হুমায়ুন হাত তুলে আহমেদ খানের আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়াস থামিয়ে দেয়। হুমায়ুন, যা ঘটে গিয়েছে তার দায়দায়িত্ব বিচার বিবেচনা না করেই খানিকটা হলেও অনুগত আর মারাত্মকভাবে আহত আহমেদ খানের উপরে চাপিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সেটা করা অনুচিত হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতার অধিকারী, প্রধান সেনাপতি আর সম্রাট সে নিজে। ব্যাথা আর ক্ষতস্থান শুকাতে শুরু করায় আরম্ভ হওয়া চুলকানির কারণে ঘুমাতে না পেরে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে নিজেকে অনবরত প্রশ্ন করতে থাকে, কেন তাকে এভাবে পরাজয় বরণ করতে হল। মানুষের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে খানজাদা তাঁকে যেমন বারবার অনুরোধ করেছে সে কি সেসবের তোয়াক্কা না করে বড় বেশী অহঙ্কারী হয়ে পড়েছিল, সে যা শুনতে চায় কেবল সেটাই শোনার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছিল। সে জানে যে সে আত্মতুষ্টিতে আপ্লুত হয়ে পড়েছিল কিন্তু তাঁর রণনীতিতেও কি কোনো খুঁত ছিল? অবশ্য, অতীত রোমন্থন করে সে নিজেকে বিষণ্ণ করে তুলতে চায় না বরং পরাজয়ের এই তিক্ততা কাটিয়ে এহেন পরিস্থিতির যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেটাই নিশ্চিত করতে চায়। এই বিষয়ে সে স্থিরপ্রতিজ্ঞ। বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে রাজ্য শাসনের অভিপ্রায় তার মাঝে আরও তীব্র হয়ে উঠে।
আহমেদ খান, আমি তোমাকে দোষারোপ করছি না কিন্তু ভবিষ্যতে নদীর উভয় তীরে যেন আমাদের যতবেশী সম্ভব গুপ্তদূত মোতায়েন থাকে। আমার ফুপুজান এবং অন্যান্য রাজমহিষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের সঙ্গে অবস্থানকারী সেনাবাহিনীর কি খবর?
এতে বিপর্যয়ের ভিতরে একমাত্র সুসংবাদ কেবল তাদের কাছ থেকেই এসেছে। অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাতের ভিতরেও তারা বেশ দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চলেছে এবং আশা করছে সাত কি আট সপ্তাহের ভিতরে তাঁরা আগ্রা পৌঁছে যাবে।
বেশ। বাবা ইয়াসভালের দিকে ঘুরে এবার হুমায়ুন জিজ্ঞেস করে, আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে আমাকে বলেন।
সুলতান, আমাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। আমাদের পঞ্চাশ হাজারেরও বেশী সৈন্য হয় মৃত নতুবা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে বা পালিয়ে গেছে, এবং আমরা সেইসাথে নিদেনপক্ষে প্রায় সমসংখ্যক ঘোড়া, হাতি আর বারবাহী পশুও হারিয়েছি। আমরা আমাদের কয়েকটা মাত্র কামান নিয়ে আসতে পেরেছি এবং সেগুলোর বেশীরভাগই আবার ছোট। যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য গচ্ছিত অর্থ আর অন্যান্য যুদ্ধ উপকরণের সিংহভাগও আমরা খুইয়েছি।
আমি এমনটাই আশঙ্কা করছিলাম। নিজেদের সংগঠিত আর সুসজ্জিত করতে আমাদের সময় দরকার। আমাদের মিত্রদের মনে বিদ্রোহ বা স্বপক্ষ ত্যাগের মতো কোনো প্রকার হঠকারী ভাবনা সৃষ্টি হবার আগেই তাদের আশ্বস্ত করতে আমাদের দূত প্রেরণ করা উচিত। শেরশাহের মতো, আমরাও ঠিক এই মুহূর্তে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার মতো অবস্থায় নেই। আমাদের উচিত হবে, গঙ্গার তীর বরাবর আমাদের অগ্রযাত্রা বজায় রাখা। এই ধরনের পশ্চাদপসারণে কোনো লজ্জা নেই যদি সেটা বিজয়ের পূর্বাভাস ঘোষণা করে, আর আমাদের কর্তব্য হবে সেটাই নিশ্চিত করা।
