হুমায়ুন দ্রুত দুবার হাত ঝাপটায় এবং সে পায়ের নীচে মাটি খুঁজে পায়, নরম কাদা তার পায়ের পাতার নীচে পিছলে যেতে থাকে। নিজামকে পাশে নিয়ে নিজের শেষটুকু একত্রিত করে সে পানিতে জবজবে হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে টলমল করে পানি থেকে উঠে আসে।
সুলতান, আমাদের পাড়ের আরেকটু ভিতরে যেতে হবে।
নিজামের সাহায্যে হোঁচট খেতে খেতে হুমায়ুন আরও দশ গজ হেঁটে যায়। আপাত নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে, সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে কুমীরটার হলুদাভ চোখ আর তীরে একেবারে নিকটে সুচালো মাথাটা পানিতে ভেসে রয়েছে দেখতে পায়। তার চোখের সামনেই সরীসৃপটা মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং একটা মোচড় খেয়ে গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। কুমীরটা বেশ ছোট তাঁকে হয়তো ধরাশায়ী করতে পারতো না কিন্তু ব্যাপারটা সে পর্যন্ত গড়ায়নি বলে সে ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানায়।
সুলতান, আমি গিয়ে আপনার সেনাপতিদের খুঁজে বের করি এবং আপনার আহত হবার সংবাদ তাদের জানাই আর আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য তাদের লোক পাঠাতে বলি। আমি আমার বাবাকে খুঁজতে- তারপরে আবার সাঁতরে নদী পার হব। সেনাছাউনির অস্থায়ী রন্ধনশালায় সে রাঁধুনির কাজ করে এবং শেরশাহের প্রথম আক্রমণের পর থেকে আমি আর তাকে দেখিনি।
কিন্তু এতোক্ষণ তুমি আমাকে এসব কিছুই বলনি।
আমি জানি প্রথমে আপনাকে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।
তোমার সাহসিকতা আর আনুগত্যের উপযুক্ত পুরষ্কার আমি যেন তোমাকে দিতে পারি সেজন্য আমার সাথে তোমাকে যেতে হবে।
না, সুলতান- আমার বাবাকে আমায় খুঁজে পেতেই হবে। নিজাম উত্তর দেয়, তাঁর কচি মুখে একটা অটল সংকল্প ফুটে আছে।
হুমায়ুনের মাথায় একটা অদ্ভুত চিন্তা খেলে যায়। আবেগতাড়িত হয়ে সে নিজের অজান্তে ভাবনাটা বলে যায়। ভিস্তিদের মাঝে প্রতিপালিত হলেও তুমি স্বভাবে একজন যুবরাজ। আমি আমার রাজধানীতে যখন ফিরে যাব, আমার সাথে দেখা করবে এবং সেখানে আমার সিংহাসনে উপবেশন করে সত্যিকারের সম্রাটের মতো এক কি দুই ঘন্টার জন্য রাজত্ব পরিচালনা করবে। তুমি যে আদেশ দেবে সেটাই পালন করা হবে।
নিজামকে বিভ্রান্ত দেখায় এবং তারপরে সে ফিক করে হেসে উঠে আর খুশীতে তোতলাতে তোতলাতে, জ্বী সুলতান, বলে সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে গঙ্গার তীরের কর্দমাক্ত আর উঁচুনীচু পাড়ের উপর দিয়ে হুমায়ুনের অবশিষ্ট সেনাবাহিনীর খোঁজে দৌড়ে যায়।
২.২ একটি প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন
০৭. একটি প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন
