হুমায়ুন ভাবে, পদাতিক সৈন্যরা অভিজ্ঞতা থেকে কেবল যদি শিক্ষা নিত যে অশ্বারোহী যোদ্ধাদের কবল থেকে দৌড়ে পালানটা অসম্ভব। পাথরের আড়ালে অবস্থান করা এবং সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করাটা কেবল অনেকবেশী সম্মানজনকই না, সেই সাথে নিরাপদও। তার পেছন থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে আসতে, সে পর্যানে বসা অবস্থায় পেছনে তাকিয়ে তার অনুরোধে বাবা ইয়াসভালের কাছ থেকে আগত অশ্বারোহী যোদ্ধার দলটাকে দেখতে পায়। দলটা তাঁর নিজের সাথে একটা সমকেন্দ্রিক পথে রয়েছে এবং মিনিটখানেকের মধ্যে আর নিজেদের অগ্রসর হবার গতি লক্ষণীয়ভাবে না কমিয়ে, দলটা হুমায়ুনের দেহরক্ষীদের সাথে এসে যোগ দেয় এবং একটা সঘবদ্ধ দলের মতো তারা সবাই সামনের দিকে পুতবেগে এগিয়ে যায়।
আক্রমণ কর! আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহের পার্শ্বদেশে নিজের পদাতিক বাহিনীকে নিয়ে এসে সে তার অবস্থান মজবুত করার আগেই শত্রুকে আমাদের অবশ্যই তাড়িয়ে দিতে হবে। আক্রমণকারীদের ছোট ছোট দলে পৃথক করতে চেষ্টা কর। তাঁদের তাহলে সহজে ঘিরে ফেলে হত্যা করা যাবে।
হুমায়ুনের অশ্বারোহী দলটা যখন ঢাল বেয়ে নীচের রণক্ষেত্রের দিকে দুলকি চালে এগোচ্ছে, শেরশাহের অশ্বারোহীদের ভেতর থেকে অশ্বারূঢ় একদল তীরন্দাজ বের হয়ে আসে। হুমায়ুনের অশ্বারোহীদের লক্ষ্য করে তারা এক পশলা তীর নিক্ষেপ করেই দ্রুত পিছু হটে তাঁদের সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভিতরে ফিরে যায়। সকালের বাতাসে মৃত্যুর শীষ তুলে তীরগুলো ছুটে আসে এবং হুমায়ুনের অশ্বারোহীদের কেউ কেউ তাদের সঙ্গে থাকা ঢাল তুলে নিজেদের রক্ষা করতে ঘোড়ার গতি হ্রাস করে। অনেকগুলো ঘোড়া তাদের আরোহীদের ছিটকে ফেলে দিয়ে ভূপাতিত হয় প্রকারান্তরে যা আরো অন্যদের পতনের কারণ হয়ে পুরো আক্রমণের প্রণোদনা ভঙ্গ করে বা ছন্দপতন ঘটায়। হুমায়ুন অবশ্য তার লোকদের এগিয়ে যাওয়া বজায় রাখতে অনুরোধ করে, তার চারপাশে যারা রয়েছে তাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠে, এসব বিরক্তিকর উৎপাত অগ্রাহ্য কর, তারা আবারও তীর ছোঁড়ার আগেই আমরা তাঁদের কাছে পৌঁছে যাব। সে তখন তাঁর বামদিক থেকে আরেকটা শব্দ ভেসে আসতে শুনে- শিলা আর প্রস্তরখণ্ডের একটা স্তূপের পেছন থেকে গাদাবন্দুকের গুলিবর্ষনের পটপট শব্দ। শেরশাহ তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে কিছু তবকিদেরও যে পাঠিয়েছিলেন বোঝা যায়।
