এক কি দুই মিনিট পরেই, শিলাস্তরের চারপাশে মানুষ আর ঘোড়ার একটা জীবন্ত জটলার প্রান্তদেশে হুমায়ুন নিজেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সে আরোহীবিহীন একটা ঘোড়াকে পাশ দিয়ে দৌড়ে যেতে দেখে জন্তুটার পেটে একটা বিশাল কাটা স্থান থেকে অবলা প্রাণীটার পরিপাকতন্ত্রের একটা কিংদয়শ বের হয়ে আছে। মাটিতে অনেকগুলো দেহ হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে, মৃত্যুর কারণে আক্রমণকারী আর প্রতিরোধকারীদের এখন আর পৃথক করা যায় না। বাবা ইয়াসভালের সৈন্যরা মনে হয় যেন ধীরে ধীরে জমির অধিকার ত্যাগ করছে এবং তাঁদের শিলাস্তরের পার্শ্বদেশে দুরারোহভাবে খাড়া জমিতে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয় কিন্তু হুমায়ুন এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে মাঝে বাবা ইয়াসভালের হলুদ নিশান উডডীন অবস্থায় দেখতে পায়। তাঁর দেহরক্ষী দলের পক্ষে যতটা সম্ভব অনুসরণের দায়িত্ব দিয়ে, সে কালবিলম্ব না করে সেদিকে আক্রমণ করতে ছুটে যায়।
হুমায়ুনের বাদামী ঘোড়াটা মাথায় মুখব্যাদান করা এক রক্তাক্ত ফাটল নিয়ে পড়ে থাকা অশ্বারোহীর ক্ষতবিক্ষত দেহে হোঁচট খায় কিন্তু হুমায়ুন নিজে একজন দক্ষ ঘোড়সওয়ার হবার কারণে আর তাঁর ঘোড়াটাও ক্ষিপ্রগামী বলে তারা দ্রুত ভারসাম্য ফিরে পায় এবং হুমায়ুনকে নিয়ে জন্তুটা আক্রমণের উদ্দেশ্যে হুমায়ুনকে শত্রুর আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। সে পর্যানে বসেই শেরশাহের এক অশ্বারোহীকে তার তরবারি আলমগীর দিয়ে একবার আঘাত করে, তার দ্বিতীয় আঘাতে ঘোড়াটার গলায় একটা ক্ষতচিহ্নের জন্ম দেয়, জন্তুটা দ্বিখণ্ডিত শ্বাসনালী নিয়ে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগে তার আরোহীকে শূন্যে ছুঁড়ে দেয়, জন্তুটা পেছন থেকে হুমায়ুনকে আক্রমণের পায়তারা করতে থাকা আরেক অশ্বারোহীকেও ধরাশায়ী করে। বাবা ইয়াসভালের কাছ থেকে হুমায়ুন এখন কেবল বিশ গজের মতো দূরে রয়েছে। রণক্ষেত্রের জটলার মাঝে একটা ফাঁক দেখতে পেয়ে, হুমায়ুন পরস্পরের সাথে ভীষণভাবে যুদ্ধমান অশ্বারোহীদের ভিতর দিয়ে তাকে লক্ষ্য করার আগেই তার সেনাপতির দিকে এগিয়ে যায়।
সে এগিয়ে যাবার ফাঁকে লক্ষ্য করে যে বস্তুত পক্ষে বাবা ইয়াসভালের চারপাশে কেবল ডজনখানেকের মতো তাঁর যোদ্ধারা রয়েছে। তাঁদের ভিতরে তিন কি চারজন আবার নিজেদের ঘোড়া খুইয়েছে এবং বাবা ইয়াসভালো আর তার সহযোদ্ধারা শেরশাহের অসংখ্য আক্রমণকারীকে আটকে রেখে তাদের রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। তার চোখের সামনে অবশ্য ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁদের আক্রমণকারীদের একজন- লম্বা একটা বর্শা নিয়ে বেগুনী পাগড়ি পরিহিত বিশালদেহী এক যোদ্ধা, যার মুখ ভর্তি কালো চাপ দাড়ি- মাটিতে বাহনহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর একজনকে দলছুট হতে দেখে নিজের ঘোড়ার পাজরে গুতো দিয়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। মাটিতে দাঁড়ান লোকটা তার ঢাল নিজের সামনে এনে বর্শার সূচাল অগ্রভাগ প্রতিহত করলেও আঘাতের প্রচণ্ডতায় সে মাটিতে ছিটকে যায়। লোকটা তার আক্রমণকারীর ঘোড়ার