আমার মরহুম আব্বাজানও আমি সেবন করতেন… বোতলটা ফিরিয়ে দেবার সময় সে ধীরে ধীরে বলে।
হ্যাঁ, কিন্তু তোমার মতো না…বাবর আফিমকে কখনও তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা তার কোনো কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করতে দেননি। আফিমের জন্য সে কখনও তার অমাত্য, সেনাপতি বা বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাদের অবহেলা করেননি। কিন্তু তোমার ভিতরে এটা একজন সম্রাটকে দাসে পরিণত করেছে। তুমি আসক্ত হয়ে পড়েছে…ঠিক অনেকটা সেই মানুষটার মতো যে সুরা ভর্তি পুরো মশকটা খালি করার বাসনা ছাড়া একপাত্র সুরার স্বাদও উপভোগ করতে পারে না। হুমায়ুন এই সর্বনাশা নেশা তোমায় ছাড়তেই হবে, নতুবা এটা তোমাকে ধ্বংস করে ফেলবে। তোমার মরহুম আব্বাজানের রেখে যাওয়া সাম্রাজ্য তুমি খোয়াবে। অনেক দেরী হয়ে যাবার আগে আফিমের নেশা ত্যাগ কর।
সে এখনও লুকান গোপনীয়তা আর আনন্দের উৎস বোতলজাত তরলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে তারপরে তখনও অশ্রুসিক্ত খানজাদার মুখের দিকে তাকায় এবং দেখে তাকে কতটা ভীত, কতটা উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। এবং সে ভালো করেই জানে যে এই ভয় হুমায়ুনের জন্য এবং তাঁর রাজবংশের জন্য সে যার একটা অংশ এবং যে বংশের জন্য সে নিজে অশেষ দুর্ভোগ সহ্য করেছে। তার মনের অলিন্দে জমে থাকা আফিমের বিষবাষ্প সরিয়ে ধীরে ধীরে খানজাদা ঠিক কথা বলেছে, কাশিমও ঠিকই বলেছিল এবং অন্যান্য সবাই যারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল তারাই ঠিক ছিল এই বোধটা তার মাঝে জন্ম নিতে থাকে। তাকে অবশ্যই শক্ত হতে হবে নিজের ভেতরে শক্ত। বাইরের কারো সহায়তা তার প্রয়োজন নেই। সহসা সে পুনরায় খানজাদার শ্রদ্ধা, তার সম্মতি লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সে তার ঘনিষ্ঠ পরামর্শকদের সাথে আর খানজাদার সাথে কেমন আচরন করেছে সেটা চিন্তা করে নিজের কাছেই লজ্জিত হয়ে উঠে।
হুমায়ুন, বোতলটা আমাকে দাও।
না, ফুপিজান। গবাক্ষের কাছে গিয়ে সে বোতলের তরল বাইরে ঢালতে থাকে তারপরে বোতলটা খালি হলে সেটা নীচের দিকে ছুঁড়ে ফেলতে নীচ থেকে বোতল ভাঙার একটা মৃদু, ভঙ্গুর শব্দ ভেসে আসতে শুনে। গুলরুখের মাদক মিশ্রিত সুরা আমি আর গ্রহণ করবো না- এটা আমি নিজে তাকে বলে দেবো। তৈমূরের এই অঙ্গুরীয়ের নামে আমি আপনার সামনে শপথ করছি যতই কঠিন হোক আমি আর কখনও আফিম বা সুরা পান করবো না। আমি গুলরুখকে তার কোনো এক ছেলের সাথে থাকবার জন্য পাঠিয়ে দেব। আমি আমার মরহুম আব্বাজানের বিশ্বাসের যোগ্য এটা আমি আপনার কাছে এবং সেই সাথে নিজের কাছে আবারও নতুন করে প্রমাণ করবো।
খানজাদা দুহাতে হুমায়ুনের মুখটা ধরে তার কপালে চুমু খায়। এই আসক্তি জয় করতে আমি তোমাকে সাহায্য করবো। আফিমের আসক্তি এতোটাই প্রবল যে সহজে এর হাত থেকে নিস্তার পাওয়া মুশকিল। হুমায়ুন তুমি একজন মহান যোদ্ধা, বিশাল মনের মানুষ আমি সেটা সবসময়েই জানতাম তুমি আরও মহীয়ান হয়ে উঠবে।
আর আমি সবসময়েই জানি আপনি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।
আর এখন?
