বাবা ইয়াসভালো আর হুমায়ুনের সাথের মাত্র নয়জন তোক এখন বেঁচে আছে এবং তাঁদের মধ্যে দুইজনের আবার কোনো ঘোড়া নেই এবং আরেকজন মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। হুমায়ুন আর তাঁর সৈন্যরা যখন শৈলশিরার পার্শ্বদেশ থেকে মাত্র কয়েকগজ দূরে অবস্থান করছে, বেগুনী পাগড়ি পরিহিত আধিকারিক তখন শেরশাহের অশ্বারোহী যোদ্ধাদের চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করার জন্য ইশারা করে। শৈলশিরার এই স্থানটা প্রায় বিশ ফিট উঁচু এবং প্রায় খাড়াভাবে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে, স্পষ্টতই ঘোড়া নিয়ে সেখানে আরোহন করাটা অসম্ভব এবং খালি হাতে দেয়াল বেয়ে উঠার মতো কোনো রাস্তা চোখে পড়ে না।
বাবা ইয়াসভালের সঙ্গের নয়জন লোকের মধ্যে সদ্য কৈশোর অতিক্রম করা একজন তূর্যবাদক রয়েছে, যার মসৃণ গালে এখনও নাপিতের ক্ষুর পড়েনি। তাঁর বাদ্যযন্ত্র এখনও তার পিঠের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। বাবা ইয়াসভালো তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে তোমার সঙ্গে থাকা তূর্য এবার বাজাও যাতে আমরা বাইরে থেকে সাহায্য পেতে পারি। সে যখন তূর্যধ্বনি করবে তোমরা বাকিরা তখন তাঁকে আগলে রাখবে। তূর্যবাদক ছেলেটা তাঁর পিঠ থেকে তিন ফিট লম্বা তূর্যটা খুলে হাতে নেয় এবং সেটা তার ঠোঁটের কাছে ধরে। প্রথমে অবশ্য কোনো শব্দ হয় না সদ্য যুবা ছেলেটা তখন চোখে মুখে উদ্বেগ আর আতঙ্ক নিয়ে বাবা ইয়াসভালের দিকে তাকায়।
বাছা, শান্ত হও, বাবা ইয়াসভালো অভয় দেয়ার সুরে বলে। যুদ্ধের উত্তেজনা আর ভয়ে তোমার মুখ শুকিয়ে গেছে। কেশে গলাটা একটু খাকরে নিয়ে জীহ্বা দিয়ে ঠোঁটটা একটু ভিজিয়ে নাও।
যুবক ছেলেটা অনুগত ভঙ্গিতে কাশে এবং পুনরায় চেষ্টা করার আগে জীহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। এইবার ভূর্যের পিতলের তৈরী মুখ থেকে উচ্চনাদে শব্দ ধ্বনিত হয়- হুমায়ুনের যোদ্ধাদের পুনরায় একত্রিত হবার আহ্বান।
আবার বাজাও বাছা, এবং তারপরে আবার।
তরুণ তূর্যবাদককে রক্ষা করতে গিয়ে হুমায়ুনের তিনজন অশ্বারোহী বীরের মতো মৃত্যুবরণ করার পরে, বেগুনী পাগড়ি পরিহিত মূর্তিমান ব্রাস হয়ে উঠা সেই আধিকারিক সবাইকে পাস কাটিয়ে সহসা নিজের কালো ঘোড়াটা নিয়ে তূর্যবাদকের দিকে এগিয়ে আসে এবং তার হাতের লম্বা বর্শাটা দিয়ে ছেলেটার ডান বাহুমূলে, ঠোঁটের কাছে পিতলের তৈরী ভারী তূর্যটা ধরে থাকার কারণে অরক্ষিত, আঘাত করে তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে ফেলে দেয়। সে মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় তার হন্তারকের বর্শার আরেকটা আঘাতে মারা যায়।
হুমায়ুন, শেরশাহের আরেকজন অশ্বারোহী যোদ্ধাকে অবশিষ্ট দুজন লোকের একজনের দিকে, যারা মাটিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এগিয়ে যেতে দেখে তার নিজের ঘোড়া নিয়ে হন্তারকের আক্রমণ প্রতিহত করতে এগিয়ে যায়, শত্রুর নিশানা লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়া আটকে দেয়। শত্রুপক্ষের লোকটা তার ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে টেনে ধরে হুমায়ুনকে পাশ কাটিয়ে যাবার জন্য নিজের বাহনকে পরিচালিত করতে চেষ্টা করতে, হুমায়ুন তাঁর কব্জিতে এক কোপ দিয়ে একটা হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে লোকটা ঘোড়ার উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং বিশৃঙ্খলার ভিতরে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। হুমায়ুন হাত বাড়িয়ে দিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে নিজের ঘোড়ার উপরে টেনে তুলে নিজের পিছনে বসিয়ে দেয়। কিন্তু সে যখন লোকটাকে টেনে তুলতে ব্যস্ত তখন অজ্ঞাতনামা হন্তারকের নিক্ষিপ্ত বর্শা হতভাগ্য সেই সৈনিকের বুক ভেদ করে যায় এবং আরেকটা বর্শা এসে হুমায়ুনের ঘোড়ার গলায় বিদ্ধ হয়। বিশাল ঘোড়াটা একবার টলমল করে উঠে তারপরে হুড়মুড় করে মাটিতে আছড়ে পড়ে, ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে।
হুমায়ুন তার পর্যান থেক পিছলে নেমে আসে এবং বেগুনী পাগড়ি তাকে আক্রমণ করার জন্য পাগলের মতো ঘোড়ার পাজরে গুতো দেয়া শুরু করলে সে শৈলশিলার খাড়া দেয়ালের দিকে দৌড়াতে শুরু করে এবং অশ্বারোহীর মারাত্মক নিশানা ব্যর্থ করতে ডানে-বামে আকস্মিক বাকা-চোরা পথে দৌড়াতে থাকে। শৈলশিরার পাথুরে দেয়ালের কাছাকাছি পৌঁছাবার পরে, হুমায়ুন বুঝতে পারে আসলেই দেয়ালটা বেয়ে উপরে উঠা সম্ভব না, বিশেষ করে পেছনে খুব কাছে থেকে যদি লম্বা একটা বর্শা নিয়ে কোনো হন্তারক ধাওয়া করতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে হুমায়ুন এবার আক্রমণকারীর মুখোমুখি হয়, তাঁর ডানহাতে আলমগীর আর বামহাতে কোমরের পরিকর থেকে বের করে আনা প্রায় ফুটখানেক লম্বা করাতের মতো খাজকাটা ফলাবিশিষ্ট একটা খঞ্জর। সে তার পায়ের গোড়ালীর উপরে ভর দিয়ে আবর্তিত হতে থাকে যাতে করে সে এই পথ দিয়ে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে দৌড়াতে পারে, এবং হুমায়ুন তাঁকে ধাওয়া করা আধিকারিক কখন আক্রমণ করবে সেজন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
আধিকারিক লোকটা কয়েক সেকেণ্ড পরেই আক্রমণ করে, তার হাতের বর্শার সূচালো অগ্রভাগ হুমায়ুনের দিকে তাক করা সে একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপরে লাফ দিয়ে একপাশে সরে এসে বর্শার ফলাটা এড়িয়ে যায়। আক্রমণ ব্যর্থ হতে লোকটা একপাশে সরে গিয়ে তারপর পুনরায় আক্রমণ করার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। আক্রমণকারী যখন প্রস্তুত হচ্ছে, বাবা ইয়াসভালো- এখন তারও ঘোড়া নেই এবং মুখে তরবারির আঘাতে সৃষ্ট একটা গভীর ক্ষত থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে- দৌড়ে হুমায়ুনের সামনে আসে এবং আধিকারিক আক্রমণ করতে ছুটে আসতে তার ঘোড়াকে আঘাত করে। সে অতিকায় জন্তুটাকে ভূপাতিত করতে সফল হয় বটে কিন্তু তলপেটে অশ্বারোহীর বর্শার পুরো ফলাটা গ্রহণ করে তাঁকে এর মূল্য পরিশোধ করতে হয়। হুমায়ুন বেগুনী পাগড়ি পরিহিত লোকটার উদ্দেশ্যে সামনের দিকে দৌড়ে যায় সে, ঘোড়ার পিঠ থেকে আছড়ে পরার কারণে যদিও তাঁর বুকের সব বাতাস বের হয়ে গিয়েছে, অবশ্য দ্রুতই তরবারি বের করে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ায় আলমগীর দিয়ে হুমায়ুনের প্রথম আঘাত মোকাবেলা করতে। সে তার দ্বিতীয় আঘাত কোনোমতে প্রতিহত করে কিন্তু লোকটা যখন সেটা ঠেকাতে যায় হুমায়ুন তাঁর বাম হাতের খঞ্জর দিয়ে লোকটার গলায় আঘাত করে এবং খঞ্জরের খাঁজকাটা ফলাটা গলায় ঢুকিয়ে দেবার সময়ে মোচড় দেয় যাতে প্রাণসংহারক ক্ষতি হয়। আধিকারিকের উষ্ণ রক্ত ছিটকে উঠে হুমায়ুনের হাত ভিজিয়ে দেয়।
