সুলতান আপনার খোঁজে আমি যখন এখান থেকে যাই, বাবা ইয়াসভালো তার কয়েকজন তরুণ আধিকারিকের সাথে এই ঢালের একটু সামনে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু তিনি আমাকে বলেছিলেন পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক যে তিনি আপনার আগমনের জন্য হয়ত অপেক্ষা করতে পারবেন না তার আগেই প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করা শত্রুপক্ষের অশ্বারোহী বাহিনীকে আক্রমণ করবেন। দূরে ওখানে ঐ ঘোড়সওয়ার বাহিনীর অগ্রভাগে ওটা কি তারই হলুদ নিশান, আমাদের শত্রুদের একটা দলকে দাবড়ে নিয়ে যাচ্ছে?
জওহর তোমার দৃষ্টিশক্তি অসাধারণ। তাঁকে গিয়ে বল ওখানে ঐ ধুসর তাবুর জটলার কাছে আমার সাথে যত বেশী সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্ভব আমার সাথে দেখা করতে। আমার অন্য সেনাপতিদের তলব করে বার্তাবাহক প্রেরণ কর যারা তাদের অধীনস্ত সৈন্য নিয়ে আপাতত আক্রমণ বন্ধ করে এখানে আমার সাথে এসে যোগ দিতে পারবে। আমরা শেরশাহের অগ্রাভিযান সরাসরি মোকাবেলা করবো। তাবুর চারপাশের মাটি এখান থেকে বেশ শক্তই মনে হচ্ছে আমাদের প্রারম্ভিক আক্রমণ জোরদার করে শত্রুর ক্ষতিসাধন করতে আমরা আমাদের ঘোড়াগুলোকে ওখান। থেকে প্রয়োজনীয় গতিতে ছোটাতে পারব।
পরবর্তী দশ মিনিটের ভিতরে হুমায়ুন নিজের চারপাশে তার বেশ কয়েকজন সেনাপতিকে সমবেত দেখে। বাবা ইয়াসভালের মতো- যিনি যুদ্ধে তার শিরোস্ত্রাণ হারিয়েছেন এবং তার মাথার ক্ষতস্থানে একটা হলুদ বর্ণের রক্তরঞ্জিত কাপড় জড়ান- আরও কতজন আহত হয়েছেন কিংবা নিখোঁজ রয়েছেন চিন্তা করে তাঁর মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। সুলেমান মির্জা কোথায়?
শত্রুর অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত অবস্থায় একটা বর্শার আঘাতে তিনি শহীদ হয়েছেন, সুলতান।
আর আহমেদ খান?
মারাত্মকভাবে আহত। শেরশাহের আক্রমণের প্রথম প্রহরে তিনি যখন শিবিরের বেষ্টনী পরিদর্শন করছিলেন তখন দুটো তীর এসে তার উরুতে বিদ্ধ হয়। রক্তক্ষরণের কারণে দুর্বল অবস্থায় তার কয়েকজন সৈন্য তাঁকে খুঁজে পায় এবং আরও অন্যান্য আহতদের সাথে তাঁকে গঙ্গার অপর পাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে আপনি যাদের মোতায়েন রেখেছেন আপাতত তারাই তাঁর যত্ন নিচ্ছে।
নিজেদের নিয়তি আর সাহসের উপর ভরসা করে, এসব সাহসী যোদ্ধাদের উপস্থিতি ছাড়াই আমাদের যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।
হুমায়ুন নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে যে তার সেনাপতিরা শেরশাহের পরবর্তী আক্রমণ প্রতিহত করতে, হাজার পাঁচেক অশ্বারোহীর একটা মোটামুটি বাহিনী প্রস্তুত করেছে, তার প্রতিপক্ষের সৈন্যসারিতে সহসা ব্যস্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে আক্রমণ শুরু হতে বেশী দেরী নেই।
