তারিক খান, তুমি বাঁচার অধিকার হারিয়েছে। আমাকে মোকাবেলা কর এবং মানুষের মতো মৃত্যুবরণ কর, যেমন পিচ্ছিল সাপের মতো তোমার চরিত্র সেভাবে নয়। কথাটা শেষ করেই হুমায়ুন আঘাত করে কিন্তু তারিক খান একেবারে শেষ মুহূর্তে ঢালটা তুলে আঘাতটা এড়িয়ে যায় আর একই সাথে নিজের দোধারি রণকুঠার দিয়ে হুমায়ুনকে লক্ষ্য করে পাগলের মতো কোপ বসায়। হুমায়ুন চিৎ হয়ে তার পর্যানে শুয়ে পড়তে কুঠারের ফলা বাতাসে মৃত্যুর শিস তুলে তার উপর দিয়ে পার হয়ে যায় কিন্তু সেই ফাঁকে হুমায়ুন কুঠার দিয়ে বেপরোয়া আঘাত করতে গিয়ে অরক্ষিত হয়ে পড়া তারিক খানের বাহুমূলে আলমগীরের ফলা আমূল ঢুকিয়ে দেয়। ব্যাথায় চিৎকার করে উঠে তারিক খান হাত থেকে কুঠারটা ফেলে দেয় এবং বাহুমূল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে এসে তার গাঢ় সবুজ আলখাল্লাকে ভিজিয়ে দেয়, সে বোধহয় তার ঘোড়র উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে যা তাঁকে নিয়ে ভীড়ের মাঝে হারিয়ে যায়। মুহূর্ত পরেই হুমায়ুন তাঁকে তাঁর ঘোড়ার পর্যান থেকে পিছলে পেছনের দিকে পড়ে গিয়ে কাদায় অন্য ঘোড়ার খুরের নীচে পিষে যেতে দেখে। হুমায়ুন ভাবে, সব বিশ্বাসঘাতকদের এই পরিণতিই হওয়া উচিত।
নিজের চারপাশে তাকিয়ে সে টের পায় যে তার বেশীর ভাগ দেহরক্ষী তাঁর কাছ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু মুষ্টিমেয় যে কয়জন তখনও রয়েছে কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার করে তাঁদের অনুসরণ করতে বলে সে তার কালো ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয়, বিশাল জন্তুটার সারা দেহ এখন সাদা, ফেনার মতো ঘামে চুপচুপ করছে, শেরশাহের ঘোড়া তাঁকে যেদিকে নিয়ে যেতে পারে বলে তার ধারণা সেই অভিমুখে সে এবার ঘোড়া ছোটায়। সে যখন ঘোড়া নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আরোহীবিহীন একটা ঘোড়া, পেছনের পায়ে তরবারির আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতস্থান থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে, তার নিজের ঘোড়ার ডানপাশে এসে ধাক্কা দিতে জন্তুটার গতিপথ বদলে যায় এবং এক মুহূর্তের জন্য হুমায়ুনের বর্ম আবৃত উরু পর্যানের সাথে চাপা খেলে সে ব্যাথায় চোখে মুখে অন্ধকার দেখে। তারপরে, আর্তস্বরে চিহি করে উঠে আরেকদিকে ঘুরে গিয়ে হুমায়ুনের অবশিষ্ট দেহরক্ষীদের একজনের দিকে এগিয়ে যায়। দেহরক্ষীর ঘোড়াটা হুমড়ি খেয়ে মাটিতে আছড়ে পরার সময়ে পিঠের আরোহীকে মাটিতে আছড়ে ফেললে বেচারা ঘাড়ের উপরে ভর দিয়ে মাটিতে পড়ে। আঘাতের ফলে তার মাথার চূড়াকৃতি শিয়োস্ত্রান খুলে গিয়ে মাটিতে দুতিন গড়ান দিয়ে একপাশে কাত হয়ে পড়ে থাকে।
