সহসাই বিপদ টের পেয়ে, খানজাদা হাতটা পেছনে নিয়ে গিয়ে কনুই দিয়ে লোকটার গলায় আঘাত করে কিন্তু লোকটা কোনোমতে আঘাতটা সামলে নিয়ে গামছাটা শক্ত করে ধরার চেষ্টা করতে থাকে। হুমায়ুন ততক্ষণে তাঁদের অনেকটা কাছে চলে আসায় সে ফুপুজানের আক্রমণকারীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সবলে তাঁকে মাটিতে আছড়ে ফেলার অভিপ্রায়ে তাঁর সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি আরম্ভ করে। চকচকে, পিচ্ছিল কাদায় তারা কিছুক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি করে, দুজনেই সুবিধা আদায়ের জন্য হাঁসফাঁস করে। তারপরে হুমায়ুন তাঁর প্রতিপক্ষের বাম চোখে নিজের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠিপ্রবিষ্ট করাতে সমর্থ হয় এবং জোরে চাপ দিতে সে টের পায়। অক্ষিগোলক বিদীর্ণ হয়ে ভেতরের তরল পদার্থ বের হয়ে আসছে। ব্যাথার তীব্রতায় অধীর হয়ে সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই লোকটার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত শীথিল হয়, এবং সেই সুযোগে হুমায়ুন আলমগীর বের করে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সেটা প্রতিপক্ষের কুঁচকির গভীরে গেঁথে দিয়ে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে লোকটা আর্তনাদ করতে থাকে এবং তাদের পায়ের চাপে সৃষ্ট কর্দমাক্ত ডোবায় রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে সে।
হুমায়ুন তখনও তার শিবিরের দূরবর্তী সীমানা থেকে যুদ্ধের হট্টগোল যদিও ভেসে আসতে শুনে, কিন্তু তাঁর দেহরক্ষীর দল ইতিমধ্যে রাজমহিষীদের তাবু আক্রমণ করতে আসা বাকি লোকদের মনে হয় কাবু করতে পেরেছে। তারা সংখ্যায় বিশজনের মতো হবে। লোকগুলোর প্রত্যেকের পরণে কালো পোষাক এবং শিবিরের সীমানায় জোরাল আক্রমণের সুযোগ নিয়ে বোধহয় তারা গোপনে সেনাছাউনির একেবারে কেন্দ্রস্থলে এসে হাজির হয়েছিল। আক্রমণকারীদের কেবল একজন জীবিত রয়েছে।
দুজন প্রহরী দুদিক থেকে লোকটার দুহাত ধরে এবং হাঁটু ভেঙে তাঁকে যেখানে বসিয়ে রেখেছে সেদিকে ক্রোধে বিকৃত হয়ে উঠা মুখ নিয়ে হুমায়ুন দৌড়ে গিয়ে তার গলা চেপে ধরে এক ঝটকায় লোকটাকে তার পায়ের উপরে দাঁড় করায় এবং তার মুখের কাছে নিজের মুখ প্রায় ঠেকিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে, তোমরা কেন এটা করেছে? ন্যূনতম মর্যাদাবোধ রয়েছে এমন শত্রুও মেয়েদের আক্রমণ করবে না। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সবাই তাদের রক্ষা করবে। আমাদের ধর্মেও একথা বলা হয়েছে, এটাই নৈতিক শিষ্টাচারের মোদ্দাকথা। তোমার মৃত্যু নিশ্চিত কিন্তু তুমি যদি কথা বল তাহলে সেটা দ্রুত হবে- যদি না বল তাহলে মৃত্যুটা হবে একটা দীর্ঘ আর বিলম্বিত প্রক্রিয়া এবং এত তীব্র যন্ত্রণাদায়ক যে তিলে তিলে সেই যন্ত্রণা ভোগ করার চাইতে তুমি মৃত্যু ভিক্ষা চাইবে।
