কিন্তু সুলতান, এখানে তাদের আমাদের প্রয়োজন।
আমার আদেশের বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন করবে না। তাদের রক্ষা করার সাথে সম্মানের প্রশ্ন জড়িত।
বাবা ইয়াসভালো আর তর্ক না করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে একজন বার্তাবাহক প্রেরণ করে।
বাবা ইয়াসভালো, এবার আমাকে বলেন আমার উপস্থিতি কোথায় সবচেয়ে কার্যকর প্রতিপন্ন হবে?
সুলতান, উত্তরপশ্চিম দিকে ওখানে। শক্রর অশ্বারোহী বাহিনী আমাদের সীমানা বেষ্টনী ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়ে আমাদের পদাতিক সৈন্যদের আক্রমণ করেছিল যখন তারা তাদের তাবু ঘুমিয়ে ছিল এবং নিজেদের রক্ষা করার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই নির্বিচারে অনেককে হত্যা করে। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যায়। বাদশানি আর তাজিক সৈন্যরা দ্রুত এগিয়ে এসে জনবল বৃদ্ধি করার পরেই কেবল আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছি এবং সেটাও আমাদের মূল সীমানা থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে আসবার পরেই কেবল সম্ভব হয়েছে।
বেশ উত্তরপশ্চিম দিকেই যাওয়া যাক তাহলে। হুমায়ুন তার বিশাল কালো স্ট্যালিয়নে আরোহন করে এবং দেহরক্ষী বাহিনীর অর্ধেককে সাথে নিয়ে, যাদের সে রাজমহিষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রেরণ করেনি, সে যত দ্রুত সম্ভব উত্তরপশ্চিম প্রান্তের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে যায়। থকথকে কাদার কারণে মাঝে মাঝেই তাদের ঘোড়ার পেট পর্যন্ত কাদায় ডুবে যায়। এক অশ্বারোহী তাঁর বাহনকে যখন দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে, জন্তুটা হোঁচট খায় এবং উল্টে যায়, কাদায় আটকে যাবার কারণে সামনের পায়ে চিড় ধরে।
হুমায়ুনের সেনাছাউনির রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া এলাকাটার কাছাকাছি পৌঁছাতে, সে লক্ষ্য করে যে তার সেনাপতিরা প্রায় ডজনখানেক রণহস্তিতে হাওদাযুক্ত করেছে এবং তাঁদের সামনে নিয়ে এসেছে। হাওদার চাদোয়ার কারণে আপাতদৃষ্টিতে অবিরাম বৃষ্টির হাত থেকে তার তবকিরা সামান্য হলেও রক্ষা পেয়েছে এবং তাদের লম্বা নলের বন্দুক ইন্ধন-বারুদ দিয়ে পূর্ণ করে গুলি করতে সক্ষম হয়েছে আর শেরশাহের আক্রমণকারীদের বেশ কয়েকজনকে ধরাশায়ী করেছে। তবকিদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে, হুমায়ুনের পদাতিক বাহিনী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে উল্টে রাখা মালবাহী গাড়ির আড়াল ব্যবহার করে সেখান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর নিক্ষেপ করছে এবং শেরশাহের লোকদের পর্যায়ক্রমে বাধ্য করছে হুমায়ুনের বিশালাকৃতি পাঁচটা কামানের পিছনে আশ্রয় নিতে যেগুলো তারা তাঁদের প্রথম আক্রমণের সময়ে বিধ্বস্ত করেছিল।
