হুমায়ুনের সমস্ত মনোযোগ অবশ্য যে কামানটা থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। সেটার প্রতি নিবদ্ধ। গোলন্দাজের দল পাগলের মতো সেটাকে পুনরায় গোলাবর্ষণের জন্য প্রস্তুত করতে চেষ্টা করছে। গুড়ো পদার্থ ভর্তি একটা কাপড়ের ব্যাগ তারা লোহার সিন্দুক থেকে বের করেছে যা ব্যাগটাকে শুষ্ক রেখেছে এবং কামানের নল বরাবর তারা সাফল্যের সাথে গুড়ো পদার্থটা ঠেসে ঢুকিয়ে দেয়। গুড়ো পদার্থটা ব্যারেলে ঠেসে দেয়ার পর তাদের দুজন এবার কামানের একটা ধাতব গোলা নিয়ে সেটা ব্যারেল বরাবর গড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয় ঠিক এমননি সময় হুমায়ুন তাঁদের সেই জটলার কাছে পৌঁছে। তার বিশাল কালো ঘোড়ার পর্যানের পিঠে ঝুঁকে নীচু হয়ে বসে, হুমায়ুন আলমগীরের প্রথম আঘাতেই কামানের গোলা ধরে থাকা লোকটা হাত প্রায় দ্বিখণ্ডিত করে দেয়। কামানের গোলাটা নিয়ে সে মাটিতে আছাড় খেয়েছে, তার ক্ষতস্থানসমূহ থেকে পুনরায় রক্তপাত শুরু হয়েছে। হুমায়ুন অপর লোকটা মুখমণ্ডল লক্ষ্য করে তরবারি চালায় কিন্তু গোলন্দাজ বাহিনীর লোকটা নিচের মাথার উপরে হাত দিয়ে আঘাতটা প্রতিহত করে। সে যাই হোক, মারাত্মকভাবে জখম হাত নিয়ে লোকটা ঘুরে দাঁড়ায় এবং দৌড়াতে শুরু করে। লোকটা কয়েক কদমও যেতে পারে না তার আগে হুমায়ুনের হাতের তরবারি তার গায়ের শেকলের তৈরী বর্মের ঠিক উপরে আর মাথার চূড়াকৃতি শিরোম্রাণের ঠিক নীচে উন্মুক্ত ঘাড়ের মাংসে কোপ বসায়, এবং সে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ইত্যবসরে হুমায়ুনের দেহরক্ষীর দল শত্রুপক্ষের অন্য গোলন্দাজদের হয় হত্যা করেছে কিংবা পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে আর তার তবকিরা হাতির পিঠ থেকে নামতে শুরু করেছে।
দারুন দেখিয়েছে। পদাতিক বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যদের অগ্রসর হয়ে কামারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার আদেশ দাও। আমাদের সাফল্য তাঁদের নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। সেনাছাউনির কেন্দ্রে এবার আমাকে ফিরে যেতে হবে।
কথা শেষ করে, হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে, চিটচিটে কাদার ভিতর দিয়ে আক্রমণ করার ধকলে বেচারার নাক দিয়ে হাপরের মতো বাতাস বের হয়, তাঁর লাল নিয়ন্ত্রক তাবুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। সে যখন কামানগুলো আক্রমণ করতে ব্যস্ত সেই ফাঁকে বৃষ্টির বেগ কখন যেন থিতিয়ে এসেছে ফলে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা অনেক পরিষ্কার হয়েছে, এখন বৃষ্টি প্রায় নেই বললেই চলে। হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, সেনাছাউনির কেন্দ্র থেকে সে তাঁর অবস্থান আরও জোরাল করার জন্য পরবর্তী আদেশ প্রদানে সক্ষম হবে।
