জওহর নৌকার সন্ধানে যাবার প্রায় সাথে সাথে আহমেদ খান দৌড়ে আসে।
আমাদের ছাউনির সীমানা এসব আক্রমণ কিভাবে ঠেকিয়েছে? হুমায়ুন জানতে চায়।
বেশ ভালোভাবেই মোকাবেলা করেছে, সুলতান। তাঁদের প্রবল প্রারম্ভিক আক্রমণের পরে যখন তাদের আক্রমণের তীব্রতা ছিল ভয়াবহ, শত্রুসেনা কিছুক্ষণের জন্য মনে হয় আক্রমণের মাত্রা হ্রাস করে যেন কিছু একটা ঘটার জন্য তাঁরা অপেক্ষা করছে।
রাজমহিষীদের তাবুতে তাঁদের হামলার সাফল্য জানবার জন্য… হুমায়ুন আপনমনে বিড়বিড় করে। তারা খুব বেশীক্ষণ আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে না। কিন্তু এর ফলে আমরা হয়তো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুছিয়ে নেয়ার সুযোগ পাব।
সুলতান। উজানের নদীপথ নিরাপদ। আমাদের নৌকা প্রস্তুত এবং প্রতিটা নৌকার জন্য দ্বিগুণ মাঝিমাল্লার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, জওহর ফিরে এসে দম নিতে নিতে সব খুলে বলে। অশ্বারোহী বাহিনীর একটা চৌকষ দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং তারা নদীর উত্তর দিকের তীর বরাবর নৌকার সাথে সাথে যাবে।
হুমায়ুন এবার খানজাদার দিকে তাকায়। ফুপুজান, আপনার এবার যাওয়া উচিত। আপনি নিজেকে এবং অন্য মহিলাদের রক্ষা করতে পারবেন আমি বিশ্বাস করি। আমি আপনাকে নৌকা বহরের নেত্রী হিসাবে নিয়োগ করছি। জওহর, মাঝিমাল্লা আর সৈন্যদের জানিয়ে দাও যে একজন মহিলার নির্দেশ পালন করাটা তাদের কাছে যতই বিচিত্র বলে মনে হোক, তারা নির্দ্বিধায় সেটা পালন করবে নতুবা আমার রোষের মুখে পড়বে।
তাদেরকে জওহরের কিছুই বলার দরকার নেই, দৃঢ় কণ্ঠে খানজাদা বলেন। বাবরের বোনের আদেশ তারা অবশ্যই পালন করবে। তুমি বিজয়ী হবার পরে আবার আমাদের দেখা হবে। নীতি বিবর্জিত বিশ্বাসঘাতক তারিক খানের কর্তিত মস্তক আমি দেখতে চাই আর আমার পায়খানার মেথর হওয়া থেকে শেরশাহকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। কথাটা শেষ করেই তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে কাদার উপর দিয়ে দ্রুত পায়ে গুলবদন আর অন্যান্য মেয়েরা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেদিকে হেঁটে যায় তারপরে তাঁদের সাথে নিয়ে নদীর তীরের দিকে এগোতে থাকে, শীঘ্রই আলোআধারি আর বৃষ্টির মাঝে হারিয়ে যায়।
হুমায়ুন ভাবে, কি সাহসী এক মহিলা। তাঁর হাল্কা পাতলা আর যৌবন অতিক্রান্ত দেহে তৈমূরের রক্ত কত প্রবলভাবে উপস্থিত। তারিক খানের উপরে আস্থা রেখে এবং শেরশাহের বিলম্বিত উত্তরের কুশলতায় বিশ্বাস করে সে বোকামী করেছে, মারাত্মক বোকামী। সে কেন তাদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আরও জোরালভাবে প্রশ্ন করেনি? হারেমের আনন্দের মাঝে গা এলিয়ে দিতেই কি সে বেশী আগ্রহী ছিল? তার মানসিক একাগ্রতার এই ঘাটতি তাকে অবশ্যই শারীরিক বীরত্ব দিয়ে পুষিয়ে দিতে হবে এবং তার লোকদের বিজয়ী হতে অনুপ্রাণিত করতে এটাকে ব্যবহার করবে।
