নিজাম, সবচেয়ে কাছে কোথায় আমার সৈন্যরা আছে?
আপনাকে আগেই আমি বলেছি, নদীর এই পাড়ে যারা ছিল তাঁরা সবাই পালিয়েছে। কিন্তু অপর তীরে এখনও বিপুল সংখ্যায় তারা অবস্থান করছে- ঐ যে দেখেন। ধোয়া উঠতে থাকা কর্দমাক্ত তীর আর নদীর মাঝে বিদ্যমান চরের অপর পাশে নিজাম আঙ্গুল দিয়ে দেখায়। হুমায়ুন সেখানে অশ্বারোহী লোকদের বিশাল একটা দলকে দেখতে পায়।
তুমি নিশ্চিত তারা আমার লোক?
জ্বী, সুলতান। এপাড় থেকে অনেকেই সাতরে ওপাড়ের ঐ দলটার সাথে যোগ দিয়েছে।
হুমায়ুন ভাবে, নিজাম নিশ্চয় ঠিকই বলছে। শেরশাহ তাঁর সৈন্যদের পাশ কাটিয়ে গিয়ে, নদী অতিক্রম করে পেছন থেকে যাতে তাঁকে অতর্কিতে আক্রমণ করতে না পারে সেজন্য অপর পাড়ে একদল সৈন্য মোতায়েন করে সে বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছে।
আমাকে অবশ্যই তাদের সাথে মিলিত হতে হবে। হুমায়ুন কথার মাঝে টলমল করতে করতে উঠে দাঁড়ায় কিন্তু তার পা দেহের ভার নিতে গিয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে এবং আবার তার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠে।
সুলতান, আমার উপরে ভর দিয়ে দাঁড়ান।
নিজামের হাড়সর্বস্ব কাঁধে হুমায়ুন খুশী মনে নিজের বাম হাত রাখে। আমাকে নীচে পানির কাছে যেতে সাহায্য কর যাতে আমি সাঁতরে নদী পার হতে পারি।
কিন্তু আপনি ভীষণ দুর্বল। আপনি ডুবে যেতে পারেন।
আমার চেষ্টাটা করতেই হবে। শত্রুর হাতে ধরা পড়াটা আমার জন্য দারুণ অসম্মানের একটা ব্যাপার হবে।
নিজাম চারপাশে তাকায় এবং নিজের সবচেয়ে বড় দুটো ছাগলের চামড়ার মশকের দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষিত হয় আর সে হুমায়ুনের দিকে তাকায়। সুলতান আপনি কি কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন? মনে হয় আমি একটা বুদ্ধি পেয়েছি।
হুমায়ুনের কাছ থেকে সম্মতি লাভ করতে, সে দৌড়ে মশকের কাছে যায় এবং ছিপি খুলে মশক দুটো খালি করে। তারপরে, হুমায়ুনকে বিস্মিত করে, সে বড় মশকটা তুলে নিয়ে সেটার মুখে নিজের ঠোঁট রাখে এবং ফুঁ দিতে শুরু করতে, তার চোখ দুটো ঠিকরে কপাল থেকে বের হয়ে আসতে চায় এবং গালের চামড়া ফুলে উঠে। কিছুক্ষণ পরে হুমায়ুন দেখে যে মশকটা ফুলতে শুরু করেছে এবং অচিরেই মশকটার চামড়া বাতাসে টানটান হয়ে উঠে। নিজাম ছিপি দিয়ে মুখটা বন্ধ করে এবং মশকটা হুমায়ুনের কাছে নিয়ে এসে, দ্রুত অপর মশকটাকেও একইভাবে ফুলিয়ে তোলে এবং খেলাচ্ছলে সেটার গায়ে একটা টোকা দিয়ে আপন মনেই হেসে উঠে। এটা দিয়েই কাজ হবে। সুলতান যা করার আমাদের দ্রুত করতে হবে। শেরশাহের লোকেরা খুব শীঘই লুটপাট করতে তাদের শত্রুদের মৃতদেহের খোঁজে চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে। আমি আপনার বর্ম লুকিয়ে রেখেছি ফলে আলো পড়ে সেটা চকচক করবে না কিন্তু তারা নদীর পাড় তন্নতন্ন করে খুঁজবে।
