তুমি এতক্ষণ যা বলেছে আমার উপদেষ্টামণ্ডলীর সাথে সে বিষয়ে আমি আলোচনা করবার আগে তুমি কি আর কিছু বলতে চাও?
কেবল এতোটুকুই যে মহামান্য সুলতানের যদি শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দিয়ে শেরশাহের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার কোনো অভিপ্রায় থেকে থাকে, আপনার প্রেরিত যেকোনো দূতের সঙ্গী হতে আমি প্রস্তুত এবং তাকে শেরশাহের শিবিরে তাঁর সামনে হাজির করার পরে নিরাপদে ফিরিয়ে আনবার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
আমি প্রস্তাবটা বিবেচনা করবো। এখন, আহমেদ খান, আরেকবার তার চোখ বাঁধো এবং তোমার দপ্তরে তাঁকে বদ্ধ কিন্তু আরামদায়ক অবস্থায় অবরুদ্ধ করে রাখো। জওহর, সূর্যাস্তের এক ঘন্টা পূর্বে এখানে আমার সাথে মিলিত হবার জন্য আমার উপদেষ্টামণ্ডলীদের তলব কর। ইত্যবসরে সালিমাকে বল আমার কাছে আসতে। হুমায়ুন ভাবে, উষ্ণ আবহাওয়ায় তার কামনার পারদ দ্রুত বেড়ে যায়, এবং প্রায়শই শীতকালের তুলনায় দ্বিগুণ। মেয়েটা জানে কিভাবে এই কামনা প্রশমিত করতে আর আসন্ন আলোচনায় মনোনিবেশের জন্য তার মনকে প্রশান্ত করতে হয়।
সালিমা, বরাবরের মতোই, নিজের দায়িত্ব নিপূণভাবে পালন করে। তার উপদেষ্টামণ্ডলী যখন সমবেত হয়, হুমায়ুন শমিত বোধ করে, তার পরামর্শদাতাদের সম্বোধন করার সময় অতিকায় একটা ব্যাঘ্রের মতো হুঙ্কার দিতে প্রস্তুত। আপনার তারিক খানের কথা শুনেছেন এবং তাঁর বয়ান যে শেরশাহ আমাদের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে যাবার অভিপ্রায়ে বাংলার জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে চলেছে এবং সেই সাথে তার অনুমানের জন্য দুঃখবোধ করছি- সে শান্তির জন্য আমাদের আপোষ করতে বাধ্য করবে। আপনারা কি মনে করেন?
আমাদের সাথে শক্তিশালী একটা সেনাবাহিনী রয়েছে এবিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমরা তাকে খুঁজে বের করে স্রেফ পিষে ফেলি না কেন, বাবা ইয়াসভালো নিজের চারপাশে সাথী সেনাপতিদের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলার সময় তার কামান মাথা থেকে ধুসর চুলের বেনীটা দুলতে থাকে।
কিন্তু একটু ধৈর্য্য ধরেন, হুমায়ুনের চাচাত ভাই সুলেমান মির্জা বলে। আমাদের সাথে যদি শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকে এবং নিজেদের লোকদের আনুগত্যের প্রতি আমাদের বিশ্বাস থাকে তাহলে একজন দূত প্রেরণ করে কিছুটা বিলম্ব করলে আমাদের কি এমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে? তারা ফিরে আসবার পরেও যদি প্রয়োজন হয়- দুমাস পরে বর্ষা মরসুমের আগে অগ্রসর হবার জন্য আমাদের হাতে প্রচুর সময় থাকবে।
তাকে এখনই শেষ করে দেয়াটাই অধিক বাঞ্ছনীয়। বাবা ইয়াসভালো তবুও অনড়। তাঁকে দিয়ে একটা উদাহরণ সৃষ্টি করলে অন্য বিদ্রোহীরা সমঝে যাবে।
কিন্তু আমাদের লোক ক্ষয় হবে আর সময়ও যা আমরা আমাদের সাম্রাজ্য বর্ধিত করার জন্য নিয়োজিত করতে পারি। আমি সবসময়েই দক্ষিণে দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অতিক্রম করে গোলকুণ্ডার হীরকখনিতে অভিযান পরিচালনায় আগ্রহী, সুলেমান মির্জা বলে।
