হুমায়ুন কি হয়েছে? আজ খাবারের সময় তুমি প্রায় চুপচাপই ছিলে, খানজাদা জানতে চান।
আমি উদ্বিগ্ন যে আমি এত সময় বৃথা অপচয় করেছি, যে শেরশাহ আমাকে আহাম্মক মনে করে হেলাফেলা করছে। সুলেমান মির্জা আর তারিক খান আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে প্রতিবার সাক্ষাতের সময় সে সজ্জনসুলভ আর ভদ্র আচরণ করেছে এবং তাঁকে আন্তরিকই মনে হয়েছে কিন্তু আমি এখন আর সে সম্বন্ধে নিশ্চিত নই। তারিক খানকে এতোটা বিশ্বাস করে আমি কি ভুল করেছি? নিজের জন্য সময় লাভের প্রয়াসে যদি শেরশাহই তাঁকে রোপন করে থাকে?
খানজাদা উঠে দাঁড়ায় এবং দুই এক মুহূর্তের জন্য পায়চারি করে, তশতরী আকৃতির পিতলের দিয়া ভর্তি তেলে জ্বলতে থাকা সলতের সোনালী আভায় তার মুখ গম্ভীর দেখায়।
আমার মনে হয় তোমার সন্দিগ্ধ হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত। শক্তিমানই সবসময় বিজয়ী হয় না মাঝে মাঝে ধূর্তও বিজয়ের বরাভয় লাভ করে। বিগত নয় সপ্তাহ ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা সম্মেলনে শেরশাহের সাথে মিলিত হবার জন্য গঙ্গার তীর বরাবর নিম্নাভিমুখে তুমি বিশাল একটা দূরত্ব অতিক্রম করেছে কিন্তু প্রতিবারই তুচ্ছ অজুহাত ব্যবহার করে যে সে এলাকার সব খাদ্যশস্য নিঃশেষ করে ফেলেছে বা মহামারীর আকারে জ্বরের প্রাদুর্ভাব হওয়ায় তাঁকে অবশ্যই সেটা এড়িয়ে যেতে হবে সে আরও সামনে এগিয়ে গিয়েছে।
সত্যি। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে গঙ্গার তীর থেকে ত্রিশ মাইল দূরে তাঁর মূল বাহিনী এখনও অপেক্ষা করছে।
তুমি কি করতে চাও?
আর কোনো অজুহাত গ্রহণ করবো না, শেরশাহের জন্য একটা সময়সীমা নির্ধারণ করবো এবং সে যদি সেটা অমান্য করে আমি তাকে আক্রমণ করবো। কিন্তু অন্য কারণে উদ্বিগ্ন যে বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী আর আমার কামানের সহজ যাতায়াতের জন্য এসব জঙ্গল আর জলাভূমি একেবারেই অনুপযুক্ত।
তাহলে উপযুক্ত ভূখণ্ডে পশ্চাদপসারণের জন্য সাহস সঞ্চয় কর। বা শেরশাহের বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে তাঁর শহরগুলো দখল করে নাও… একটা নিঃসঙ্গ বজ্রপাত খানজাদার কথার মাঝে বিঘ্ন ঘটায়। তাবুর ছাদে মুষলধারে বৃষ্টির আওয়াজ একে অনুসরণ করে।
এখনই বর্ষাকাল শুরু হবার কথা না- এখনও সময় হয়নি।
প্রকৃতির ছন্দ সবসময়ে মানুষের তৈরী পঞ্জিকা অনুসরণ করে না।
এটা যদি বর্ষার আগমনী বৃষ্টি হয় তাহলে আমাদের অবশ্যই উপযুক্ত ভূমি সন্ধান করা উচিত। কিন্তু এখন অনেক রাত হয়েছে, সকালে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য আমরা অনেক সময় পাব যখন আমরা জানতে পারব যে আসলেই অবিরাম বৃষ্টিপাতের সূচনা হয়েছে। আমাদের শিবির নদীর উপরিভাগ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত ইত্যবসরে তাই বন্যায় ভেসে যাবার কোনো ভয় নেই।