হুমায়ুন তার ঘোড়র উপরে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে, সে বিশাল জটাকে লড়াই যেদিকে ভীষণ রূপ ধারণ করেছে, সেদিকে এগিয়ে যাবার জন্য পা দিয়ে গুতো দেয়। সহসা মাথার উপরের আকাশ বজ্রপাতের শব্দে বিদীর্ণ হয় এবং সেইসাথে আবারও অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়, বৃষ্টির ভারী ফোঁটা মাটির খানাখন্দে জমে থাকা পানিতে আছড়ে পড়ে এবং হুমায়ুনের শিরোস্ত্রানের কিনারা বেয়ে নেমে এসে তাঁর চোখ ভাসিয়ে দেয়। সে তার হাতের চামড়ার দস্তানা খুলে এবং ডান হাত তুলে বৃষ্টির ঝাপটা সরিয়ে দিয়ে চোখ মুছে। কিন্তু চোখ মোছায় ব্যস্ত থাকার কারণে সে তার দিকে ধেয়ে আসা কালো আলখাল্লা পরিহিত দুই অশ্বারোহীকে সময় মতো লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হয় যতক্ষণ না তারা তার উপরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করে। সে আক্রমণকারীদের দেখতে পেলে দ্রুত একপাশে সরে গিয়ে প্রথমজনের আক্রমণ এড়িয়ে যায় কিন্তু তার অরক্ষিত কব্জি আর হাতের পেশীকে দ্বিতীয়জনের তরবারির আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে না, এবং তরবারিটা তার বর্মের নীচে দিয়ে পিছলে গিয়ে তার কনুইয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। কালো ঘোড়াটা তাঁকে তাঁর আততায়ীদের কাছ থেকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে আসে, যাঁরা কাদামাটির কারণে তাকে খুব একটা দ্রুত অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়।
হুমায়ুনের আহত ডান হাত থেকে অঝোরে রক্ত ঝরতে থাকে এবং তাঁর আঙ্গুল বেয়ে নেমে এসে তৈমূরের আংটি ঢেকে ফেলে। সে তার বাম হাত দিয়ে গলায় জড়ান দুধ সাদা রঙের গলবস্ত্রটা খুলতে চেষ্টা করে, সেটা দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করবে বলে কিন্তু সে গলবস্ত্রটা খুলতে পারে না। তার ডান হাতের অবশ আঙ্গুলগুলো কোনমতে তার ঘোড়ার লাগাম ধরে রাখে। তাঁর মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে থাকে এবং চোখের সামনে সাদা আলোর ঝলসানি ভেসে উঠে। নিজের এই উদভ্রান্ত অবস্থার ভিতরে সে কোনোমতে নিজের চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে তার আশেপাশে কোনো দেহরক্ষী উপস্থিত নেই। পরিস্থিতি নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিন্তু এভাবে মৃত্যুবরণ করাটা অবশ্যই তার নিয়তি হতে পারে না। পরাজয় অনিবার্য নয়। নিজের লোকদের পুনরায় একত্রিত করার জন্য তাকে অবশ্যই তাদের কাছে ফিরে যেতে হবে। হুমায়ুন শরীরের শেষ শক্তিটুকু একত্রিত করে লাগামটা টেনে ধরে হাঁপাতে থাকা, পরিশ্রান্ত ঘোড়ার মুখ তার অবশিষ্ট লোকেরা যেদিকে অবস্থান করছে বলে চেতন অচেতনের মাঝে ভাসতে ভাসতে তার মনে হয় সেদিকে ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সে ঘোড়াটার পাঁজরে গুঁতো দিয়ে তাঁকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ইঙ্গিত করে, সামনের দিকে ঝুঁকে গিয়ে জটার প্রশস্ত কালো গলার উপরে এলিয়ে পড়ে, বাম হাতে জন্তুটার পেষল গলার কেশর আকরে ধরতে তার চোখের মণি থেকে চেতনার শেষ রেশটুকুও উধাও হয়ে যায়।
