হঠ যাও। মহামান্য সুলতানের কাছাকাছি যাবার কথা কল্পনাও করতে যেও না।
হুমায়ুন ঘুরে দাঁড়িয়ে তার পেছনে যেখান থেকে চিৎকারটা এসেছে সেদিকে তাকায়। দীর্ঘকায়, কালো পাগড়ি পরিহিত এক প্রহরী তার সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে থাকা একটা ছোটখাট অবয়বের কব্জি শক্ত করে ধরে রেখেছে।
তিনি আমাকে আসতে বলেছেন- দুই এক ঘন্টার জন্য তাঁর সিংহাসনে আমাকে বসতে দেবেন।
বাছা রোদে কি তোমার মাথা ঘুরে গিয়েছে? তাঁকে অসম্মান করলে- কপাল যদি ভালো হয় তাহলে তোমাকে কেবল চাবকে ছেড়ে দেয়া হবে আর খারাপ হলে হাত আর পা বেঁধে হাতির পায়ের নীচে ফেলে দেয়া হবে।
হুমায়ুন প্রহরীর হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে মোচড়াতে থাকা দৃঢ় কণ্ঠের অধিকারী অবয়বের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। অবয়বটা আর কারও না, তার প্রাণ রক্ষাকারী ভিস্তি নিজামের।
ওকে আসতে দাও। প্রহরী সাথে সাথে আদেশ পালন করে এবং নিজাম হুমায়ুনের সামনে মাথা নত করে হাটু ভেঙে বসে পড়ে।
নিজাম, তুমি উঠে দাঁড়াতে পার। গঙ্গা অতিক্রম করতে আর চৌসার রণক্ষেত্রে তুমি আমাকে কিভাবে সাহায্য করেছিলে আমার সেটা ভালোই মনে আছে। আমার এটাও মনে আছে কোনো পুরষ্কারের জন্য তুমি কিভাবে নিষেধ করেছিলে এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আমি বলেছিলাম যে সামান্য সময়ের জন্য তুমি আমার সিংহাসনে উপবেশন করতে পারবে আর সে সময়ে তোমার যেকোনো আদেশ পালন করা হবে। হুমায়ুনের দেহরক্ষী আর সেখানে উপস্থিত অমাত্যবৃন্দ যাদের ভিতরে কাশিম আর বাইসানগারও রয়েছেন যারা দরবার কক্ষে যাবার তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন সবাই নিজেদের ভিতরে বিস্মিত দৃষ্টি বিনিময় করে কিন্তু হুমায়ুন তাঁদের সবার বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে। আমাদের অস্থায়ী সম্রাটের পক্ষে মানানসই একটা আলখাল্লা নিয়ে এসো, হুমায়ুন জওহরকে আদেশ দিতে, কয়েক মিনিটের ভিতরে সে লাল মখমলের তৈরী একটা আলখাল্লা এবং একই উপকরণ দিয়ে তৈরী সোনার জরি দিয়ে কারুকাজ করা পরিকর এনে হাজির করে।
নিজাম তার চারপাশে গোলাপজলের বুদ্বুদ উঠতে থাকা ঝর্ণা আর দূর্গ প্রাঙ্গণের ফুলের বাগানের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তাকে এখন আর আগের মতো আত্মবিশ্বাসী দেখায় না এবং জওহর আলখাল্লা হাতে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে সে গুটিয়ে যায়।
