমায়ুন তার অন্য কোনো লোকদের ভিতরে প্রাণের স্পন্দন দেখতে পায় না।
হুমায়ুন বুঝতে পারে, তার আক্রমণকারীরা যেকোনো মুহূর্তে আবার কাছে এগিয়ে আসতে চেষ্টা করবে তাকে শেষ করে দেবার জন্য। রাজবংশ এবং নিয়তি উভয়ের প্রতি তাঁর দায়িত্ব হল যেকোনো মূল্যে নিজেকে রক্ষা করা। হাতবদল করে সে আলমগীর বামহাতে ধরে এবং ডানহাত উপরে তুলে কমলা রঙের পাগড়ির কাপড়টা শক্ত করে আকড়ে ধরে। সে সাথে সাথে টের পায় যে কাপড়টা টানটান হয়ে উঠেছে এবং সে যখন পাহাড়ী শিলার খাড়া উপরিভাগ বেয়ে আরোহন থাকে তখন বাড়তি প্রণোদনা আনয়নের জন্য সে নিজেও উঠতে আরম্ভ করে। তাঁর আক্রমণকারীরা, এতোক্ষণে বুঝতে পারে যে সে এখনই পালিয়ে যাবে, তাঁর দিকে হুড়মুড় করে ছুটে আসে।
হুমায়ুন বেকায়দা ভঙ্গিতে তাঁদের একেবারে সামনের জনকে দেখে এবং পুনরায় উঠে বসার জন্য পায়তারা শুরু করে। তাকে বিস্মিত হতে দেখে সে চমকে উঠে।
আলমগীরের বা বামহাতে ধরে হুমায়ুন বেকায়দা ভঙ্গিকে তাদের একেবারে সামনে আঘাত করে কিন্তু আঘাতটা করার উদ্দেশ্যে সফল হয়। সে উপরে দিকে তাকিয়ে থাকার সময় সে আরেকটু হলেই তাঁদের সৈন্যরা দুদলে ভাগ হয়ে গিয়েছে এবং নিজের বাসায় ধারাল অস্ত্র দিয়ে কিছু করার আগে সবকিছু ভালো করে ধুয়ে নেয়া উচিত। সহসা তার আক্রমণকারীরা বুঝতে পারে সে একটু পরেই পালিয়ে যাবে, তারা তাঁর দিকে মরিয়া হয়ে ছুটে আসে।
হুমায়ুন বামহাতে ধরা আলমগীর দিয়ে বেকায়দা ভঙ্গিতে আন্দোলিত করতে থাকে এবং ধারাল ফলা দিয়ে মানুষটার কপালে হয়ত কিছু আঁকা যাবে এবং হুমায়ুন উপরের দিকে তাকালে সে নির্বিকার ভাবে ত্বকের প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটা অংশ দেখতে পায়, যেখান থেকে তার চোখে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে। একই সাথে রাজপূত লোকটা নিজের রণকুঠার পরবর্তী আক্রমণকারীকে ছুঁড়ে মারলে হুমায়ুন টের পায় তার আশেপাশের বাতাস নড়ে উঠেছে এবং কুঠারটা লোকটার বাহুর উপরিভাড়ে গেঁথে যায় এবং সেও পিছনের দিকে উল্টে পড়ে যায়। তৃতীয় আক্রমণকারী মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে এবং ইতস্তত করার কারণে হুমায়ুন সুযোগ পেয়ে দ্রুত দেয়াল বেয়ে উঠতে থাকে এবং কিনারা থেকে নিজেকে টেনে উপরে তুলে এবং শিলাস্তরে উপরে উঠে আসে। সে উত্তেজনার কারণে খেয়ালই করে না তার ডানহাতের উপরিভাগ আর কব্জির ক্ষতস্থানের মুখ খুলে গেছে যখন সে নিজেকে টেনে টেনে উপরে তুলে এনেছে এবং এখন তুমূল বৃষ্টি হচ্ছে।
সুলতান। রাজপুত যে লোকটা পাগড়ির কাপড় নীচে ছুঁড়ে দিয়েছিল সে হুমায়ুনকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করার ফাঁকে সনির্বন্ধ কণ্ঠে কথা বলতে থাকে। আমরা আপনার জন্য একটা নতুন ঘোড়া নিয়ে এসেছি। আপনার সৈন্যরা সবজায়গা থেকে পিছু হটছে। আপনি যদি এখনই এখান থেকে চলে না যান তাহলে শক্রর হাতে ধরা পড়বেন বা মারা যাবেন।
চারপাশে তাকিয়ে হুমায়ুন বুঝতে পারে যে তার সামনে আসলেই দুটো পথ খোলা আছে- আরেকদিন লড়াই করার জন্য এখন পশ্চাদপসারণ করা বা যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করা। তার যোদ্ধার মানসিকতার কাছে শেষের পথটা যতই আবেদনপূর্ণ মনে হয়, সে অনুভব করে যে আকাঙ্খ আর বেঁচে থাকার অভিলাষ এখনও তার ভিতরে তীব্রভাবে প্রজ্জ্বলিত রয়েছে এবং নিয়তি তাঁর সৌভাগ্যবান সন্তানের জন্য ভবিষ্যতের গর্ভে ভালো কিছু জমিয়ে রেখেছেন সাহসী কিন্তু নিষ্ফল মৃত্যুর বদলে। তাঁকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।