খুরের নীচে থেকে মরীয়া হয়ে গড়িয়ে সরে গিয়ে নিজের সহযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করে কিন্তু সে যখন এসবে ব্যস্ত তখন বেগুনী পাগড়ি পরিহিত অশ্বারোহী পুনরায় নিজের বর্শা তুলে নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে নিশানা স্থির করে, লোকটার পেট বর্শা দিয়ে এফেঁড়ওফোঁড় করে দেয় বাবা ইয়াসভালের অন্যান্য যোদ্ধারা তাকে বাধা দেয়ার সময়ই পায় না। বেগুনী পাগড়ি পরিহিত মৃত্যুদূত রক্ত রঞ্জিত বর্শার অগ্রভাগ আহত লোকটার দেহ থেকে দ্রুত মোচড় দিয়ে বের করে নিশ্চিতভাবেই সে একজন আধিকারিক পিছিয়ে গিয়ে নিজের লোকদের ভীড়ের ভিতরে হারিয়ে যায়। হুমায়ুন যখন বাবা ইয়াসভালের কাছে যাবার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে তখনই এক মিনিটেরও কম সময়ে মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটে যায়।
সুলতান, আপনার দেহরক্ষীরা সব কোথায়? বাবা ইয়াসভালো হাত নেড়ে তার নিজের লোকদের পুনরায় নিচ্ছিদ্র ব্যুহে বিন্যস্ত করার অবসরে জিজ্ঞেস করেন। হুমায়ুন সহসা বুঝতে পারে যে তাঁদের একজনও শত্রুর আক্রমণ মোকাবেলা করে তাকে অনুসরণ করতে সফল হয়নি এবং যে পথ দিয়ে সে এখানে এসেছে সেই করিডোরটা এখন শেরশাহের যোদ্ধারা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে। তাঁরা তাঁকে এবং বাবা ইয়াসভালো আর তার সঙ্গীদের প্রায় ঘিরে ফেলেছে এবং পশ্চাদপসারণ বা সাহায্য আসবার যেকোনো সম্ভাবনা থেকে তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
বাবা ইয়াসভালো, যতক্ষণ আমাদের আরও যোদ্ধারা এসে পৌঁছে বা এখান থেকে পালাবার কোনো রাস্তা আমরা খুঁজে পাই ততক্ষণ নিজেদের আর পরস্পরকে রক্ষা করার জন্য আমাদের উচিত হবে ঘনবদ্ধ হয়ে অবস্থান করা। আমরা যদি শৈলশিরার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অবস্থান করি তাহলে অন্তত আমাদের পিঠ সুরক্ষিত থাকবে।
হুমায়ুন আর বাবা ইয়াসভালো একত্রে তাঁদের অন্য সৈন্যদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ে, কিন্তু তারা যখন তাঁদের আদেশ পালন করার প্রয়াস নেয়, সেই মুহূর্তে শেরশাহের তিনজন অশ্বারোহী এক ঘোড়সওয়ারকে ঘিরে ফেলে এবং তাঁদের একজন লোকটাকে তার বাহন থেকে কস্তনীর এক বেকায়দা আঘাতে মাটিতে ফেলে দেয়। মাটিতে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা লোকটার এক সঙ্গী তাঁকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে নিজের ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে গেলে, দুই মাথাবিশিষ্ট রণকুঠারের মোক্ষম আঘাতে সাথে সাথে মারা যায়, কুঠারটা তার কণ্ঠমণিতে আঘাত করে তাকে কবন্ধ করে দেয়। শেরশাহের অন্য আরেকজন যোদ্ধা মাটিতে পরে যাওয়া লোকটার ভবলীলা কস্তনীর এক ঘায়ে নিভিয়ে দেয়। সেই সময়েই বেগুনী পাগড়ি পরিহিত সেই আধিকারিক বাবা ইয়াসভালের ঘোড়া খোয়ান লোকদের একজনকে তার রক্ষাকারীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং বর্শা দিয়ে তার কুচকিতে আঘাত করে। আহত সৈন্যটার পা আর গোড়ালি জবাই করা পশুর মতো কয়েক মিনিট মাটিতে আছড়াতে থাকে এবং তারপরে সে নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে।