রাজমহিষীদের হত্যা করার কোনো অভিপ্রায় আমাদের ছিল না আমরা কেবল তাঁদের অপহরণ করতে চেয়েছিলাম বিশেষ করে আপনার ফুপুজানকে। তারিক খান আমাদের বলেছে তিনি আপনার সাথে রয়েছে এবং সাইবানি খানের হাতে তার বন্দী হবার গল্পটা সবাই ভালো করেই জানে। শেরশাহ বলেছে যে আমরা যদি তাকে বন্দি করতে পারি আপনি তাকে দ্বিতীয়বারের মতো অগ্নিপরীক্ষার হাত থেকে রেহাই দিতে যেকোনো শর্তে আপোষ করতে রাজি হবেন।
তারিক খান তাহলে সত্যিই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য ক্রুদ্ধ আর হতাশ হুমায়ুন বন্দির গলা আরও শক্ত করে চেপে ধরে এবং নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি লোকটার কণ্ঠমণির উপরে স্থাপন করে তার গলাটা মোচরাতে থাকে যতক্ষণ না ঘাড় ভাঙার আওয়াজ শুনতে পায় এবং তাঁর গলা চিরে মৃত্যুর আর্তনাদ বুদ্বুদের মতো উঠে আসে। নিথর দেহটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে আবারও খালি পায়ে কাদায় পিছলাতে পিছলাতে খানজাদার কাছে দৌড়ে যায়। বৃষ্টির অঝোর ধারায় সিক্ত হয়ে তরবারি হাতে তিনি তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছেন অবাক করা এক শান্ত অভিব্যক্তি তার চোখে মুখে এবং ঘুমাবার জন্য খুলে রাখা তার লম্বা ধুসর চুলের গোছা বৃষ্টিতে ভিজে অগণিত ইঁদুরের লেজে পরিণত হয়েছে।
আপনাকে ভালোভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় আমি লজ্জিত- আপনি কি আহত হয়েছেন?
একেবারেই না। আমার মনে হয় আমি প্রমাণ করতে পেরেছি যে তোমার আর তোমার আব্বাজানের মতো আমার ধমনীতেও তৈমূরের রক্ত বইছে। আক্রমণ যখন শুরু হয়, তখন আমি ভয় পাইনি কেবল ক্রুদ্ধ হয়েছি। আমি জানতাম আমাকে অবশ্যই গুলবদন আর তোমার যুবতী উপপত্নীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাবুর খুটিগুলো আমি তাদের ভেঙে ফেলতে বলি এবং তাবুর কাপড়ের নীচে তাঁদের লুকিয়ে থাকতে বলি যতক্ষণ তাঁরা বিপদ কেটে গেছে বলে নিশ্চিত হয়। ওদিকে তাকিয়ে দেখো। তাঁরা কেবল মাত্র বাইরে বের হয়ে আসছে।
মুষলধারে হতে থাকা বৃষ্টির মাঝে হুমায়ুন নিশ্চিতভাবেই তাবুর অতিকায়, আবৃত করা ভাজের নীচ থেকে সালিমাকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হতে দেখে, তার ঠিক পেছনেই রয়েছে গুলবদন আর অন্যান্য মেয়েরা। হুমায়ুন খানজাদাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এবং জড়িয়ে ধরেই সে বুঝতে পারে যে এখন উপস্থায়ী বিপদের রেশ কেটে যেতে এবং তার মাঝে যুদ্ধের রক্ত গরম করা উন্মাদনা থিতিয়ে আসতে ফুপুজান এতক্ষণে কাঁপতে শুরু করেছেন।
জওহর, আহমেদ খানকে আমার সাথে দেখা করতে বল, এবং খোঁজ নাও যদি আমরা এখনও গঙ্গার বুকে নৌকা ভাসাতে পারি। যদি সেটা বাস্তবসম্মত হয়, মাঝি মাল্লাদের পক্ষে যতটা দ্রুত সম্ভব কয়েকটা নৌকা প্রস্তুত করতে আদেশ দাও যাতে করে আমার ফুপুজান, ভগ্নি, আর উপপত্নীদের নৌকা করে উজানে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে আসা যায়।