নিজাম, ভয় পেয়ো না। হুমায়ুন কিশোর ছেলেটার কাঁধ চাপড়ে দেয়। অনায়াসে নিজের সবচেয়ে প্রিয় অভিপ্রায় সবসময়ে সিদ্ধ হয় না। জওহরের হাত থেকে আলখাল্লাটা নিয়ে সে নিজে সেটা নিজামকে পরিয়ে দেয় এবং কোমর আর ডান কাঁধের রূপার বকলেস এঁটে দিয়ে পরিকরটা নিজামের ছোটখাট দেখতে অবয়বের চারপাশে জড়িয়ে দেয়। মখমলের আলখাল্লায় ঝাঁকড়া মাথার কিশোর ভিস্তিকে হয়ত খানিকটা হাস্যকর দেখায় কিন্তু নিজাম সোজাভাবে উঠে দাঁড়ালে তাঁর মস্তকবাহী দেহখাঁচায় উপযুক্ত মর্যাদা ফুটে উঠে।
চল, এবার এগোন যাক। হুমায়ুন দরবার হলের বাইরে অবস্থানরত ঢাকির দিকে তাকিয়ে ঈষৎ মাথা নোয়াতে, সম্রাটের আগমন বার্তা ঘোষণা করে, তারা সাথে সাথে সোনার উপরে নীলকান্তমণির কারুকাজ করা কাঠামোতে রক্ষিত মোষের চামড়া দিয়ে মোড়ান লম্বা ঢাকে হাতের তালু দিয়ে বোল তুলতে আরম্ভ করে।
নিজাম এসো, আমরা দুজন একসাথে যাই- তুমি এক ঘন্টার সম্রাট, আমি কবর পর্যন্ত নেতৃত্বের বোঝা বহনের জন্য জন্ম নেয়া সম্রাট।
হুমায়ুনের অমাত্য আর সেনাপতিরা যেখানে অপেক্ষা করছে সেই দরবার হলের দিকে হুমায়ুন আর নিজাম শোভাযাত্রা সহকারে এগিয়ে যায়। সিংহাসনের দিকে তারা এগিয়ে যাবার সময়, হুমায়ুন থমকে থেমে নিজামকে আলতো করে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়। বিস্ময়ের একটা তুমুল শব্দের ভিতরে, নিজাম ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সিংহাসনে আরোহন করে, ঘুরে দাঁড়ায় এবং সবশেষে উপবেশন করে।
হুমায়ুন হাত তুলে নিরবতা বজায় রাখতে বলে। চৌসার বিপর্যয়ের পরে আমার জীবন বাঁচাবার জন্য, এই কিশোর নিজাম ভিস্তির আনুগত্য আর সাহসিকতার কথা আমি পুরো দরবারের সামনে কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করছি। আমি নিজামকে সেদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে আমার সিংহাসনে কিছুক্ষণের জন্য আরোহন করে সে তার ইচ্ছামতো যেকোনো ঘোষণা করতে পারবে। সে ইতিমধ্যে নিজেকে এর যোগ্য হিসাবে প্রতিপন্ন করেছে এবং আমি জানি, তাঁর হাতে আমি যে ক্ষমতা তুলে দিয়েছি সেই ক্ষমতার সে অপব্যবহার করবে না। নিজাম- কি তোমার অভিপ্রায়?
হুমায়ুন কৌতূহলী হয়ে উঠে। নিজাম নিজের জন্য কি চাইবে? অর্থসম্পদ, জমিদারী নাকি ধনরত্ন? সে অবশ্যই জানে যে তাঁর জীবন এবং তার পরিবারের সবার জীবন আর কখনও আগের মতো থাকবে না। নিজামের অভিপ্রায় মঞ্জুর করতে পেরে তাঁর ভালো লাগে।
সুলতান… সিংহাসনের উপর থেকে নিজামের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ আর কীচকী শোনায়। নিজামও বোধহয় সেটা বুঝতে পারে, সে আবার চেষ্টা করে। সুলতান। তার কিশোর কণ্ঠ এইবার স্পষ্ট আর যথার্থভাবে ধ্বনিত হয়। আমি কেবল দুটো আদেশ করতে চাই। গঙ্গার তীরে আমি যেন অনুদান হিসাবে একখণ্ড জমি লাভ করি যেখানে আমি শস্য উৎপাদন করতে পারবো এবং এক বছরের জন্য সব ভিস্তিদের কর মুওকুফ করা হোক।