সে অবশ্য তার তাবুর উদ্দেশ্যে অর্ধেকটা পথও অতিক্রম করেছে কি করেনি এমন সময় জওহর দ্রুত ঘোড়া দাবড়ে এসে উপস্থিত হয়। সুলতান, সে রুদ্ধশ্বাসে বলে, বাবা ইয়াসভালো আমাকে বলে পাঠিয়েছেন যে আপনি যদি অনুগ্রহ করে দক্ষিণপশ্চিম সীমানার দূরবর্তী অংশ একবার দর্শন করেন। গঙ্গার তীর বরাবর শেরশাহের বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে। তারা ইতিমধ্যে আমাদের সম্মুখের প্রতিরক্ষা ফাঁড়ি ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করেছে এবং সেনাপুরঃসর অগ্রদল আমাদের তড়িঘড়ি করে বিন্যস্ত দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা বুহ্যের কাছে অবস্থান করছে।
হুমায়ুন সাথে সাথে তাঁর কালো ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং উৎসুক জন্তুটা তাঁর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সম্ভবত পশ্চিম দিক বরাবর নিখুঁত সারিতে বিন্যস্ত তাবুর মাঝ দিয়ে দুলকি চালে ছুটতে শুরু করে, হুমায়ুনের লোকেরা অপ্রত্যাশিত আক্রমণকারীদের প্রতিহত করতে এই তাবুগুলো থেকেই ছুটে গিয়েছিল। জওহর আর তার দেহরক্ষীর দল তাকে অনুসরণ করে।
হুমায়ুন খুব শীঘ্রই যুদ্ধের শোরগোল আর আর্তনাদ বৃদ্ধি পেতে শুনে এবং তারপরে একটা নীচু ঢাল বেয়ে উঠে এসে নীচের দিকে গঙ্গার প্রশস্ত কর্দমাক্ত পাড়ে একটা বিশৃঙ্খল দৃশ্যপটের দিকে তাকায়। শেরশাহের অশ্বারোহী বাহিনীর বেশ কয়েকটা দল তাদের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে চলে এসেছে এবং তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী প্রাণপনে এখন চেষ্টা করছে তাদের ঘিরে ফেলতে বা প্রতিরক্ষা ব্যুহের বাইরে তাদের তাড়িয়ে দিতে। অশ্বারূঢ় অন্যান্য আধিকারিকেরা তাদের হাতের উত্তোলিত তরবারি আন্দোলিত করে চেষ্টা করছে তার পদাতিক সৈন্যদের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সৃষ্ট ফাঁকগুলোকে পূরণ করতে উৎসাহিত করতে কিন্তু তাঁদের প্রয়াস খুব একটা সফল হচ্ছে বলে মনে হয় না। বস্তুতপক্ষে পদাতিক সেনাদের কেউ কেউ তাদের হাতের গোলাকার ঢাল আর লম্বা বর্শা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, যা দিয়ে তারা সজ্জিত, পিছনের দিকে পালিয়ে আসতে শুরু করেছে।
এসবের চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, তাঁর টলমল করতে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যুহের মাইলখানেক দূরে শেরশাহের বিশাল আরেকটা অশ্বারোহী বাহিনী প্রস্তুত হচ্ছে আক্রমণ করার অভিপ্রায়ে। এই বাহিনীটার কেন্দ্রস্থলে উজ্জ্বল নিশান আর পতাকার একটা জটলা দেখা যায় এবং হুমায়ুনের কাছে এটা নিশ্চিত প্রতিয়মান হয় যে স্বয়ং শেরশাহ সেখানে রয়েছেন এবং নিজের শক্রদের শেষপর্যন্ত পরাভূত করতে নিজেই এই আক্রমণের নেতৃত্ব দেবেন।
জওহর, ব্যাটাদের মোকাবেলা করার জন্য আমরা নিজেদের প্রস্তুত করতে খুবই অল্প সময় পেয়েছিলাম। বাবা ইয়াসভালো আর আমার অন্যসব সেনাপতিরা কোথায়?