হাসসান বাট্ট, তরুণ সেনাপতি হুমায়ুন আগের দিনই যাকে পদোন্নতি দিয়েছে, আক্রমণের একেবারে পুরোভাগের যোদ্ধাদের ভিতরে সে তার সাদা ঘোড়া আর ধুসর নীল পাগড়ির কারণে সহজেই চোখে পড়ে। গাদাবন্দুক থেকে নিক্ষিপ্ত একটা ধাতব বল তার ঘোড়ার মাথায় এসে আঘাত করতে ঘোড়াটা ভিত নড়ে যাওয়া ইমারতের ন্যায় হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ে এবং হাস্সান বাট্ট পর্যান থেকে বিকট শব্দে মাটিতে পতিত হয়, হাতগুলো কস্তনীরমতো দুলছে, এবং শক্ত পাথুরে মাটিতে বেশ কয়েকবার গড়িয়ে যায়। সে প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে এরপরেও টলমল করে উঠে দাঁড়ায়। আক্রমণের জন্য ধেয়ে আসা তার অশ্বারোহী বাহিনীর মূল দলটার মাঝে হারিয়ে যাবার আগে হুমায়ুন শেষবারের মতো তাকে, উত্তোলিত তরবারি দুলিয়ে তাঁর সহযোদ্ধাদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে দেখে।
হুমায়ুন তাঁর সাহসিকতা নিয়ে খুব বেশী কিছু চিন্তা করার সুযোগ পায় না কারণ সে নিজে ততক্ষণে শেরশাহের অশ্বারোহীদের মাঝে পৌঁছে গেছে। কালো ঘোড়ায় উপবিষ্ট এক যোদ্ধার আন্দোলিত কস্তনীর ছোবল এড়াতে একপাশে সরে গিয়ে, সে লালচে হলুদ ঘোড়ায় আরূঢ় এবং ইস্পাতের বর্ম পরিহিত এক লম্বা লোকের দিকে এগিয়ে যায় নিশ্চিতভাবেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক। লোকটাকে ঘিরে থাকা দুজন অশ্বারোহী সাথে সাথে নিজেদের বাহনের মুখ হুমায়ুনের দিকে ঘোরায়, সে তখন তাদের তরবারির আঘাত এড়াতে নীচু হয়ে রয়েছে এবং সেই অবস্থায় দুজনের একজনের মুখে বসন্তের দাগ ভর্তি শ্মশ্রুমণ্ডিত, খর্বকায় দেখতে- কাঁধে চোখের পলকে তরবারির কোপ বসিয়ে দিলে সে বাধ্য হয় হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিতে।
হুমায়ুন দ্রুত আধিকারিকের পাশে যাবার জন্য নিজের ঘোড়াকে তাড়া দেয়। লোকটা হুমায়ুনকে আঘাত করার নিমিত্তে তার হাতের লম্বা বাঁকান তরবারি তাক করে কিন্তু খুব কাছাকাছি অবস্থান করার ফলে হুমায়ুনের বর্ম ভেদ করার মতো। পর্যাপ্ত শক্তিতে সে তার তরবারি ঘোরাতে পারে না। আঘাতে প্রচণ্ডতা সত্ত্বেও হুমায়ুনকে একপাশে কাত করে ফেলে আর তার ঘোড়াও তাঁকে নিয়ে দূরে সরে আসে। দ্রুত টাল সামলে নিয়ে হুমায়ুন তাঁর বাহনের মুখ ঘোরাবার জন্য লাগাম টেনে ধরে এবং আক্রমণ করতে আধিকারিকের মুখোমুখি হয়। হুমায়ুনের তরবারির প্রথম আঘাত লোকটা তার সাথের ধাতব ঢাল তুলে ঠেকায় কিন্তু ভারী ঢালটা নামিয়ে হুমায়ুনের দ্বিতীয় আঘাত প্রতিহত করতে বড্ড দেরী করে ফেলে, আঘাতটা পাশ থেকে তাকে স্পর্শ করে, বক্ষস্থল আবৃতকারী বর্মটার কারণে সেই জায়গাটা অরক্ষিত ছিল। লোকটার গায়ে শেকলের তৈরী সূক্ষ বর্ম না থাকায় তরবারিটা মাংসপেশী এবং পাঁজরের উপস্থির গভীরে প্রবেশ করে। আধিকারিক লোকটা সহজাত প্রবৃত্তির কারণে হাত থেকে ঢাল ফেলে দেয় এবং নিজের দেহের ক্ষতস্থানের দিকে তাকিয়ে আতকে উঠে। হুমায়ুন পুররায় তরবারি চালায় এইদফা লোকটার গলা লক্ষ্য করে আড়াআড়িভাবে, আরেকটু হলেই লোকটাকে সে কবন্ধ করে ফেলেছিল এবং আধিকারিক লোকটা তার ঘোড়ার পর্যান থেকে পিছলে পড়ে যায়।