আমি একমত, হুমায়ুনের দক্ষ সেনাপতিদের একজন, ইউসুফ পাঠান ভাবলেশহীন কণ্ঠে মন্তব্য করে। শেরশাহকে একজন দক্ষ শাসক বলা হয়ে থাকে আর বাংলা উর্বর, সমৃদ্ধ একটা প্রদেশ। আমরা যদি তাকে আর তার প্রধান অমাত্যদের হত্যা করি তাহলে নতুন কাঠামো তৈরী আর নতুন আধিকারিকদের নিয়োগ করতে গিয়ে আমাদের প্রচুর সময় নষ্ট হবে। আমাদের শক্তিমত্তার অবস্থান থেকে তার সাথে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে আমরা তাঁকে আর তাঁর প্রশাসনকে কর আদায়ের জন্য ব্যবহার করে দ্রুত আমাদের বাহিনীর বকেয়া বেতন পরিশোধ আর তাঁদের পুরস্কৃত করতে পারি আর তারপরে গোলকুণ্ডার অভিযানের জন্য অগ্রসর হই।
হুমায়ুন সবার বক্তব্য বিবেচনা করে। ইউসুফ পাঠানের বক্তব্যের ভিতরে একটা প্রত্যয়বোধ রয়েছে। তাছাড়া, মহানুভবতা মহান শাসকদের একটা বৈশিষ্ট্য। হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায়। সুলেমান মির্জা, একটা ছোট রক্ষী বাহিনী নিয়ে আপনি তারিক খানের সাথে যাবেন, শেরশাহের অবস্থান সনাক্ত করে তাঁর কাছে শান্তি চুক্তির প্রস্তাব পৌঁছে দিতে তবে শর্ত এই যে তাঁকে এখানে এসে আনুষ্ঠানিক অভিবাদন জানাতে হবে এবং আমাদের মূল্যবান সময় আর রসদ অপচয় আর সর্বোপরি আমাদের প্রতি সে যে অমার্জিত অবমাননা প্রদর্শন করেছে সেজন্য আমাদের সে উত্তমরূপে ক্ষতিপূরণ দেবে।
*
কিন্তু শেরশাহ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয় সে কেবলই কালক্ষেপন করে চলে, বিলম্বের জন্য ভূরি ভূরি দুঃখপ্রকাশ করে আর কোনো ধরনের শর্তে চুড়ান্তভাবে সম্মতি হবার পূর্বে মিত্রদের সাথে আলোচনার করতে বার্তাবাহক প্রেরণের অনুমতির জন্য বারংবার অনুরোধ করে। ১৫৩৯ সালের গ্রীষ্মকালের মাঝামাঝি একটা সময় সেটা, হুমায়ুন নৈশভোজের পর, বাংলার চৌসা বসতির কাছেই চার বর্গমাইলের চেয়ে বেশী এলাকা জুড়ে অবস্থিত তার সেনাছাউনির ঠিক মধ্যভাগে অবস্থিত তার তাবুর পাশেই খানজাদার তাবুতে অবস্থান করছিল। নীচু পাহাড়ের উপরে হুমায়ুন তার শিবির স্থাপন করেছে যেখান থেকে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের কর্দমাক্ত প্লাবিত সমভূমি দেখা যায়। তাবুর বাইরে, রাতের আবহাওয়া বেশ উষ্ণ এবং নিথর বাতাসে তাবুর আগুনের থোয়া সরাসরি উপরের দিকে উঠে যায়। তাবুর ভিতরে, কৌতূহলী দৃষ্টি থেকে জেনানাদের রক্ষা করতে যার পার্শ্বদেশ নামিয়ে দেয়া হয়েছে, গুমোট বাতাসে শ্বাস নেয়া কষ্টকর। চিনিগোলা পানির পাত্র দিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা বা তরাসচামর দিয়ে তাঁদের পিষে ফেলার জন্য খানজাদার পরিচারকদের সর্বাত্মক প্রয়াস সত্ত্বেও মশার ঝক বিরামহীনভাবে ভনভন করতে থাকে। হুমায়ুন দরদর করে ঘামতে থাকে, মাঝে মাঝে সে নিজের উন্মুক্ত ত্বকে তাঁদের তীব্র দংশন অনুভব করে এবং বৃথাই নিজের ক্ষুদ্র আক্রমণকারীদের উদ্দেশ্যে চড় হাকায়।
