আমাদের সম্রাট একজন দুর্দান্ত যোদ্ধা- যুদ্ধক্ষেত্রে তারমতো সাহসী আর কেউ নেই… তৃতীয় একজন মন্তব্য করে। তাঁর কণ্ঠস্বর মন্দ্র এবং বয়সের ছাপ স্পষ্ট কিন্তু কিন্তু অন্যদের মতো- হুমায়ুন একেও চিনতে পারে না।
আমরা অবশ্য আশা করতে পারি যে তিনি মনে রাখবেন যে কি জন্য তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। বাবর ছিলেন একজন সত্যিকারের পুরুষ- সেজন্যই কাবুল থেকে তাঁর অভিযাত্রী দলের সাথে আমি এখানে এসেছিলাম। আমি বিশ্বাস করতে পারিনা কল্পনাপ্রবণ এক জ্যোতিষীর জন্য আমি সবকিছু ত্যাগ করিনি…
কিন্তু তিনি কি ইতিমধ্যে অসাধারণ বিজয় অর্জন করেননি… গুজরাতের কথা একবার স্মরণ কর এবং কিভাবে আমরা… মন্দ্র কণ্ঠের অধিকারী বলতে থাকে, কিন্তু লোকগুলো হাঁটতে আরম্ভ করায় হুমায়ুন তাঁদের আলোচনার অবশিষ্টাংশ শুনতে পায় না।
তাদের কথাবার্তা তাঁকে ক্রুদ্ধ করে তোলে। ছুটে গিয়ে তাঁদের মুখোমুখি হবার অভিপ্রায় তাঁকে বেশ প্রলুব্ধ করতে থাকে কিন্তু তারা যা বলেছে সেগুলো খানিকটা হলেও সত্যি। আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে গোধূলির আলোয় দিনের সূচনা করে সে তাঁর সেনাপতি আর অমাত্যদের সাথে নিজের সম্পর্ক নষ্ট করেছে আর তার প্রজাদের হতাশ করেছে। কিন্তু নিজামের ব্যাপারে তাঁদের ধারণা ভুল। নিজামকে সে কথা দিয়েছিল এবং সে কথা রেখেছে। যা একজন সম্মানিত ব্যক্তির উপযুক্ত আচরণ। অন্য কিছু করলে, ইহকালে না হোক পরকালে তাকে অবশ্যই সেজন্য শাস্তি পেতে হতো…
*
আহমেদ খান, প্রথমে আমাকে বল, আমাদের শত্রু সম্বন্ধে আমরা কি জানি?
হুমায়ুন নিজের চারপাশে তার সামরিক উপদেষ্টাদের সাথে সম্রাটের লাল নিয়ন্ত্রিত তাবুতে আবারও একবার বৈঠকে বসেছে। শেরশাহের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে গত সন্ধ্যায় আগ্রা থেকে একশ বিশ মাইল দক্ষিণে সে তার সেনাবাহিনীর শিবিরে এসে হাজির হয়েছে।
সুলতান, সংবাদ খুব একটা ভালো না। শেরশাহ যুদ্ধে নিহত যোদ্ধাদের সমাধিস্থ করে খুব মন্থর গতিতে কাকরি ফিরে গেছে, এই শহরটাকে সে তার নেতৃত্বের অগ্রবর্তী কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। দশ সপ্তাহ আগে, সেখানেই তার বিজয় উদযাপন উপলক্ষ্যে একটা বিশাল কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছিল। ঢাকের তালে তালে তাঁর সবচেয়ে চৌকষ অশ্বারোহীদের একটা দল নিজেদের বেগুনী নিশান বহন করে কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেয়। তারা উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়তে তাঁরা গলার স্বর সপ্তমে তুলে তাঁদের উৎসাহিত করে। শেরশাহ আমাদের কাছ থেকে ব্রোঞ্জের যে কামানগুলো জব্দ করেছিল গঙ্গার তীরের কাদা থেকে তাঁদের বেশীর ভাগই টেনে তুলতে সফল হয়েছে এবং পুনরায় তাদের কার্যক্ষম করে তুলেছে। কুচকাওয়াজে এর পরেই ছিল কামানগুলো, রাস্তা