কয়েকঘন্টা পরের কথা, হুমায়ুন তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তাঁর বাহুদ্বয় দুপাশে প্রসারিত, তার ঘর্মাক্ত পেশল দেহ পাতলা সুতির চাদরের নীচে নগ্ন। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে, যা মন্থর হবার বদলে যেন আরও জোরে শুরু হয়েছে, আজকে তাঁর ঘুমাতে অনেক রাত হয়েছে। সে এখন স্বপ্ন দেখছে সে আগ্রা দূর্গে ফিরে এসেছে, তার উপপত্নীদের কক্ষের দিকে এগিয়ে চলেছে যেখানে কোনো বিচিত্র কারণে সে জানে তারা গোলাপজলের ঝর্ণার নীচে এখন স্নান করছে। সে টের পায় তাঁর দেহ কামনায় টানটান হয়ে উঠেছে এবং সে দ্রুত পা ফেলতে শুরু করতে চাদরের নীচে তার পা ছটফট করে উঠে, তাঁর রমণীদের কাছে পৌঁছাবার ব্যগ্রতায়। সহসা একটা মেয়েলী আর্তনাদ তাঁর স্বপ্নের গভীরে অনুপ্রবেশ করে। নারী আর পুরুষ কণ্ঠের একটা সম্মিলিত যুগলবন্দি ঠিক এর পরপরই ভেসে আসে। কেউ একজন চিৎকার করে, হাতিয়ার সামলে! জলদি- বর্ম পরার সময় নেই। ছাউনির সীমানায় জনবল বৃদ্ধি কর।
প্রাণপন চেষ্টায় ঘুমের রেশ কাটিয়ে হুমায়ুন বুঝতে পারে কণ্ঠগুলো বাস্তব। হামলাকারীরা জেনানাদের তাবু পর্যন্ত সম্ভবত অনুপ্রবেশ করেছে। একটা আলখাল্লায় কোনমতে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে সে হাত বাড়িয়ে তাঁর আব্বাজানের তরবারির তুলে নিয়ে নিজের তাবু থেকে টলতে টলতে কোনোমতে বের হয়ে আসে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে এবং তাঁর খালি পা ভেজা কাদায় পিছলে যেতে চায়। তির্যকভাবে নেমে আসা বৃষ্টির ভারী ফোঁটার মাঝ দিয়ে উঁকি দিয়ে এবং অন্ধকারে মরীয়া হয়ে নিজের চোখ সইয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে করতে, সে খানজাদার তাবুর দিকে দৌড়ে যায়।
তাবুর কাছাকাছি পৌঁছাতে, চরাচর ঝলসে দেয়া উজ্জ্বল পাতের মতো বিস্তৃত বিদ্যুচ্চমকের ধাতব ঝলকানির মাঝে সে দীর্ঘকায় এক মহিলার অবয়বকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে- খানজাদা। তাঁর মাথার উপরে উত্তোলিত ডান হাতে একটা বাঁকান তরবারি রয়েছে। হুমায়ুন তাকিয়ে থাকতে থাকতেই খানজাদা তরবারিটা এক আক্রমণকারীর মুখ বরাবর নামিয়ে আনে, যে তাঁকে পরাস্ত করার চেষ্টা করছিল। লোকটা কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ে সেখানেই ব্যাথায় কাতরাতে থাকে। বিদ্যুচ্চমকের পরবর্তী আলোর ঝলসানিতে হুমায়ুন দেখে যে তার ফুপুজানের তরবারির আঘাতে মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার মুখের একপাশ উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ফেঁড়ে ফেলায়, লোকটার রক্তাক্ত চোয়াল আর দাঁত বের হয়ে এসেছে। সে আর দেখে যে- খানজাদার অজান্তে- আরেকজন আক্রমণকারী তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার হাতে তরবারির বদলে একটা বিশাল গামছা সেটাকে সে তার মাথার উপর দিয়ে ছুঁড়ে দিয়ে খানজাদার গলা শক্ত করে পেচিয়ে ধরবে। হুমায়ুন হুশিয়ারি উচ্চারণ করে।
