ভোরের আলো ফোঁটার এক ঘন্টা পরে, হুমায়ুন তাঁর ব্যক্তিগত শয়ন কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে, লাল বেলেপাথরে তৈরী আগ্রা দূর্গের অভ্যন্তরে মার্বেল পাথরে বাধান হলাধার আর পানি ছিটাতে থাকা ঝর্ণার সারির ভিতর দিয়ে হেঁটে গিয়ে সুউচ্চ তোরণদ্বার অতিক্রম করে এবং কুচকাওয়াজ ময়দানের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে তার সেনাবাহিনী সমবেত হয়েছে। রুবিখচিত একটা রূপার বক্ষাবরণের উপরে রূপার সূক্ষ শিকলের তৈরী আলখাল্লায় সে পুরোদস্তুর যুদ্ধের সাজে সজ্জিত। তার দেহের একপাশে পান্নাখচিত ময়ানের শোভা পাচ্ছে তার মরহুম আব্বাজান বাবরের ঈগলের মাথাযুক্ত বাঁটের তরবারি আলমগীর। তাঁর মাথায় শোভা পায় রুবি দিয়ে অলঙ্কৃত একটা শিরস্ত্রাণ এবং স্বর্ণখচিত একটা লম্বা ময়ূরের পালক শিরস্ত্রাণের শীর্ষে মৃদু দুলছে।
লোহার গজালশোভিত দূর্গের মূল দরজার আড়াল থেকে সে যখন বের হয়ে আসে এবং কুচকাওয়াজ ময়দানের কেন্দ্রে স্থাপিত মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে তাঁর রাজকীয় হাতি- আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রায় সম্রাট আর তাঁর সেনাপতিদের যাতায়াতের জন্য সচরাচর ব্যবহৃত অপেক্ষা করছে, সে দেখে যে তাঁর সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী দল সারিবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যাবার সময় এতোই গোলাপি-ধুসর বর্ণের ধূলো উড়িয়েছে যে সূর্য তাঁর আলোর তীব্রতা হারিয়ে একটা ধুসর, হলুদ বর্ণের চাকতিতে পরিণত হয়েছে। ধুসর বর্ণের অতিকায় হাতিটা তাঁর পিঠে গিল্টি করা লাল-দোয়ার মতো হাওদা নিয়ে হাটু ভেঙে বসে আছে এবং দুই মাহুত তার মাথার দুপাশে দাঁড়িয়ে। হাতির দুপাশে মর্যাদা অনুসারে তাঁর বয়োজ্যোষ্ঠ আধিকারিকেরা দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। তার প্রত্যেক সেনাপতির নতজানু হয়ে জানান অভিবাদন গ্রহণ করে হুমায়ুন তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলার জন্য দাঁড়ায়।
আমার কাছ থেকে তোমাদের লোকদের কাছে এই বার্তাটা বয়ে নিয়ে যাবে। আমরা ন্যায়ের পক্ষে রয়েছি। এই অশিক্ষিত, উঁইফোড়, জবরদখলকারীর কাছ থেকে যা আমাদের আমরা সেটাই উদ্ধার করতে চলেছি। আমাদের সেনাবাহিনী দেখার পরে এটা যে ইতিহাসের বৃহত্তম আর অজেয় সে বিষয়ে কেউ কিভাবে সন্দেহ প্রকাশ করবে? যোদ্ধাদের খুশী মনে বিদায় দাও। বিজয় আর তাঁর সঙ্গী, খ্যাতি আর পুরষ্কার আমাদের সাথী হবে।