*
বৃষ্টিপাত যদিও থেমে গেছে এবং সূর্য এখন আকাশে স্বমহিমায় বিরাজমান থাকায়, হুমায়ুনের দরবার কক্ষের সামনের প্রাঙ্গণের ফোয়ারাগুলোর বুদ্বুদে রঙধনুর মাত্রা সৃষ্টি হয়েছে, আগ্রা দূর্গে তাঁর দর্শনার্থী কক্ষ এখনও জলীয় বাষ্পের কারণে ভেজা আর চিকচিক করছে। চৌসার সেই ভাগ্যবিড়ম্বিত যুদ্ধের পরে প্রায় চারমাস অতিক্রান্ত হয়েছে। হুমায়ুন আগ্রার দক্ষিণে প্রায় একশ বিশ মাইল দূরে শেরশাহের যেকোনো অপ্রত্যাশিত অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করতে নিজের মূল বাহিনীকে মোতায়েন রেখে, সে নিজে রাজধানী আগ্রায় ফিরে এসেছে আরও সৈন্য সংগ্রহ করতে।
আগ্রা পৌঁছাবার পরে সেখানে তার জন্য আরও দুঃসংবাদ অপেক্ষা করেছিল। বাংলায় শেরশাহজনিত কারণে তার ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহ আর তার মিত্র লোদীদের রাজ্যাভিযোগী পাহাড়ের গোপন আশ্রয় ছেড়ে নেমে এসে গুজরাতের শক্তঘাঁটি থেকে সেখানে হুমায়ুনের রেখে আসা শাসক আর তাদের সামান্য সংখ্যক সৈন্যদের বিতাড়িত করেছে। হুমায়ুন বুঝতে পারে যে তাঁর পক্ষে দুটো রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করা অসম্ভব, সে তাঁর উজির এবং তাঁর মরহুম আব্বাজানের সময়ে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ দৌত্য অভিযানে অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কাশিমকে গুজরাতে প্রেরণ করে একটা শান্তি চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা করতে। গুজরাত যদি তাকে তাদের নামেমাত্র অধিরাজ হিসাবে স্বীকার করে নেয় তাহলে সে গুজরাতের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ফিরিয়ে দিতে রাজি আছে।
এক সপ্তাহ পূর্বে ক্লান্ত, ধূলায় ধুসরিত কিন্তু কান পর্যন্ত বিস্তৃত হাসি নিয়ে কাশিম তাঁর ঘোড়া থেকে নেমে হুমায়ুনকে বলে যে গুজরাতের সুলতান তার প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি হয়েছেন। দরবারে অপেক্ষমান অমাত্য আর সেনাপতিদের সাথে মিলিত হতে দূর্গ প্রাঙ্গন অতিক্রম করার সময় হুমায়ুন অন্যান্য আরও উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির কথা বিবেচনা করে। তাঁর সৎ-ভাইয়েরা তাদের নিজ নিজ প্রদেশ থেকে আপাতত অল্প সংখ্যক সৈন্যের দল প্রেরণ করেছে ভবিষ্যতে আরও বেশী সংখ্যক সৈন্য প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কামরান আর তাঁর অন্যান্য সৎ-ভাইদের ভিতরে অন্তত এখনও পর্যন্ত তার দুর্ভাগ্যকে তারই বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উসিলা হিসাবে ব্যবহারের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বরং শেরশাহের বিদ্রোহ যেন তাদের ভাইদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। হুমায়ুন নিজেকে আশ্বস্ত করতে চায়, সবকিছু আবার আগের মতো হবে এবং তার মুখে হাল্কা হাসির একটা আভাস ফুটে উঠে।
