রাতের বেলা আক্রমণের দ্বারা তাঁকে পুনরায় চমকে দেবার ব্যাপারে, যেমনটা সে চৌসায় করেছিল, হুমায়ুন কোনো প্রকার ঝুঁকি নেয় না। সে তাদের জাগিয়ে রাখে এবং সূর্য উঠার তিনঘন্টা আগে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখে। কিন্তু কোনো আক্রমণ হয় না এবং অনেক আগেই সকালের নাস্তার পর্ব শেষ হয়েছে আর রাধুনি আগুন নিভিয়ে দিয়েছে। আজকের সকালটা বেশ পরিষ্কার এবং যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে সরু চূড়া বরাবর আরো একবার হেঁটে আসবার সময় হুমায়ুন এমনকি নয়টার সময়েও টের পায় এরই মধ্যে বেশ গরম পড়েছে। তাঁর গুপ্তদূতেরা খবর দিয়েছে যে প্রায় এক ঘন্টা আগেই শেরশাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করেছে এবং শীঘ্রই বিপরীতপার্শ্বের চূড়ায় তাঁর পৌঁছে যাবার কথা।
তাঁরা ঠিকই অনুমান করেছিল। কয়েক মিনিট পরেই হুমায়ুন চূড়ায় প্রথম বেগুনী নিশান দেখতে পায়। তারপরে সে বর্ম পরিহিত একজন অশ্বারোহীকে দেখতে পায়, তারপরে আরেকজনকে, তারপরে শতশত। দীর্ঘদেহী এক অবয়বের, যার বর্মের সম্মুখভাগ আর শিয়োস্ত্রাণে সকালের সূর্য ঝিলিক তোলে, আদেশ অনুযায়ী শেরশাহের সবচেয়ে চৌকষ অশ্বারোহী বাহিনীর একটা অগ্রবর্তী দল হুমায়ুনের প্রত্যাশিত স্থানেই অবস্থান গ্রহণ করতে আরম্ভ করে। দুই চূড়ার মধ্যবর্তী দূরত্ব অনেক বেশী হবার কারণে ঠিকমতো চেনা যায় না ওখানে কে রয়েছে কিন্তু হুমায়ুন ধারণা করে কিছুটা আশাও- যে ওটা স্বয়ং শেরশাহ। শেরশাহের সাথে ব্যক্তিগত দ্বৈরথে সে আরো একবার অবতীর্ণ হয়ে নিজেকে দুজনের ভিতরে সেরা যোদ্ধা হিসাবে প্রমাণ করতে এবং তার শত্রু রক্তাক্ত অবস্থায় ধূলোয় লুটিয়ে রয়েছে দেখতে চায়। কিন্তু সে এটাও ভালো করে জানে যে তার লোকদের মতো তাকেও অবশ্যই সহসা সর্বশক্তি নিয়ে এক বেপরোয়া আক্রমণের ঝুঁকি নেয়ার প্ররোচনা জয় করতে হবে।
প্রায় সোয়া ঘন্টা পরে, হুমায়ুন দীর্ঘদেহী সেই অবয়বকে নিজের তরবারি আন্দোলিত করে তার অশ্বারোহী বাহিনীর প্রথম সারির মাঝে চলৎশক্তি সঞ্চারিত করতে দেখে। অশ্বারোহী বাহিনীর প্রথম সারিটা চূড়া থেকে সম্মিলিত কণ্ঠে রণহুঙ্কার দিয়ে পুতগতিতে নেমে আসতে শুরু করতে হুমায়ুনের কাছে মনে হয় তারা সংখ্যায় প্রায় হাজার পাঁচেক হবে, তাদের বেগুনী নিশানগুলো তাদের পেছনে বিরতিহীনভাবে আন্দোলিত হয়। তাঁদের ভঙ্গি দেখে মনে হয়, হুমায়ুন যেমন প্রত্যাশা করেছিল, তারা সরু চূড়ার মাঝামাঝি বরাবর তার তৈরী অস্থায়ী বাঁধের, যেটার উপরে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে, উপরে হামলা করতে এগিয়ে আসছে।