শেরশাহের বাহিনী অগ্রসর হবার সাথে সাথে আমরাও এগিয়ে যাব। আমাদের তাঁদের সমাবেশের ঠিক মাঝামাঝি আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করবো, আমার বিশ্বাস তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন। আমরা যদি তাঁকে হত্যা বা বন্দি করতে পারি তাহলে তার লোকেরা মনোবল হারিয়ে ফেলবে। আমাদের চরম ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও দিনের শেষে তাহলে আমরাই বিজয়ী হব…
মুহূর্ত পরে, শেরশাহ তার অশ্বারোহী বাহিনীর মাঝে গতির সঞ্চার করে, দুলকি চালে গতিবেগ বৃদ্ধি করতে করতে তাঁরা হুমায়ুনের প্রতিরক্ষা ব্যুহের দিকে ধেয়ে আসে। হুমায়ুন অলঙ্কারখচিত ময়ান থেকে আলমগীর বের করে আনে এবং মাথার উপরে সেটা আন্দোলিত করে চিৎকার করে বলে, আক্রমণ কর! মনে রাখবে পশ্চাদপসারণের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়।
শীঘ্রই কাদা আর উঁচু নীচু জমির উপর দিয়ে যতটা দ্রুত সম্ভব তার বাহিনী ছুটতে শুরু করে। হুমায়ুনকে বহনকারী লম্বা, কালো ঘোড়াটা, সমস্ত সকালের পরিশ্রমের পরেও তাঁকে তাঁর বাহিনীর একেবারে সামনে রেখে, প্রতি মুহূর্তে প্রতিপক্ষের নিকটবর্তী করে তুলে, যারা নিজেরাও উদ্যত সঙ্গীন হাতে ছুটে আসছে নিজেদের সেনাপতির মহিমা কীর্তনে শের, শের রব তুলে।
হুমায়ুনের সব ভাবনা চিন্তা এই মুহূর্তে আসন্ন যুদ্ধের নিরীখে কেন্দ্রীভূত, সে তার কালো স্ট্যালিয়নের ঘাড় বরাবর নীচু হয়ে আসে, আর তার দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে শেরশাহের আস্কন্দিত বেগে আগুয়ান বাহিনীর একেবারে কেন্দ্রস্থলে যেখানে ইস্পাতের উজ্জ্বল বর্ম পরিহিত একজন কালো শ্মশ্রুমণ্ডিত লোক সাদা একটা ঘোড়ায় চেপে বিচরণ করছে আর চিৎকার করে সবাইকে উৎসাহিত করছে। লোকটা শেরশাহ ছাড়া আর কেউ নয়। হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার লাগাম আরও একবার টেনে ধরে নিজেকে শেরশাহ বরাবর ধাবিত করে। কয়েক মিনিটের ভিতরে দুটো সরলরেখা আপতিত হয়। হুমায়ুন শেরশাহকে লক্ষ্য করে আলমগীর দিয়ে কোপ বসায় কিন্তু তরবারির ধারাল ফলা শত্রুর ইস্পাতের বর্মে পানিতে উড়ন্ত চাকতির মতো পিছলে যায় আর পর মুহূর্তে তার নিজ নিজ ভরবেগের কারণে পৃথক হয়ে যায়।
সহসা, হুমায়ুনের মনে হয় একটা বাদামী ঘোড়ায় সে বোধহয় বিশ্বাসঘাতক তারিক খানকে এক ঝলকের জন্য দেখতে পেয়েছে, এখনও বর্মের নীচে তাঁর চিরাচরিত গাঢ় সবুজ বর্ণের আলখাল্লা রয়েছে। হুমায়ুন তাঁর ঘোড়া নিয়ে তারিক খানের দিকে ধেয়ে যায়। যদিও সামনে পেছনে চক্রাকারে ঘুরতে থাকা একদল বিশৃঙ্খল ঘোড়া আর তরবারির ফলায় মৃত্যু নিয়ে পরস্পরকে আঘাতরত তাদের আরোহীদের কারণে তাঁর গতি বিঘ্নিত হলেও, হুমায়ুন ঠিকই সবুজ আলখাল্লা পরিহিত লোকটার কাছে পৌঁছে। তারিক খানই বটে লোকটা।