আধিকারিকেরা আরও একবার মাথা নত করে এবং গুঁড়ি মেরে বসে থাকা হাতির হাটুতে পা রেখে হুমায়ুন এর পিঠে স্থাপিত হাওদায় সোনার গিল্টি করা ছোট যে সিংহাসনটা রয়েছে সেটায় গিয়ে বসে। জওহর আর দুজন দেহরক্ষী খুব কাছ। থেকে তাঁকে অনুসরণ করে। হুমায়ুনের কাছ থেকে ইশারা পেতে মাহুতেরাও আরোহন করে এবং হাতির ঘাড়ের উপরে একজন আরেকজনের পেছনে নিজেদের নির্ধারিত অবস্থানে বসে জন্তুটার বিশাল কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে আদেশ দিতে থাকে। অতিকায়, অনুগত জন্তুটা আলতোভঙ্গিতে ধীরে ধীরে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে হুমায়ুন তাঁর হাতি আর তাঁর অন্যান্য সেনাপতিদের বহনকারী হাতির বহরকে এগিয়ে যাবার সংকেত বিঘোষিত করতে তূর্যবাদকদের ইঙ্গিত করে। সৈন্যবহরে নিজেদের নির্ধারিত স্থান গ্রহনের জন্য অগ্রসর হবার সময় তারা গোলন্দাজ বাহিনীর চার চাকার উপরে স্থাপিত প্রায় বিশ ফুট লম্বা ব্রোঞ্জের নলযুক্ত কামানগুলো, যার কোনটা টানছে পঞ্চাশটা পর্যন্ত ষাড়ের দল আর কোনটা টানছে ছয়টা থেকে আটটা হাতি- পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। অপেক্ষাকৃত ছোট কামানগুলো ষাড়ে টানা গাড়িতে রাখা হয়েছে।
হুমায়ুন এরপরে ঘন সন্নিবেশিত অশ্বারোহী বাহিনীর পাশ দিয়ে এগিয়ে যায় প্রথমেই রয়েছে তার বাবার মাতৃভূমি থেকে আগত অশ্বারূঢ় যোদ্ধার দল, তাজিক, বাদশান, কিরঘিজ পর্বত আর ফারগানার উপত্যকা আর সেই সাথে আফগানিস্তান থেকে আগত যোদ্ধারা। সে বিশ্বাস করে, মোগল রাজবংশের প্রতি এরাই সবচেয়ে বিশ্বস্ত। মধ্য এশিয়ার তৃণাঞ্চল থেকে তাঁদের নিয়ে আসা ঘোড়ার পাল থেকে এখনও প্রজনন করার তাঁদের ঘোড়াগুলোই সবচেয়ে শক্তিশালী। এদের পরে সে তার অনুগত রাজপুত জায়গীরদারদের একটা অংশকে কমলা রঙে সজ্জিত দেখতে পায়। যুদ্ধের জন্য সব রাজপুতের মতোই উদগ্রীব বিশালদেহী, কাল-শুশ্রুমণ্ডিত এই লোকগুলো হুমায়ুন যখন পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখন নিজেদের ছোট, বৃত্তাকার আর কারুকার্যময় ঢালে নিজেদের তরবারি দিয়ে আঘাত করে সামরিক ভঙ্গিতে অভিবাদন জানায়।
হুমায়ুন পর্যায়ক্রমে যখন প্রতিটা বাহিনীকে অভিবাদন জানায়, সে মনে মনে ভাবে যে নিশ্চিতভাবেই বিজয়তিলক তার ললাটেই শোভা পাবে। তার সাথে আছে প্রায় সোয়া লক্ষ সৈন্যের একটা বাহিনী- শেরশাহের বাহিনীর চেয়ে কয়েক গুণ বড়। তাঁর সাথে অন্তত দশ গুণ বেশী কামান রয়েছে এবং গুজরাত অভিযানের সময় সে যেমন প্রমাণ করেছে- সে সৌভাগ্যের আশীর্বাদপুষ্ট একজন যোগ্য সেনাপতি। আগুয়ান সেনাবাহিনীর সাথে সঙ্গী হবার আর তার সৎ-বোন চঞ্চল প্রাণবন্ত গুলবদনকে সাথে নিয়ে আসবার জন্য সে তাই তার ফুপু খানজাদার অনুরোধ মঞ্জুর করেছে। প্রতিরক্ষার এহেন বন্দোবস্তের মাঝে তারা আগ্রার চেয়ে খুব একটা বেশী বিপদের সম্মুখীন হবে না, যার প্রতিরক্ষার ভার সে তার নানাজান বাইসানগার আর কাশিমের যোগ্য এবং বিশ্বস্ত হাতে অর্পন করে এসেছে। ফুপুজানের অভিজ্ঞতাঋদ্ধ পরামর্শের সাথে সাথে আবারও কখনও আফিমের আসক্তির মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেবার মতো প্ররোচনা অনুভব করলে সে তার মানসিক সমর্থন লাভ করবে এটা ভেবেই সে কৃতজ্ঞ। তিনি কখনও এর অনুমতি দেবেন না।
