হুমায়ুন চাপা হাসির একটা গুঞ্জন শুনতে পায়। এমনকি কাশিমের সচরাচর গম্ভীর, আত্মনিরোধী মুখেও যেন একটা ক্ষীণ হাসির রেশ ফুটে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, কিন্তু নিজামের অনুদ্ধত অনুরোধ হুমায়ুনকে আবেগপ্রবন করে তুলে। দরবারের অনেকের মতো সে নিজেকে মাত্রাতিরিক্ত রকমের সম্পদশালী করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেনি।
আপনার আদেশ যথাযথভাবে পালিত হবে।
আমিও তাহলে সিংহাসন থেকে নেমে আসতে প্রস্তুত। নিজাম লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, তাঁর ক্ষুদ্র অবয়বে স্বস্তির একটা রেশ ফুটে উঠে, এবং হোঁচট খাওয়া থেকে বিরত থাকতে দুহাতে আলখাল্লাটা গোড়ালীর উপরে তুলে ধরে আলতো পায়ে নেমে আসে। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন অনুধাবন করে সত্যিকারের সাহস কাকে বলে সে এই প্রত্যক্ষ করেছে। দরবারে এসে হুমায়ুনকে নিজের প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার কথা বলার জন্য নিজামকে কি বিশাল একটা ঝুঁকি নিতে হয়েছিল? সে ভালো করেই জানতো, তাঁর কথা হয়ত হুমায়ুন ভুলেই গেছেন বা তার ঔদ্ধত্যের কারণে তিনি কুদ্ধও হতে পারেন। ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে থাকা ছেলেটার প্রতি সেই প্রহরী যদি চিৎকার না করতো তাহলে চেঁচিয়ে সম্রাটকে জবাবদিহি করতে বলার ধৃষ্টতা চাবুকের মূল্যে পরিশোধ করার কিংবা নিজের হঠকারীতার জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ড হবারও একটা সমূহ সম্ভাবনা ছিল।
হুমায়ুন এবার সিংহাসনে আরোহন করে। পুনরায় সম্রাটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আমিও এবার কিছু আদেশ করতে চাই। আদেশগুলো হল নিজাম ভিস্তিকে এমনভাবে জমির অনুদান দেয়া হোক যাতে সে নিজে এবং তার পুরো পরিবার স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পারে এবং সেই সাথে তাকে পাঁচশ স্বর্ণমুদ্রাও যেন প্রদান করা হয়। হুমায়ুন দেখে প্রহরীবেষ্টিত অবস্থায় দরবার হল থেকে যাবার আগে ক্ষুদে অবয়বটা, তার দিকে মাত্র একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।
সেদিন অপরাহ্নে, সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন শেষে, ফ্যাকাশে চাঁদ আকাশে যখন মাত্র উঠতে শুরু করেছে এবং রাতের রান্নার জন্য নতুন করে আগুন জ্বালাবার পরে, হুমায়ুন আগ্রা দূর্গের প্রাকারবেষ্টিত ছাদে উঠে আসে। কিছুক্ষণের জন্য নিজের ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকবার অভিপ্রায়ে সে তার সব প্রহরীদের চলে যাবার অনুমতি দিয়েছে। তার নির্জনতা প্রীতি বাবর একজন শাসকের জন্য যা মারাত্মক দোষ হিসাবে বিবেচনা করতেন কখনই হুমায়ুনকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। নক্ষত্রের আবর্তনের প্রতি তাঁর এখনও আগের মতোই কৌতূহল রয়েছে। যদিও এসব অনুভূতি সে নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে জানে যে তাঁর সেটাই করা উচিত, অনুভূতিগুলো এখনও আগের মতোই প্রবল- যার আসক্তি গুলরুখের তৈরী আফিম আর সুরার মিশ্রণের চেয়ে অনেকবেশী শক্তিশালী।
রাজত্বের নিপীড়ন নিয়ে তার আব্বাজান একবার তার সাথে আলোচনা করেছিলেন এবং তিনি ঠিকই বলেছিলেন। একজন শাসকের চেয়ে একজন দরিদ্র মানুষ হওয়াটা অনেক দিক দিয়েই উত্তম প্রস্তাবনা। নিজাম অন্তত, একজন স্বাধীন মানুষের মতো, গঙ্গার পানিতে তাঁর মশক ডুবিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। একটা সাম্রাজ্যের ভবিষ্যতের বোঝা বহন করা মোটেই সহজ নয়, যদিও সে ভালো করেই জানে তাঁর কখনও এই পবিত্র দায়িত্ব পরিত্যাগ করার অভিপ্রায় হবে না।
সে যখন নিজের ভাবনা নিয়ে তন্ময় চারপাশ অন্ধকার করে তখন রাত নামছে। নিজের আবাসন কক্ষে ফিরে যাবার সময় হয়েছে যেখানে জওহর আর তাঁর অন্যান্য পরিচারকেরা রাতের খাবার পরিবেশন শুরু করবে- পাত্র ভর্তি ভেড়ার মাংস, মাখন দেয়া ভাত আর মোগলদের স্বদেশের কন্দজাতীয় সজি এবং জাফরান ও হলুদ দিয়ে রান্না করা হিন্দুস্তানের মশলাযুক্ত নানা পদ, তাঁর নতুন সাম্রাজ্যের সমভূমি দিনে যে সূর্যের প্রতাপে দগ্ধ হয় স্বাদে গন্ধে ঠিক সেরকমই প্রখর। দেয়ালের কুলুঙ্গিতে রাখা জ্বলন্ত মশালের আলোয় নিজের আবাসন কক্ষে ফিরে যাবার জন্য হুমায়ুন তিন অংশে বিভক্ত ঢালু পাথুরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। নিজের ভাবনায় বিভোর হয়ে সে সিঁড়ির প্রথম অংশ অতিক্রম করে তারপরে বাঁক ঘুরে সিঁড়ির দ্বিতীয় অংশ অতিক্রম করার ঠিক আগ মুহূর্তে সে কয়েকটা কণ্ঠস্বর শুনে দাঁড়িয়ে যায়।
আমি ভেবেছিলাম সম্রাট নিজের পাগলামি থেকে পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করেছেন। মাসের পর মাস বিনা প্রতিবাদে আমরা তাঁর পাগলামি সহ্য করেছি…গ্রহের প্রভাবযুক্ত দিন সম্বন্ধে আর সৌরমণ্ডল অঙ্কিত সেই আহাম্মকের সতরঞ্জি যতসব ফালতু ধারণা। আমাদের নিজের ইচ্ছামতো মূত্র বিসর্জনের অনুমতি ছিল বলে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম…।
সেই ঘামের গন্ধঅলা ক্ষুদে চাষার ব্যাটার দরবার হলের কাছাকাছি কখনও পৌঁছাতে পারারই কথা না, রাজকীয় সিংহাসনে উপবেশনের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিছুক্ষণ বিরতির পরে আরেকটা কণ্ঠস্বর মন্তব্য করে। সম্রাট যদি তাঁকে একান্তই পুরস্কৃত করতে চাইতেন, একটা তামার মুদ্রা দিয়ে পাছায় কষে একটা লাথি দিয়ে বিদায় দিলেও চলতো। আমি আশা করি এটা কোনো নতুন পাগলামি সূচনা নয়। ঘাড়ের উপরে শেরশাহের যোদ্ধারা যখন নিঃশ্বাস ফেলছে তখন স্বপ্নদর্শীর চেয়ে আমাদের একজন যোদ্ধার বেশী প্রয়োজন।