চৌসার দুই দিন আগের রণক্ষেত্র থেকে গঙ্গার বিশ মাইল উজানে হুমায়ুন নিজের অস্থায়ী সেনাশিবিরে তাঁর সেনাপতিদের ভিতরে যারা তার চারপাশে উপস্থিত রয়েছে তাদের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে। সুলেমান মির্জার মৃত্যুর খবর সে আগেই শুনেছে এবং সেদিন তার সাথে আরও যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের সবার রুহের মাগফেরাত কামনায় গভীর শ্রদ্ধাভরে সে মোনাজাতে অংশ নেয়। বাবা ইয়াসভালো এখানে উপস্থিত রয়েছে যদিও হুমায়ুনের চেয়েও মারাত্মকভাবে তিনি আহত। তার চেয়েও বিস্ময়কর, ফ্যাকাশে মুখ আর দড়িরমতো বাদামী শ্মশ্রুমণ্ডিত আহমেদ খানের উপস্থিতি। তার আহত উরুতে ভারী পটি বাঁধা এবং কাঠের শক্তপোক্ত দেখতে একটা ক্রাচে ভর দিয়ে তিনি ভীড়ের ভিতরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
নিজাম গঙ্গার তীরে হুমায়ুনকে রেখে যাবার কয়েক মিনিটের ভিতরেই তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর একটা দল তাঁর কাছে উপস্থিত হয়। হাকিমেরা তাঁর হাতের ফাঁক হয়ে থাকা লম্বা আর গভীর ক্ষতস্থানের মুখ ধুয়ে সেলাই করে তারপরে ঔষধি লাগিয়ে সেটার উপরে স্বচ্ছ মসলিনের পটি বেঁধে দিয়েছে কিন্তু ব্যাথানাশক হিসাবে সে আফিম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। এই মুহূর্তে পরিষ্কারভাবে চিন্তা করা তার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সে নিজের আঙ্গুল নাড়াতে পারছে দেখে ভাগ্যের কাছে কৃতজ্ঞবোধ করে কিন্তু ক্ষতস্থানটা প্রায়ই আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠে, কখনও সেখানে কোনো বোধ থাকে না আর যতবারই আহত হাতটা কোনো কিছু স্পর্শ করে ততবারই অবর্ণনীয় একটা ব্যাথায় তার সারা শরীর আপ্লুত হয়ে উঠে। কিন্তু এসব সত্ত্বে এযাত্রায় প্রাণে বেঁচে যাবার জন্য সে মনে মনে সুষ্ঠাকে ধন্যবাদ জানায়। যুদ্ধে সে ভীষণভাবে পরাজিত হয়েছে কিন্তু নিজের হারান ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে সে বদ্ধ প্রতিজ্ঞ ঠিক যেমন তাঁর আব্বাজান বাবর বিরুদ্ধতার মুখোমুখি হয়ে যেভাবে তা মোকাবেলা করতেন।
আহমেদ খান, শেরশাহের সর্বশেষ গতিবিধির কি খবর? সে জানতে চায়।
সে চৌসার পরে আর অগ্রসর হয়নি। সে আর তার লোকেরা এই মুহূর্তে আমাদের ফেলে আসা সিন্দুকের ধনসম্পদ ভাগাভাগি আর গঙ্গার কর্দমাক্ত তীরে কাদায় ডুবে থাকা কামানগুলো পানির আরো গভীরে তলিয়ে যাবার আগে সেগুলো উদ্ধার করতেই ব্যস্ত। তারও আমাদের মতে, প্রচুর সৈন্য নিহত হয়েছে। অন্যেরা লুটের মালের বখরা বুঝে নিয়েই হয়ত দেশের দিকে সটকে পড়বে।
আহমেদ খান, তুমি এসব বিষয়ে একদম নিশ্চিত? গতবার শেরশাহের হতবাক করে দেয়া আক্রমণ সম্বন্ধে তুমি আমাদের আগাম অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলে।
জ্বী, সুলতান, আহমেদ খান মাথা নীচু করে এবং পুনরায় কথা বলার পূর্বে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। শেরশাহ শান্তি চায়, আমাদের অনেকের মতো, আমাকেও এই ধারণাটা বিভ্রান্ত করেছিল। আমি তারপরেও গুপ্তদূত প্রেরণ করেছিলাম কিন্তু যতটা তৎপর হওয়া উচিত ছিল আমি সেটা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছি। আর আমি যাদের প্রেরণ করেছিলাম সম্ভবত তারাও খুব একটা সতর্ক ছিল না…আর তারপরে আবহাওয়ার এই অবস্থায়…এবং শেরশাহের বাহিনীর দ্রুতগতি
