সবশেষে, উচ্চনাদের আরেকদফা তূর্যবাদনের মাধ্যমে, আপনার প্রাক্তন অনুগত রাজাদের ভিতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাঁরা তাঁদের একজন- গোলপুরের রাজা- এগিয়ে আসে এবং শেরশাহের সেনাপতিদের অনেককে সাথে নিয়ে সে শেরশাহের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে। শেরশাহকে সম্রাটের পদবী- পাদিশাহ গ্রহণের জন্য তারা একসাথে তাকে অনুরোধ করে, তাকে বশংবদ আর বিশ্বাসঘাতকের মতো আশ্বাস দেয় যে এই পদবীর জন্য সে সবসময়েই আপনার চেয়ে অনেকবেশী যোগ্য। শেরশাহ দুইবার নিজের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন পূর্বক বক্তব্য প্রদান করে বলেন যে তিনি কেবল আপনার দ্বারা অত্যাচারিতদের সাহায্য করতে চান। নিজের জন্য পুরষ্কার কিংবা ক্ষমতা কিছুই চান না। অবশ্য তৃতীয়দফা দর্পোদ্ধত আর আরো বেশী চাটুকারী বিশেষণ প্রয়োগ করে সনির্বন্ধ প্রার্থনা করা হলে তাঁদের অতিরঞ্জিত বাক্য ব্যবহার ততক্ষণে মাত্রা ছাড়িয়েছে। তিনি রাজি হয়ে বলেন, যদি এটাই তোমাদের অনড় আকাঙ্খ হয়, আমি কেবল সম্মতি জানাতে পারি। বিচক্ষণতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা আর সবাইকে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি আমি দিলাম। তারপরে সোনার উপরে রুবি দিয়ে কারুকাজ করা একটা মুকুট- সবসময়ে যা প্রস্তুত ছিল; পুরো ব্যাপারটাই মঞ্চে অভিনীত একটা প্রহসন, তাঁর প্রাথমিক প্রত্যাখ্যান কেবলই লোক দেখান- শেরশাহের তিনজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক আর গোলপুরের রাজা তাঁর মাথায় স্থাপন করে। উপস্থিত সবাই নিজেদের তার সামনে প্রণত করে, মাটিতে নিজেদের বিশ্বাসঘাতক নাক চেপে ধরে।
পরে সেই রাতে, শেরশাহ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাপূর্ণ এক গণউৎসব মঞ্চস্থ করে। মশালের ধকধক করে জ্বলতে থাকা আলোতে প্রতিটা রাজ্য এবং গোত্রের একজন তরুণ যোদ্ধা যারা এখন তার সাথে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ শেরশাহের সামনে সামরিক কসরত প্রদর্শন করে, এসময়ে সে সোনার কারুকাজ করা চাঁদোয়ার নীচে একটা লম্বা, খাড়া পৃষ্ঠদেশযুক্ত সোনার গিল্টি করা একটা সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিল। সিংহাসনে শেরশাহের মাথার ঠিক উপরে গর্জনরত একটা ক্রুদ্ধ ব্যাঘ খোদাই করা রয়েছে। বাঘটার চোখের স্থানে দুটো প্রকাণ্ড রুবি শোভা পাচ্ছে যেগুলো আমাকে বলা হয়েছে- আধারেও তীব্রভাবে জ্বলজ্বল করে। প্রদর্শনী শেষ হবার পরে সবাই তথাকথিত সম্রাটের সামনে পর্যায়ক্রমে মাথা নত করে এবং তিনি তাদের ঘামে ভেজা কামান মাথায় তাদের আর তারা যে অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে সবাইকে তিনি যে সাফল্য আর সমৃদ্ধির অংশীদার করবেন তার লক্ষণস্বরূপ জাফরান, মুক্তা চূর্ণ, কস্তরীমৃগ আর তিমি মাছের অন্ত্রে প্রাপ্ত মোমসদৃশ গন্ধদ্রব্য ছিটিয়ে দেন।
পরের দিনটা ছিল শুক্রবার, শহরের প্রধান মসজিদে- শেরশাহের সেনাপতিদের উপস্থিতির কারণে জনাকীর্ণ- ইমাম সাহেবও শেরশাহের নামে খোতবা পাঠ করে শেরশাহকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে এবং বিশ্বাসঘাতকসুলভ আর তীব্র কটাক্ষপূর্ণ ভঙ্গিতে আপনার সমুদয় ভূখণ্ড হোক সেটা বাংলায় তার দ্বারা ইতিমধ্যে জবরদখলকৃত বা তার নাগালের বাইরে পাঞ্জাব আর আফগানিস্তান, শেরশাহকে বরাদ্দ দেয়া হয়। পরের দিন, শেরশাহ আমাদের বিরুদ্ধে নতুন করে তার অগ্রাভিযান শুরুর অভিপ্রায়ে কুচকাওয়াজের সাথে রওয়ানা দেয়। তার নতুন মিত্রদের কল্যাণে, এখন তার বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি।
সে এই মুহূর্তে কোথায় অবস্থান করছে?
