*
সুলতান।
উজ্জ্বল আলোয় হুমায়ুনের চোখ খোলার চেষ্টা করতে ধবধবানি বেড়ে যায় এবং সে পুনরায় তাদের অর্ধনিমীলিত করে ফেলে। সে যখন পুনরায় চেষ্টা করে তখনও একই দীপ্তি বিরাজ করে। অবশেষে সে বুঝতে পারে যে চিৎ হয়ে শুয়ে সে মধ্যাহ্নের সূর্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
সুলতান। সেই একই কণ্ঠস্বর আবার ভেসে আসে এবং অনিশ্চিত ভঙ্গিতে একজোড়া হাত তার কাঁধ ধরে মৃদুভাবে ঝাঁকায়। তাঁর পরণে এখন আর কোনো রকমের বর্ম নেই। সেসব কোথায় গেল? সে কি তবে ধরা পড়েছে? সে ক্রমশ ধাতস্থ হয়ে উঠার মাঝেই মাথা ঘুরিয়ে কণ্ঠস্বরটার কার খুঁজে দেখতে চেষ্টা করে এবং ধীরে ধীরে একটা বাদামী রঙের মুখাবয়ব তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠে, যেখানে তার জন্য উদ্বেগের একটা অভিব্যক্তি ফুটে রয়েছে।
আপনি কে?
হুজুর আমার নাম নিজাম। আমি আপনার সেনাবাহিনীর একজন নগন্য ভিত্তি।
আমি এখন কোথায়?
সুলতান, আপনি গঙ্গার তীরে শুয়ে আছেন। চামড়ার মশকে নদী থেকে যখন পানি সংগ্রহ করছিলাম আপনার সৈন্যদের কাছে নিয়ে যাবার জন্য তখন আমি আপনার বিশাল কালো ঘোড়াটাকে এখান থেকে মাইলখানেকের দূরত্বে অবস্থিত যুদ্ধক্ষেত্রের দিক থেকে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখি, আপনি ঘোড়ার গলা জড়িয়ে অচেতন হয়ে আছেন। ঘোড়াটা যখন আরো নিকটে আসে এর হাটু নিজে থেকেই ভাঁজ হয়ে যায় আর জন্তুটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘোড়াটা যখন ভূপতিত হতে যাচ্ছে তখন আপনি এর পিঠ থেকে পিছলে মাটিতে পড়ে যান।
ঘোড়াটা এখন কোথায়? আমার লোকেরাই বা কোথায়?
ঘোড়াটা দূরে ওখানে পড়ে রয়েছে। মৃত অবস্থায়। সুলতান আমার মনে হয় জন্তুটা ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যদিও বেচারার সারা গায়ে অসংখ্য ছোটখাট ক্ষত রয়েছে আর পশ্চাদভাগে একটা গভীর ক্ষতস্থান।
হুমায়ুনের নিজেকে খানিকটা সুস্থ মনে হতে সে বাম কনুইয়ের উপরে ভর দিয়ে নিজেকে একটু উঁচু করে এবং দেখে যে সত্যিই তার কালো স্ট্যালিয়নটা বিশ গজ দূরে জীহ্বা বের করা অবস্থায় গলা সামনের দিকে প্রসারিত করে মাটিতে পড়ে রয়েছে। কালচে-সবুজ রঙের ডুমো মাছির একটা ঝাক ইতিমধ্যে জন্তুটার মুখ, নাসারন্ধ্র আর অন্যান্য ক্ষতস্থানের কাছে ভীড় করতে শুরু করেছে।
আর আমার লোকেরা?
শেরশাহের বাহিনী পেছন থেকে ধাওয়া করতে যারা অনেককেই তাদের পর্যান থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলেছে, আপনার বেশীর ভাগ লোক নদীর তীর বরাবর পূর্ব দিকে পালিয়েছে। নদী এখান থেকে সিকিমাইল দূরত্বে যেখানে অগভীর অনেকে সেখান দিয়ে নদী পার হয়ে অপর পাড়ে চলে গিয়েছে যেখানে এখনও আপনার কিছু সংখ্যক সৈন্য অবস্থান করছে।
আমাকে কি কেউ অনুসরণ করেনি?
না। আর বিশেষ করে এই স্থানটা কর্দমাক্ত আর ঢালু হবার কারণে সহজে দেখা যায় না, তাই এখন পর্যন্ত কেউ এখানে আসেনি। সুলতান, আপনি কি একটু পানি পান করবেন?