আহমেদ খান আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে আরও বিশদ বিবরণী সংগ্রহ কর। জওহর আমার বর্ম এনে দিয়ে আমার ঘোড়া প্রস্তুত কর।
পনের মিনিটের ভিতরে হুমায়ুন নিজেকে যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করে ফেলে, এদিকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। বাবা ইয়াসভালের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন সেনাপতি তার সাথে এসে যোগ দেয়। সুলতান, পরিস্থিতি মারাত্মক। শেরশাহ নতুন বাহিনী নিয়ে আক্রমণ শুরু করেছে। আমরা কামানগুলোকে গুলি বর্ষণের অবস্থানে নিয়ে যেতে পারছি না। ওদিকে তাকিয়ে দেখেন। তাঁর আধিকারিকের হাতের নির্দেশের দিক অনুসরণ করে তাকিয়ে হুমায়ুন দেখে, গোলন্দাজবাহিনীর বেশ কয়েকজন সৈন্য তাঁর সবচেয়ে বড় ব্রোঞ্জের কামানটার সাথে বাঁধা ষাড়ের দুটো দলকে অবিশ্রান্তভাবে চাবুকাঘাত করছে এর মুখটাকে ঘুরিয়ে শত্রুর হুমকির মুখোমুখি করার প্রয়াসে। কিন্তু বিশালদেহী ষাড়গুলোকে যত জোরেই আঘাত করা হোক বা যতই তাদের তোয়াজ করা হোক, অতিকায় জম্ভগুলো কাদায় হোঁচট খেয়ে পিছলে গিয়ে থকথকে কাদার আরো গভীরে ডুবে যায়। দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো এবার ষাড়ের সাথে নিজেরাও পুরো শক্তি দিয়ে ঠেলতে চেষ্টা করে কিন্তু পরিস্থিতির বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয় না, মসৃণ বাদামী কাদায় অনেকেই কেবল খাড়া আছাড় খায়।
সুলতান, সবগুলো কামানের একই অবস্থা, বাবা ইয়াসভালো জানায়।
আমি আপনার কথা বিশ্বাস করছি। আর তাছাড়া এই বৃষ্টির ভিতরে তবকি বা গোলন্দাজ উভয়ের পক্ষেই বারুদ শুকনো রাখা বা পলিতায় আগুন দেয়া একটা কঠিন কাজ হত। আমাদের উচিত শীতল ইস্পাতের সনাতন অস্ত্র নিয়ে সম্মুখ সমরে নিজেদের সাহসিকতার উপরে নির্ভর করা। শত্রুর চেয়ে এখনও আমাদের লোকবল বেশী। আধিকারিকদের আদেশ দাও, তাৎক্ষণিকভাবে যতটা তাঁদের পক্ষে সম্ভব সর্বোচ্চ রক্ষণাত্মক অবস্থানে পদাতিক সৈন্যদের বিন্যস্ত করা শুরু করতে। অবরোধক হিসাবে মালগাড়ি, তাবু ব্যবহার কর…হুমায়ুন কথা শেষ করে না এবং তারপরে- তার ফুপুজান আর অন্যান্য রাজমহিষীদের বিপজ্জনক অবস্থান আর এর কারণ যে তাঁর নিজের আত্মতুষ্টি এবং অর্বাচীনসুলভ সরলতা সে সম্বন্ধে পুরোপুরি সচেতন সে যা তাঁদের বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে- আদেশ দেয়, অশ্বারোহী বাহিনীর আরেকটা শক্তিশালী বাহিনী- দশ হাজার সৈন্য যার অর্ধেক আমার নিজস্ব দেহরক্ষী বাহিনীর- রাজমহিষীদের নিরাপত্তা জোরদার করতে নদীর তীর বরাবর প্রেরণ কর।