এখান থেকে প্রায় একশ মাইল দূরে, আগ্রা অভিমুখে ধীর গতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
বাবা ইয়াসভালো, আমাদের নিজেদের সেনাবাহিনীর কি অবস্থা? নতুন করে সমর-সজ্জার অগ্রগতি কি ভালোমতো চলছে?
হ্যাঁ, অস্ত্র আর বর্ম নির্মাতারা দারুণ কাজ দেখিয়েছে। আমাদের লোকেরা সবাই নতুন অস্ত্র পেয়েছে। আরো বেশী সংখ্যক কামান উৎপাদনের লক্ষ্যে আমাদের ঢালাইখানার চুল্লী দিনরাত জ্বলছে। আমাদের অশ্বারোহী বাহিনীকে পুনরায় সচল করতে ঘোড়ার দালালেরা আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে ঘোড়া সরবরাহ করেছে। যদিও অনেকগুলোই আমাদের পিতৃপুরুষের স্বদেশের তৃণভূমিতে জন্ম নেয়া ঘোড়ার মতো বিশাল আর শক্তিশালী না।
আর আমাদের মিত্র এবং আমার সৎ-ভাইদের দ্বারা আরও সৈন্য প্রেরণের প্রতিশ্রুতির কি খবর?
এই বিষয়ে খবর খুব একটা ভালো না। আমাদের অনেক মিত্রই গড়িমসি করছে, সৈন্য প্রেরণে বিলম্বের কারণ হিসাবে তারা বর্ষাকাল বা স্থানীয় বিদ্রোহের অজুহাত দিচ্ছে বা পাঠালেও খুব ছোট বাহিনী প্রেরণ করছে। হিন্দাল আর আসকারি অবশ্য প্রতিশ্রুতি পালন করেছে বিশেষ করে হিন্দাল প্রতিশ্রুত সংখ্যার চেয়েও বেশী সংখ্যক সৈন্য প্রেরণ করেছে কিন্তু আপনার সৎ-ভাইদের ভিতরে সবচেয়ে বড় যে কামরান সে পাঞ্জাব থেকে মাত্র আড়াইশ অশ্বারোহীর একটা নিতান্ত ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করেছে যাদের ঘোড়াগুলো দারুণ। আমরা অধিকতর সহযোগিতার কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে সে প্রত্যুত্তরে স্পষ্ট করে কোনো সময়সীমা উল্লেখ করেনি এবং আপনি আরও ব্যাপক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারেন এমন ইঙ্গিত দিয়ে কিছু সৈন্য সে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছে।
কিন্তু আমরা যাতে আরও পরাজয়ের সম্মুখীন হই, সেটা নিশ্চিত করার জন্য এটা একটা অনিবার্য পন্থা, হুমায়ুন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে গর্জে উঠে কিন্তু তারপরে বেশী কিছু বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। প্রকাশ্যে নিজের সৎ-ভাইদের সমালোচনা করাটা মোটেই সমীচিন হবে না। কামরানের সাথে তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত চিঠিপত্র আদানপ্রদানের সাথে তার সেনাপতির বক্তব্য প্রতিধ্বনিত হয়। তার সৎ-ভাই চিঠির উত্তর দিতে দেরী করে এবং যখন সে উত্তর পাঠায় শেরশাহের প্রতি নিজের বৈরিতা যদিও সে যথার্থ মারমুখো ভঙ্গিতে প্রকাশ করে, কিন্তু হুমায়ুনের নেতৃত্বের অধীনে যুদ্ধের জন্য সৈন্য প্রেরণের ক্ষেত্রে সে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয় না। কামরান তার সব সৈন্য নিয়ে বরং নিজে যুদ্ধে যোগদানের প্রস্তাব দিয়েছে। সে খুব ভালো করেই জানে হুমায়ুন ইহা প্রত্যাখ্যান করবে, কারণ তার প্রস্তাবে রাজি হওয়া মানে পাঞ্জাবকে শাসকহীন করা এবং সেই সাথে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সৈন্যহীন করা। কামরান মনে হয় প্রতীক্ষা করার খেলা শুরু করেছে, সে নিজের ব্যক্তিগত অবস্থান সংরক্ষণের বিষয়ে বেশী উদগ্রীব তাঁদের আব্বাজানের সাম্রাজ্যের হাতছাড়া হওয়া প্রদেশগুলো পুনরুদ্ধারের চেয়ে যদি এর মানে হয় তাঁর নিজস্ব গৌরব বৃদ্ধির চেয়ে হুমায়ুনের গৌরব বৃদ্ধি করা।