আছে, একটু দাও। সহজাত প্রবৃত্তির বশে মশকের জন্য হুমায়ুন হাত বাড়িয়ে দেয়। হাতটা আড়ষ্ট আর বোধহীন হয়ে আছে। খণ্ডযুদ্ধ আর নিজের আহত হবার ঘটনা তার মনে পড়ে। তার বামহাতের ক্ষতস্থানে পটি বাঁধা। পটির দিকে তাকিয়ে সে দেখে- যে গলবটা সে খুলতে ব্যর্থ হয়েছিল সেটা দিয়েই সাদা কাপড়টা দিয়েই পটিটা বাঁধা হয়েছে; আর ক্ষতটা যেখানে গভীর সেখানে মনে হয় যেন একটা চ্যাপ্টা পাথরজাতীয় কিছু রয়েছে।
আমাকে পান করতে সাহায্য কর।
নিজাম তাঁর সবচেয়ে বড় মশকের মুখ থেকে ছিপি খুলে, মশকটার আকার আর আকৃতি দেখে মনে হয় ছোট একটা ছাগলের পুরো চামড়া দিয়ে সেটা তৈরী করা হয়েছে। হুমায়ুনের মাথার নীচে হাত দিয়ে, নিজাম তাঁর মুখে একটু একটু করে পানি ঢালতে থাকে। হুমায়ুন দ্রুত পান করে এবং আরেকটু দিতে বলে। প্রতিটা চুমুকে যেন সে নবজীবন লাভ করে।
ক্ষতস্থানে কি তুমি পটি বেঁধেছো?
জ্বী, সুলতান। যুদ্ধের শেষে আমি হেকিমদের কাজ করতে দেখেছি এবং একজন আমাকে বলেছিল যে গভীর ক্ষতস্থান চেপে রেখে রক্তপাত বন্ধ করার জন্য চ্যাপ্টা পাথর বেশ কাজে দেয়।
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছে। তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে।
তুমি কিভাবে জানো যে আমিই তোমাদের সম্রাট?
আপনার আঙ্গুলের ব্যাঘখচিত অঙ্গুরীয় আর আপনার কোমরের রত্নখচিত তরবারি দেখে। সেনাছাউনিতে ঐ দুটো জিনিষের গল্প আমি প্রচুর শুনেছি।
হুমায়ুনের মাথা এখন পুরোদমে কাজ করছে এবং উঠে বসতে গিয়ে সে টের পায় সে অঙ্গুরীয় কিংবা তার আব্বাজানের তরবারি আলমগীর, যা সে অথবা নিজাম অবশ্যই পুনরায় কোষবদ্ধ করেছে, দুটোই তাঁর সাথে আছে।
আকাশে মধ্যাহ্নের সূর্য দোর্দণ্ডপ্রতাপে বিরাজমান হবার কারণে ভেজা মাটি থেকে নির্গত বাষ্পের সাথে সকালের কুয়াশার একটা অদ্ভুত মিল রয়েছে। নিজের ত্রাণকর্তার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখতে হুমায়ুন লক্ষ্য করে যে নিজাম লোকটা আসলে, যার পরণে কেবল একটা কালো জোব্বা রয়েছে, কৃশকায় আর ছোটখাট এবং সারা গায়ে শুকিয়ে যাওয়া কাদা লেগে রয়েছে, তের কি চৌদ্দ বছরের একটা কিশোর। সে ইচ্ছা করলেই হুমায়ুনের সর্বস্ব হরণ করে পালিয়ে যেতে পারতো কিন্তু সেটা না করে সে নিছক আনুগত্যের খাতিরে তার সাথে রয়েছে। হুমায়ুন পরিষ্কার বুঝতে পারে যে- যদিও যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে যে বিষয়ে সে মোটামুটি নিশ্চিত- তাঁর আব্বাজানের দেয়া সৌভাগ্যবান নামের মহিমা সে এখনও ধারণ করছে। একটা পরাজয়ে কিছুই নির্ধারিত হবে না। বাবর অনেক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর মনে আছে বাবর প্রায়ই বলতেন বিপর্যয়ের সাথে তোমাকে এভাবেই মানিয়ে নিতে হবে। হুমায়ুনের মাথাটা আবার হঠাৎ করে ঝিমঝিম করে উঠে। নিজেকে সে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে, সে খুব ভালো করেই জানে যে তার প্রথম কাজ এখন নিজের সেনাবাহিনীর সাথে পুনরায় মিলিত হওয়া।