বার্তাবাহককে পুনরায় ডেকে এনে আমি তাকে পুনরায় প্রশ্ন করার আগে আপনি কিছুটা সময় আমার সাথে থাকেন। আমি চাই তার বক্তব্য আপনিও শোনেন। তার কথা যদি সত্য হয় তাহলে অবিলম্বে আমাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
সেদিন অপরাহ্নে হুমায়ুন তাঁর সিংহাসনে গিয়ে বসে। তার অমাত্য আর সেনাপতিরা তাঁর সামনে। সে যেমনটা আদেশ দিয়েছে তারা কেউই। এমনকি সে নিজেও দিনের নিয়ন্ত্রণকারী গ্রহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রঙের পোষাক পরিধান করেনি। খানজাদা ঠিকই বলেছিল। সে যে কৃত্যানুষ্ঠানের প্রচলন করেছিল তার ফলে দরবারে না এসেছিল একতা না একাগ্রতা। তাঁর অমাত্যদের শ্রদ্ধা আর বিশ্বস্ত তা তাঁকে অন্যভাবে অর্জন করতে হবে। এবং সেটা অর্জনের একটা পথ হল যুদ্ধের ময়দানে বিজয় হাসিল করা।
বার্তাবাহক কামালের বয়ে আনা সংবাদ আপনারা ইতিমধ্যে শুনেছেন। মোগলদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শেরশাহের হামলা আমাদের সম্মানের প্রতি প্রকাশ্যে অবমাননা যা আমি কখনও বরদাশত করবো না। সেনাবাহিনী প্রস্তুত হওয়া মাত্র আমরা এই ভুঁইফোড়ের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হব। এবং শেরশাহের সাথে আমার বিরোধের যখন নিষ্পত্তি হবে তখন আমি তাকে দাস ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেব, শেরশাহের পূর্ব পুরুষেরা যেমন অর্থব ঘোড়া কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দিত।
হুমায়ুনের বক্তব্য শেষ হতে, বিগত মাসগুলোতে প্রায় স্তব্ধ হয়ে আসা দরবার কক্ষে একটা প্রবল গর্জন শোনা যায়। হুমায়ুনের সেনাপতিরা তাদের গোত্রের বহু প্রাচীন প্রথা অনুসারে নিজেদের ঢালের সাথে নিজেদের তরবারি আঘাত করতে থাকে এবং তাঁদের মন্দ্র কণ্ঠস্বরে একটা শ্লোগান ধীরে ধীরে ধ্বনিত হতে থাকে মির্জা হুমায়ুন, মির্জা হুমায়ুন, যা তাঁর ধমনীতে বহমান তৈমূরের রক্তের কথা ঘোষণা করে। হুমায়ুন তার সিংহাসনের একপাশের দেয়ালে অনেকটা উপরে অবস্থিত নক্সাকরা জাফরির দিকে তাকায় যার পেছনে দাঁড়িয়ে সে জানে যে খানজাদা তাঁকে দেখছে এবং তাঁর কথা শুনে মিটিমিটি হাসছে। সব আবার আগের মতো হয়ে যাবে। আরো একবার মোগল সম্রাট নিজের বাহিনীকে নেতৃত্ব দেবে। শান্তির কুশীলব হিসাবে সে হয়তো নিজেকে প্রমাণ করতে পারেনি কিন্তু একজন সেনাপতি হিসাবে সে নিজের দক্ষতা কি প্রমাণ করেনি?
২.১ সংঘাতময় বিক্ষুব্ধতার কেন্দ্রে অবস্থান – দ্বিতীয় পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব – সংঘাতময় বিক্ষুব্ধতার কেন্দ্রে অবস্থান
০৬. নিজাম ভিস্তি
