সে অবশ্য সালিমা আর তাঁর প্রিয় আরো তিনজন উপপত্নীকে সাথে করে নিয়ে আসবার বিলাসিতা করার অনুমতি নিজেকে দিয়েছে। তাঁর সুরা আর আফিম বর্জন যেন হারেমের কোমল আর ইন্দ্রিয়পরবশ সুখের প্রতি তার আকাঙ্খকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সে তিনজন তরুণীকে পছন্দ করেছে- গুজরাত থেকে আগত খেয়ালি আর নমনীয় দেহের অধিকারিনী মেলিতা, লাহোর থেকে আগত ভারী বুক আর পুরু ওষ্ঠের অধিকারিনী পৃথুলা মেহেরুন্নিসা আর খোদ আগ্রার মেয়ে রসিক, কামকলায় পটু, কলহপ্রিয় মীরা- যারা প্রত্যেকেই, সালিমার মতো তাঁদের নমনীয় দেহ, ব্যগ্র ওষ্ঠ আর উৎসুক জীহ্বা নিয়ে, রতিক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন আসনে পারদর্শী। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির ক্লান্তিকর পরিস্থিতির মাঝে কি প্রশান্তি, তাঁর বিজয়ে কি আনন্দই না তারা তার জন্য বয়ে আনবে। অক্ষুব্ধ হাতির পিঠে পর্দা ঘেরা হাওদার অন্তরালে মেয়ের দল ভ্রমণ করছে আর তাঁদের পাহারায় নিয়োজিত আছে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের একটা দল।
*
ছয় সপ্তাহ পরে মধ্যাহ্নের আহারের ঠিক পরপরই, শত্রুর সংবাদ সংগ্রহে প্রেরিত হুমায়ুনের প্রধান গুপ্তদূত আহমেদ খানকে, চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী সেনাছাউনির ঠিক কেন্দ্রে স্থাপিত, তার লাল রঙের নেতৃত্ব দানকারী তাবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। হুমায়ুন সেখানে লালচে খয়েরী রঙের তাকিয়া যুক্ত সোনার কারুকাজ করা জাজিমে শুয়ে বিশ্রাম করছে, প্রশান্তিদায়ক শরবতের পানপাত্র হাতে সে জওহরের বাঁশির কোমল ছন্দোলয়ে বিভোর। আহমেদ খান তাবুর ভিতরে প্রবেশ করতে, হুমায়ুন ইশারায় জওহরকে বাজান বন্ধ করতে বলে।
আহমেদ খান, কি ব্যাপার?
সুলতান, আমাদের ছাউনির চারদিকে পঞ্চাশ মাইল দূর অবধি অনুসন্ধান করেও আমরা শেরশাহের সেনাবাহিনীর কোনো হদিশই খুঁজে পাইনি। অবশ্য এখান থেকে দক্ষিণপূর্ব দিকে প্রায় পয়তাল্লিশ মাইল দূরে আমরা সহসাই এক ক্ষুদ্র জায়গীরদারকে তার মাটির দূর্গে অবস্থানরত অবস্থায় আবিষ্কার করি। সে শেরশাহের অনুগত জায়গীরদার বলে দাবী করে কিন্তু এমন একজন যে ভীত যে তাঁর প্রভু নিজের অত্যধিক উচ্চাকাঙ্খর বশবর্তী হয়ে আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সবাইকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। শেরশাহের সেনাবাহিনীর সাথে যোগ দেবার জন্য তাই সে কোনো ধরনের ব্যস্ততা প্রদর্শন করেনি। সে আমাদের বলেছে যে তার জানা মতে এলাহাবাদের যেখানে গঙ্গা আর যমুনার স্রোত এসে মিলিত হয়েছে সেখান থেকে অন্তত আরও পঞ্চাশ মাইল দূরে শেরশাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে অবস্থান করছে। আমাদের