বাবা ইয়াসভালো ইতিমধ্যে হুমায়ুনের গোলন্দাজদের গোলা বর্ষণ আরম্ভ করার আদেশ দিয়েছেন এবং আক্রমণ শুরু করা শেরশাহের অশ্বারোহী বাহিনীর প্রথম দলটা গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। নীচের উপত্যকায় ঘুরপাক খেতে থাকা কামানের সাদা ধোয়ার মাঝে হুমায়ুন দেখে গাদাবন্দুকের ছররা বা তীরের আঘাতে পেছনের যোদ্ধারা তাদের ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়েছে। মাটিতে ধরাশায়ী হওয়া লোকগুলোর ভিতরে একজন নিশান-বাহক ছিল, যে মাটিতে আছড়ে পরার সময় যার হাত থেকে নিশানের দণ্ডটা ছুটে যায়। তাঁর বেগুনী নিশানটা উড়ে গিয়ে আরেক আগুয়ান অশ্বারোহীর সামনে পড়ে তার ঘোড়ার পায়ের সাথে পেচিয়ে যায় এবং ঘোড়াটা তার আরোহীসহ মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত পরে হুমায়ুন চোখেমুখে রুদ্ধশ্বাস বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখে তার অবস্থানের দিকে আক্রমণ অভিপ্রায়ে সর্বোচ্চ বেগে ধাতি হবার বদলে অশ্বারোহী যোদ্ধারা ভাগ হয়ে যাচ্ছে। একদল তর মাটির বাধের দূরবর্তী প্রান্তের দিকে ছুটতে শুরু করেছে এবং আরেকদল বিপরীত প্রান্তের দিকে। তাঁরা বৃত্তাবদ্ধ করার এক তৎপরতায় প্রবৃত্ত হয়েছে, হুমায়ুনের মূল প্রতিরক্ষা ব্যুহের সামনে দিয়ে হঠাৎ গতি পরিবর্তন করে একপাশে সরে যাবার সময় তাঁর তবকি আর তীরন্দাজদের কারণে জানমালের অবশ্যম্ভাবী ক্ষয়ক্ষতি আপাতদৃষ্টিতে তারা মেনে নিয়েছে।
নিমেষ পরে, হুমায়ুন তাঁর চোখের কোণ দিয়ে শেরশাহের বিশাল আরেকটা অশ্বারোহী বাহিনীকে দুলকিচালে ঢালু শৈলশিরার নীচু অংশ দিয়ে উঠে এসে দুটো চূড়ার উত্তরপ্রান্তের সংযোগকারী অংশের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে এবং তার প্রতিরক্ষা ব্যুহের অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত প্রান্তে তারা স্পষ্টতই হামলা করতে চলেছে।
জওহর, একজন বার্তাবাহককে পাঠিয়ে বাবা ইয়াসভালোকে এখনই বল উত্তরদিক থেকে শৈলশিরায় হতে যাওয়া আক্রমণ প্রতিহত করতে, এখনই আমাদের অশ্বারোহীদের কয়েকটা দলকে সেখানে সরিয়ে নেয়। তাদের নেতৃত্ব দিতে আমি নিজে সেখানে যাচ্ছি। জওহর আদেশটা ঠিকমতো শুনেছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য অপেক্ষা না করেই, হুমায়ুন তার কব্জি পর্যন্ত ঢাকা চামড়ার শক্ত দস্তানাযুক্ত হাত নেড়ে তাঁর দেহরক্ষীদের তাঁকে অনুসরণ করতে বলে এবং তার বাদামী ঘোড়ার পাজরে গুতো দিয়ে পর্বতশীর্ষের সংকীর্ণ ভূমিরেখা বরাবর জন্তুটাকে পুতগতিতে ধাবিত করে। কয়েক গজ যাবার পরেই শৈলশিরার দিকে মাটি ঢালু হয়ে নামতে শুরু করে এবং হুমায়ুন দূর থেকেই লক্ষ্য করে যে শেরশাহের অশ্বারোহী বাহিনীর একটা ভালো অংশ ইতিমধ্যে তাঁর অস্থায়ী বাঁধের উত্তরের প্রান্তসীমার পেছনে পৌঁছাতে সফল হয়েছে। তাঁর তবকি আর তীরন্দাজেরা পাথরের আড়াল থেকে তাদের দিকে গুলিবর্ষণ করছে। তারপরে সে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তীরন্দাজদের একটা দল ঘুরে দাঁড়ায় এবং ধনুক ফেলে দিয়ে পেছনের দিকে দৌড়াতে শুরু করে, নিজেদের শেরশাহের অশ্বারোহীদের সহজ নিশানায় পরিণত করে। নিজেদের পর্যানে উঠে দাঁড়িয়ে তারা তীরন্দাজদের পিঠ বরাবর তরবারি দিয়ে আঘাত করে, তাদের অধিকাংশকেই আক্ষরিক অর্থে কচুকাটা করে।
