প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠে, আধিকারিকের আরেকজন দেহরক্ষী এরপরে দুই মাথাযুক্ত রণকুঠার নিয়ে হুমায়ুনকে আক্রমণ করে। তার সাথে শীঘ্রই আরেকজন এসে যোগ দেয় এবং তারপরে আরেকজন তৃতীয়জন, দুজনের কাছেই লম্বা তরবারি, যার ফলার দুদিকই ধারাল। আক্রমণকারীদের হুমায়ুন কাছে আসতে দেয় না, তাঁর বাদামী রঙের ক্ষিপ্রগামী ঘোড়াটা চক্রাকারে ঘোরাতে থাকে এবং তাদের আঘাত ঠেকাতে থাকে, যদিও কারও একটা ধারাল তরবারি তার গালে হাল্কা আচড় দিয়েছে, যতক্ষণ না তার নিজস্ব দেহরক্ষীদের কয়েকজন দ্রুত তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। তার দুই আক্রমণকারীকে অচিরেই পাথুরে মাটিতে, বুকে মাথায় হুমায়ুনের তরবারির মৃত্যু স্মারক নিয়ে টানটান হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তৃতীয়জন হাত থেকে তরবারি ফেলে দিয়ে এবং পালাতে থাকে, হুমায়ুনের দেহরক্ষীদের একজন তার উরুতে বর্শা দিয়ে বেমক্কা আঘাত করায় রক্ত সেখানের ক্ষতস্থান থেকে তার পর্যাণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে এবং তাঁর হাল্কা রঙের ঘোড়াকে রক্তরঞ্জিত করে তুলেছে।
আমরা শেরশাহের অশ্বারোহী বাহিনীর একটা বিশাল অংশকে তাড়িয়ে দিয়েছি। তার তবকি আর তীরন্দাজেরাও পিছু হটেছে, রুদ্ধশ্বাসে একজন আধিকারিক তাঁকে জানায়।
দারুণ। আমাদের তবকি আর তীরন্দাজদের শেরশাহের লোকেরা পাথরের। আড়ালে যেখানে অবস্থান করছিল সেখানে মোতায়েন কর। ওখানে যেসব মালবাহী শকট রয়েছে তাঁদের কয়েকটাকে উল্টে দিয়ে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কর এবং শেরশাহ যদি আবারও আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহের পার্শ্বদেশে আক্রমণ করতে চেষ্টা করে তাঁদের হুশিয়ার করতে কয়েকটা কামানকে গোলাবর্ষণের জন্য প্রস্তুত রাখা।
তার লোকেরা কাজে লেগে পড়ে, কাঠের অতিকায় মালবাহী শকটগুলোকে ধাক্কা দিয়ে এবং টেনে নিয়ে এসে সেগুলোকে উল্টে দেয় এবং কামান স্থানান্তরের জন্য ষাড়ের পাল নিয়ে আসলে, হুমায়ুন ঘোড়ায় চড়ে কয়েকশ গজ দূরে চূড়ার উপরে একটা নির্দিষ্ট স্থানের দিকে এগিয়ে যায়, যেখান থেকে পুরো রণক্ষেত্রটা ভালো করে অবলোকন করতে এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবার অবকাশ পাবে। সেখানে পৌঁছাতে, সে দেখে তাঁর সিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষে গৃহীত হয়ে গিয়েছে। শেরশাহের অশ্বারোহী যোদ্ধারা প্রায় পৌনে এক মাইল দূরে তাঁর তৈরী মাটির অস্থায়ী বাঁধের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং তাঁদের আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে তার লোকেরা পিছু হটছে।
কি ব্যাপার? হুমায়ুন খয়েরী আর সাদার মিশেল দেয়া একটা ঘোড়ায় উপবিষ্ট শ্যাম বর্ণের খর্বকায় এক আধিকারিকের কাছে জানতে চায়, যে প্রায় পঞ্চাশজন পোড় খাওয়া চেহারার বাদশানি তীরন্দাজের একটা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সুলতান, আমি নিশ্চিত বলতে পারছি না, কিন্তু আমাকে বলা হয়েছে শেরশাহের প্রথম আক্রমণ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ উভয় প্রান্ত দিয়ে বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলার মাধ্যমে আমাদের অপ্রস্তুত করার পরে, সে অশ্বারোহী যোদ্ধার দ্বিতীয় একটা দলকে চূড়া থেকে আস্কন্দিত বেগে ধেয়ে এসে আমাদের প্রতিরক্ষা বাঁধের ঠিক মাঝ বরাবর নিচ্ছিদ্র বিন্যাসে আক্রমণের আদেশ দেয়, প্রতিরক্ষা ব্যুহের প্রান্তদেশের সুরক্ষায় আমরা সেখান থেকে সৈন্য সরিয়ে নিয়েছি বলে- এমনটা যে ঘটবে, আমি নিশ্চিত, সে আগেই জানতো। এই স্থানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে তারা প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত আমাদের অবশিষ্ট সৈন্যদের প্রতিরোধ একেবারে গুঁড়িয়ে দেয় এবং আমাদের সেনাছাউনির একেবারে কেন্দ্রস্থলে এসে হাজির হয়। বাবা ইয়াসভালো শিলাস্তরের পাদদেশে ওখানে একটা প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুলে আমাদের সবাইকে আদেশ করেছেন, সেই অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়ে সেখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
আধিকারিকের বাহুর নির্দেশিত দিকে তাকিয়ে, হুমায়ুন বিশৃঙ্খল অশ্বারোহী যোদ্ধাদের একটা বিশাল ভীড় দেখতে পায় এবং কোননামতে বাবা ইয়াসভালের হলুদ নিশান খুঁজে পায়। তুমি আর তোমার লোকদের সাহসিকতার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমরা নিশ্চয়ই শেরশাহকে তাড়িয়ে দেব। আমি আমার অশ্বারূঢ় দেহরক্ষীদের ডেকে পাঠিয়েছি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের পুরোভাগে অবস্থান করবো।
সুলতান।
হুমায়ুন ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং তাঁর দেহরক্ষীদের ইশারায় অনুসরণ করতে বলে, শিলাস্তর অভিমুখে পুতবেগে চূড়ার ঢাল বরাবর ফিরতি পথে এগিয়ে যায় যেখানে মূল লড়াই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সে ঘোড়া দাবড়ে এগিয়ে যেতে যেতে, শেরশাহের আরো বেশী বেশী সংখ্যক যোদ্ধাদের তার তৈরী অস্থায়ী মাটির বাঁধের প্রতিরক্ষাহীন ফাটল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে, শিলাস্তরের চারপাশে চলমান যুদ্ধে যোগ দিতে দেখে। সে শিলাস্তরের কাছাকাছি পৌঁছে তারপক্ষের পদাতিক সৈন্যের একটা ছোট দলের মুখোমুখি হয়, যারা নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করে পালিয়ে আসছে যা এখনও সরাসরি আক্রমণের সম্মুখীন হয়নি। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে সে চিৎকার করে তাদের ফিরে আসতে বলে যে, এখনও সব আশা শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু পলকহীন আর আতঙ্কিত চোখে, তাঁরা কনৌজের এবং নিকটবর্তী গঙ্গায় সেখানের পারাপারের স্থানের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে থাকে।
