আমি আমার সৎ-ভাইদের সাথে যোগাযোগ করবো। কিন্তু আমাদের সেনাপতিরা এই মুহূর্তে ঠিক কতজন সৈন্য মোতায়েন করতে সক্ষম?
সুলতান, এক লক্ষ সত্তর হাজার।
তার মানে বর্তমান পরিস্থিতিতে শেরশাহের সৈন্য সংখ্যা আমাদের চেয়ে বেশী।
জ্বী, সুলতান। আপনার ভাই কামরান আর অন্যান্যদের কাছ থেকে যতক্ষণ না বাড়তি লোকবল এসে পৌঁছায়।
*
হুমায়ুন নিজের গালে সন্ধ্যার উষ্ণ, কোমল বাতাসের স্পর্শ অনুভব করে যখন, স্থানটা গঙ্গার তীরে কনৌজের বসতি থেকে খুব একটা দূরে অবস্থিত না, সে বিক্ষিপ্তভাবে জন্মান ঝোপঝাড় আর ইতস্ততভাবে বেড়ে উঠা বামনাকৃতি গাছপালা শোভিত বেলেপাথরের একটা সরু চূড়ায় নিজের আদেশপ্রদানকারী অবস্থান থেকে বিপরীতপার্শ্বের শৈলচূড়া অভিমুখে তাকায় যেখানে, যদি তার গুপ্তচরদের বিবরণী নির্ভুল হয়, আগামীকাল সকালে শেরশাহের বাহিনী এসে উপস্থিত হবে। মৃদুমন্দ এই বায়ু প্রবাহটা কিছুক্ষণের জন্য হুমায়ুনকে তাঁর জন্মস্থান, আফগানিস্তানে গ্রীষ্মকালে প্রবাহিত শীতল বাতাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অতীতের স্মৃতি মনে পড়তে তার মুখে ফুটে উঠা আধো হাসির আভাস তার মাথার পেছনে সতত বর্তমান জ্ঞানের কারণে নিমেষে বিতাড়িত হয়, যে গত দুইমাস কাল ধরে তার সামরিক পরিষদমণ্ডলী দুঃসংবাদব্যাতীত আর কিছুই বয়ে আনেনি।
শেরশাহের ধীর কিন্তু অবিশ্রান্ত অগ্রগতি বজায় আছে। যা সম্ভবত একেবারে অপ্রত্যাশিত না কিন্তু হুমায়ুন যেটা একেবারেই আঁচ করতে পারেনি সেটা হল মুরাদাবাদের রাজা, হানিফ খানের স্বপক্ষত্যাগ করে শেরশাহের সাথে যোগ দেবার বিষয়টা, সুলেমান মির্জা মৃত্যুবরণ করার পরে যিনি এখন হুমায়ুনের অশ্বারোহী বাহিনীর সবচেয়ে বয়োজ্যোষ্ঠ অধিনায়ক, তার সাথে রয়েছে পনের হাজার অশ্বারোহীর একটা বিশাল বাহিনী, দিল্লীর পূর্বে হানিফ খানের জমিদারী এলাকা থেকে যাদের নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁর কাপুরুষোচিত পলায়নের ঠিক পরপরই, শেরশাহ নিশ্চিতভাবেই পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে- গঙ্গার তীরবর্তী সুরক্ষিত একটা শহরে আক্রমণ চালায় যা ইতিপূর্বে হানিফ খানের অধীনস্ত ছিল। হানিফ খানের স্বপক্ষত্যাগের কারণ হতোদ্যম হয়ে পড়ায়, হুমায়ুনের কয়েক হাজার সৈন্য যাঁরা তখনও তাঁর প্রতি অনুগত ছিল সামান্যই প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং অচিরেই শহরটা আত্মসমর্পন করলে শেরশাহের অগ্রযাত্রার পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। হুমায়ুন কোনোভাবেই সেইসব সৈন্যদের কোনো দোষ দিতে পারে না। সে বরং নিজেকেই ভৎর্সনা করে যে যাঁরা তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে তাঁদের উচ্চাকাঙ্খ আর চরিত্র অনুধাবনে সে মোটেই সময় দেয়নি ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল সে পরিহার করতে চেষ্টা করবে।