দিয়ে সেগুলোকে টেনে নিয়ে যায় আমাদেরই কিছু হাতি যা সে তাড়া করে ধরেছে। কামানের ঠিক পেছনেই ছিল আমাদের যুদ্ধবন্দিদের সারি, শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় তাদের হাঁটতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমাদের এক গুপ্তচরের বয়ান অনুসারে, মিষ্টি বিক্রেতার ছদ্মবেশে সে খুব কাছ থেকে তাঁদের দেখেছে, বন্দিদের অনেকেই খুঁড়িয়ে হাঁটছিলো বা তাদের ক্ষতস্থানসমূহে নোংরা কাপড় দিয়ে পটি বাঁধা ছিল। বাকিদের দেহের যেখানে শেকল দংশন করেছে সেখানেই রয়েছে দগদগে যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত। বন্দিদের সবাইকে ক্ষুধার্ত আর রোগা দেখাচ্ছিল আর তাদের চোখ মাটির দিকে নিবদ্ধ ছিল। গুপ্তচর আরও বলেছে যে দর্শকরা তাদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে, ধাক্কা দেয় আর তাঁদের দিকে পচা আবর্জনা ছুঁড়ে মারে এমনকি কেউ কেউ তাদের লাঠি দিয়েও আঘাত করে।
শেরশাহের উল্লসিত বাহিনীর আরও অনেকগুলো দল পর্যায়ক্রমে তাদের অনুসরণ করে এবং সবশেষে শেরশাহ নিজে লম্বা একটা হাতির পিঠে স্থাপিত গিল্টি করা হাওদায় আরোহন করে এগিয়ে আসে, হাতিটার লম্বা দাঁতগুলো সোনার পাতা দিয়ে মোড়ান এবং এর পর্যানের ঢাউস কাপড়টায়, যা মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত, মুক্তা আর মূল্যবান পাথর দিয়ে কারুকাজ করা। শোভাযাত্রাটা যখন শহরের মূল চত্বরে পৌঁছায় শেরশাহ হাতির পিঠ থেকে নেমে আসে বেগুনী কাপড় দিয়ে আবৃত একটা অতিকায় মঞ্চে নিজের নির্ধারিত স্থান গ্রহণ করতে।
সে এখানে আমাদের কাছ থেকে অধিকৃত সম্পদ তাঁর প্রধান সমর্থকদের মাঝে উপহার হিসাবে বিলিয়ে দেয় এবং আমাদের কাছ থেকে দখল করা জমি তাদের ভিতরে বিলিবণ্টন করে, এবং তাদের মাঠে আর খনিতে কৃতদাস হিসাবে কাজ করার জন্য আমাদের ভাগ্যপ্রপীড়িত বন্দিদের কয়েকটা দলকে দান করে। তারপরে, যা বলা আরো লজ্জাজনক, আমাদের অনেক প্রাক্তন মিত্র এবং অনুগত জায়গীরদার নিজেদের আনুষ্ঠানিক পোষাকে সজ্জিত হয়ে সামনে এগিয়ে আসে। শেরশাহের সামনে নোংরায় তারা খুশীমনে নিজেদের অধধামুখে প্রণত হয়ে মার্জনা ভিক্ষা করে এবং সে তার সেনাবাহিনীতে তাদের বিভিন্ন পদ দিয়ে পুরস্কৃত করে এবং আপনি যখন পরাজিত হবেন তখন আরও পরিমাণে দান করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তাদের অনুসরণ করে দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোর শাসকদের প্রেরিত রাজদূতেরা যেমন হীরক-সমৃদ্ধ গোলকুণ্ডা, যিনি আমাদের দুর্বলতা থেকে নিজেদের আরও শক্তিশালী করার সুযোগ দেখতে পেয়ে, শেরশাহকে সবধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বিনিময়ে তাদের খুশী করতে আমাদের ভূখণ্ডের কিয়দংশ তাঁদের অধিকারে ছেড়ে দেবার সাড়ম্বর প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়।