বলেছে সে যা জানে আপনাকে বলার জন্য খুশী মনে সে আমাদের সাথে এখানে আসতে রাজি আছে। আমরা তার কথায় গুরুত্ব দিয়ে তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছি অবশ্য চোখ বেঁধে, যাতে সে আমাদের ছাউনির অবস্থান বা আমাদের সেনাবাহিনীর শক্তি সম্বন্ধে কিছু আঁচ করতে না পারে। আমরা এক ঘন্টা আগেই এসে পৌঁছেছি এবং আমি তার খাবারের বন্দোবস্ত করে তার সাথে কথা বলার ব্যাপারে আপনার আগ্রহ জানতে এসেছি।
তুমি দারুন কাজ করেছে। আধ ঘন্টা পরে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।
কাঁটায় কাঁটায় ঠিক ত্রিশ মিনিট পরে, আহমেদ খান- নিয়মনিষ্ঠার ব্যাপারে বাবরের ঝোঁক সম্পর্কে ভালোমতোই ওয়াকিবহাল- ফিরে আসে। তার পেছনে, দুজন সশস্ত্র প্রহরীর মাঝে, গাঢ় সবুজ রঙের আলখাল্লা আর একই রঙের পাগড়ি পরিহিত খর্বকায়, স্থূলদেহী, কৃষ্ণ বর্ণের বছর চল্লিশের একজন মানুষকে দেখা যায়।
হুমায়ুনের সামনে স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে সে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানায়।
কে তুমি?
তারিক খান, ফিরোজপুরের তাকহালদার।
আর সেই সাথে তুমি শেরশাহের অনুগত।
হ্যাঁ- এবং আমার প্রতি সে সবসময়ে একজন ভালো প্রভুর মতো আচরণ করেছে…কিন্তু সবকিছুর পরেও সুলতান, আমার পরম অধিরাজ, আমি আপনার একজন বিশ্বস্ত প্রজা। বিদ্রোহ করে শেরশাহ বেকুবি করেছে।
তুমি বোধহয় বলতে চাইছে ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে উদ্ধত আর অশ্রদ্ধাপূর্ণ ভঙ্গিতে অপমান করেছে… কিন্তু তার অভিসন্ধি আর অবস্থান সম্পর্কে তুমি কি জান?
তার সেনাবাহিনী আমার এলাকার ভিতর দিয়ে সরাসরি যাতায়াত করে না কিন্তু আমার এলাকার উত্তরে বিশ মাইল দূরে আমার আত্মীয়সম্পর্কিত ভাইয়ের এলাকার ভিতর দিয়ে তারা যাতায়াত করে। সে বলেছে শেরশাহের সেনাবাহিনীর আকার ছোট- লোকবল আশি হাজারের বেশী হবে না। আমার সেই ভাই শেরশাহের সেনাছাউনিতে গিয়েছিল তাঁকে তাঁর শ্রদ্ধা জানাতে। সে আমাকে বলেছে শেরশাহকে রীতিমতো বিহ্বল মনে হয়েছে যে সে আপনাকে এতো বিশাল এক বাহিনী নিয়ে অভিযানে অগ্রসর হতে প্ররোচিত করেছে। সে আমার ভাইকে বলেছে সে যুদ্ধ করবে না যদি আরো একবার আপনার অধীনে জায়গীরদার থেকে নিজের এলাকা নিজের আয়ত্ত্বে রাখতে পারার শর্তে সে আপনার সাথে কোনো ধরনের শান্তিচুক্তির রফা করতে পারে।
তার ভবিষ্যৎ গতিবিধি সম্বন্ধে তোমার সেই ভাই কিছু জানতে পেরেছে?
শেরশাহের এক গুপ্তদূত অসাবধানতাবশত আমার সেই ভাইয়ের উজিরকে বলেছে যে তারা বাংলার নীচু জলাভূমি আর জঙ্গল অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে যুদ্ধ যদি তাদের করতেই হয়- আপনার পরাক্রমকে তারা হয়তো ভালোভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।