হুমায়ুনের পেছনে যা ঘটছে সে সবের বিবরণও তাঁকে সমানভাবে বিব্রত করে। হিন্দালের শাসনাধীন প্রদেশ আলওয়ারে শেরশাহের সমর্থনে একটা সশস্ত্র বিদ্রোহ দানা বেঁধেছিল যা হিন্দাল চিঠিতে জানায়, বহু কষ্টে সে এই বিদ্রোহ দমন করেছে। দিল্লীর কাছে অবস্থিত পার্বত্য এলাকায় হানিফ খানের অনুগত জায়গীরদারদের ভিতরেও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে এবং হুমায়ুন বাধ্য হয় একদল সৈন্য প্রেরণ করে বিদ্রোহীদের দমন করতে, যাদের তার সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেবার প্রস্তুতি স্বরূপ প্রশিক্ষিত করাটা গুরুত্বপূর্ণ।
কামরানের কাছ থেকে প্রেরণ করা চিঠিটা সবকিছুর ভিতরে নিকৃষ্টতম। হুমায়ুনের প্রতি এবং রাজবংশের প্রতি আর শেরশাহের সাথে তার বিরোধিতার প্রতি সে নিজের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়ে একই সাথে তাঁর ভাইয়ের আগ্রা ছাড়িয়ে আরও দুইশ মাইল পূর্বে গিয়ে শেরশাহকে মোকাবেলা করার সামরিক কৌশলকে সে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সে এর পরিবর্তে প্রস্তাব দিয়েছে হয় দিল্লী নতুবা আগ্রাকে অবরোধের জন্য প্রস্তুত করতে আর তাঁদের উঁচু দেয়ালে ফাটল সৃষ্টির অভিপ্রায়ে বৃথা উদযোগ গ্রহণ করে শেরশাহকে নিজ শক্তি ক্ষয়ের একটা সুযোগ দেয়া। কামরান আরও সৈন্য প্রেরণের বিষয়টা প্রত্যাখ্যান করতে অজুহাত হিসাবে নিজের উদ্বেগকে ব্যবহার করে সেই সাথে দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছে যে হুমায়ুনের ক্রুটিযুক্ত কৌশল যদি ব্যর্থ হয়, কামরান মনে করে যে পরিকল্পনাটার ব্যর্থ হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, তখন তাঁর নেতৃত্বে প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় ব্যুহ কার্যকর করতে সে প্রতিশ্রুত বাহিনীকে না পাঠিয়ে আটকে রাখছে।
সুলতান, বাবা ইয়াসভালো আপনার সেনাবাহিনী পরিদর্শনের সময় আপনাকে সঙ্গ দেবার জন্য অপেক্ষা করছেন। জওহর হুমায়ুনের স্বপ্ন-কল্পনায় বিঘ্ন ঘটায়। সে হুমায়ুনের খয়েরী রঙের উঁচু ঘোড়াটার লাগাম ধরে রয়েছে।
উত্তম প্রস্তাব। হুমায়ুন ঘুরে দাঁড়ায় এবং ঘোড়ায় চড়ে সরু চূড়া বরাবর খানিকটা এগিয়ে যায় বাবা ইয়াসভালের সাথে মিলিত হতে। দুজনে সামনে এগোন শুরু করতে, হুমায়ুন জানতে চায়, আমাদের গুপ্তদূতদের সর্বশেষ বিবরণীর কি বক্তব্য? কোনো পরিবর্তন কি হয়েছে?
না, সুলতান। বিপরীত পার্শ্বের চূড়া থেকে প্রায় দুই মাইল ভিতরে শেরশাহ তার তাবু ফেলেছে এবং আজরাতে তাঁর শিবির থেকে প্রস্তুতির যে দৃশ্য আর শব্দ শোনা গেছে, তাতে মনে হয় আগামীকাল সকালে সে সত্যিই আক্রমণ শুরু করবে।