হুমায়ুন সম্মুখবর্তী অবস্থানে যখন উপস্থিত হয় সে তার লোকদের সাহস যোগাতে চিৎকার করে উঠে। আমার অসীম সাহসী যোদ্ধার দল, তোমাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ। শত্রুর আক্রমণ তোমরা প্রতিহত করেছে। এখন সময় হয়েছে আমাদের পরাক্রান্ত কামানগুলোকে পুনরায় দখল করার। শেরশাহের উদ্ধৃঙ্খল লোকজনদের সেগুলো বয়ে নিয়ে যাবার সুযোগ দিলে সেটা আমাদের জন্য চরম অপমানের বিষয় হবে। আমি নিজে তোমাদের নেতৃত্ব দেব। মাহুতের দল নিজ নিজ হাতি নিয়ে এগিয়ে যাও। বীর তকির দল, আমার জন্য ঐসব উদ্ধত উচ্ছল দস্যুদের আরও বেশী বেশী ধরাশায়ী কর।
হুমায়ুন রণহস্তীর সম্মুখে অগ্রসর হওয়া আরম্ভের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করে। অবশেষে হাতীর দল, কাদার ভিতর দিয়ে টলমল করতে করতে অগ্রসর হতে আরম্ভ করে এবং তাঁদের পিঠে স্থাপিত হাওদাগুলো এতোবেশী আন্দোলিত হয় যে তবকিদের ভীষণ অসুবিধা হয় লক্ষভেদের জন্য নিজেদের অস্ত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে। হুমায়ুন হাত নেড়ে অশ্বারোহী বাহিনীকেও অগ্রসর হতে বলে। বেদখল হওয়া কামানগুলোর দিকে অগ্রসর হবার সময়ে হুমায়ুন লক্ষ্য করে ব্রোঞ্জের সবচেয়ে বড় কামানগুলোর একটার আড়াল থেকে শেরশাহের গোলন্দাজ বাহিনীর কিছু সদস্য তাঁর পদাতিক বাহিনীর বাদামি-ধুসর বর্ণের একটা তাবুর ভেতর দৌড়ে প্রবেশ করে, যা আপাতদৃষ্টিতে তাঁর সৈন্যরা পিছু হটে আসার পরেও অক্ষত রয়েছে। গোলন্দাজ বাহিনীর সেই লোকগুলো সহসা তাবুর সামনের অংশটা টেনে সরিয়ে ফেলতে দেখা যায় তাঁদের দখলকৃত ষষ্ঠ কামানটা সেখানে অবস্থান করছে যা তারাই ভালো বলতে পারবে কিভাবে তারা সেটাকে তাবুর ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়েছে এবং গোলাবর্ষণের উপযুক্ত করে ফেলেছে। কালক্ষেপন না করে, গোলন্দাজ বাহিনীর এক সৈন্য, বেজন্মাটা এতোক্ষণ তাবুর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল, কামানের পলিতায় অগ্নি সংযোগ করে।
বিকট একটা শব্দ আর বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো সাদা ধোয়া উদগীরন করে কামানের মুখের ভেতর থেকে ধাতব গোলাটা ছিটকে বের হয়ে এসে, হুমায়ুনের আগুয়ান হস্তিবাহিনীর একেবারে সামনের হাতিটার গম্বুজাকৃতি কপালের ঠিক মধ্যেখানে মোক্ষমভাবে আঘাত করে। মারাত্মকভাবে আহত হাতিটা, সাথে সাথে পথের একপাশে উল্টে পড়ে, জন্তুটার পিঠের হাওদা স্থানচ্যুত হয় আর ভেতরে অবস্থানরত তবকির দল মাটিতে আছড়ে পড়ে, তাঁদের হাত-পায়ের অবস্থা সঙ্গীন। বহরের পেছনের হাতিগুলো এবার আতঙ্কিত হয়ে উঠে এবং মাটিতে আছড়ে পড়া তবকিদের একজনকে পায়ের নীচে কাদায় পিষে দিয়ে, সোজা সামনের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করে। হাতির সম্মুখগতির উপরে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সে যখন আপ্রাণ চেষ্টা করছে, জন্তুটা ভয়ে মাথা পেছনে হেলিয়ে রেখে, শুড় আকাশের দিকে তুলে, ভয়ে বিকট ডাক ছাড়ছে এবং হাতিটার দুইজন মাহুতের একজন জন্তুটার গলা থেকে ছিটকে যায় কিন্তু অপরজন কোনোমতে আকড়ে থাকে এবং মনে হয় যেন সে তার আরোহন করা হাতিকে সংযত করতে সক্ষম হয়েছে।