আমি জানি কিন্তু আমাকে প্রথমে তুমি আমার সাহসী ঘোড়াটার কাছে নিয়ে চল। আমি নিশ্চিত হতে চাই যে সে মারা গেছে নতুবা তার দুর্দশা থেকে আমি তাকে মুক্তি দিতে চাই। সে আমার অনেক যুদ্ধের সাথী আর নিজের দায়িত্ব সে দারুনভাবে পালন করেছে। ঘোড়াটার কাছে গিয়ে এক ঝলক তাকিয়েই হুমায়ুন বুঝতে পারে যে কালো স্ট্যালিয়নটা আসলেই মারা গেছে। তারপরে নিজামের কাঁধে ভর দিয়ে সে নদীর উঁচু নীচু পাড়ের ভিতর দিয়ে নদী অববাহিকার দিকে এগিয়ে যায়। সে ক্লান্তিতে দুবার বসে পড়ে কিন্তু প্রতিবারই নিজাম- বাতাস ভর্তি মশক দুটো নিয়েই বেচারা হিমশিম খাচ্ছে- তাঁকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে। দশ মিনিট প্রাণান্তকর পরিশ্রমের পরে এই অসম জুড়ি গঙ্গার তীরে এসে পৌঁছে। নিজাম বাতাস ভর্তি মশক দুটো হুমায়ুনের দিকে এগিয়ে দেয়।
নিজাম, তোমাকে ধন্যবাদ। এবার দ্রুত পালাও আর নিজের প্রাণ বাঁচাও।
না, সুলতান, আমি আপনার সাথে থাকবো নতুবা আপনি পানিতে ডুবে যাবেন।
বেশ মরার যখন এতোই শখ, তাহলে আগে আমার পায়ের নাগরা দুটো খুলে দাও, হুমায়ুন নদীর তীরে শোয়া আর বসার মাঝামাঝি বিচিত্র এক ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে। নিজাম দ্রুত মোটা চামড়ার তৈরী ভারী নাগরা জোড়া টেনে খুলে দেয়, তার নিজের জন্য চিন্তা নেই কারণ সে আজীবনই খালি পায়ে হেঁটেই অভ্যস্ত এবং হুমায়ুনকে ধরে হাঁটুপানিতে নিয়ে আসে।
সুলতান, আপনার ভালো হাত আর পা দিয়ে সাঁতার কাঁতে চেষ্টা করবেন। আপনার ডান হাতের নীচে বাতাস ভর্তি একটা মশক রাখতে চেষ্টা করবেন আর দ্বিতীয়টা রাখবেন আপনার থুতনির নীচে। আমি আপনাকে সাতারের দিক ঠিক রাখতে সাহায্য করবো।
তারা ধীরে ধীরে সাঁতার কাঁতে থাকে, একটা সময়ে হুমায়ুনের মনে হয় তারা বোধহয় মাঝ নদীতে এসে পৌঁছেছে। পানিতে ভিজে যাওয়াও তাঁর আহত ডান হাতে আবারও তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয় কিন্তু ব্যাথার ঝাপটায় তার মাথা পরিষ্কার কাজ করতে শুরু করে। সে কোনোভাবেই মারা যাবে না- এটা তার নিয়তি না- আর সে। আরও দ্রুত নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে প্রাণপনে পা ঝাপটাতে শুরু করে। পানিতে নামার পরে খুব ভালো করেই নিজামের গুরুত্ব টের পাওয়া যায় এবং হুমায়ুনকে টেনে কখনও ধাক্কা দিয়ে অপর তীড়ের দিকে তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। কয়েক মিনিট পরে, নদীর দক্ষিণ তীর থেকে তাঁরা যখন মাত্র পাঁচ গজ দূরে নিজাম হঠাৎ করে আতঙ্কিত হয়ে উঠে পা দিয়ে পাগলের মতো পানিতে আঘাত করে আর হাত দিয়ে হুমায়ুনকে টানতে থাকে। সুলতান, একটা কুমীর- ব্যাটা নির্ঘাত আপনার ক্ষতস্থান থেকে বের হওয়া রক্তের গন্ধ পেয়েছে। বদমাশটার সুচালো মাথা আমাদের ঠিক পেছনেই রয়েছে। জলদি!
