আপনি কি চান? হুমায়ুন নির্বোধের মতো খানজাদার দিকে তাকিয়ে থাকে, ঠিক বুঝতে পারে না আসলের ফুপিজান সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাকি এটাও একটা কল্পনা।
উঠে বস। তুমি একজন যোদ্ধা- একজন সম্রাট- কিন্তু তোমার সাম্রাজ্য যখন হুমকির সম্মুখীন তখন হারেমের একজন খোঁজার মতো মাদকাচ্ছন্ন অবস্থায় আমি তোমাকে অন্ধকার এক কোণে শুয়ে থাকতে দেখছি…আসকারির বার্তাবাহকের আগমন আর কি খবর সে নিয়ে এসেছে আমি এইমাত্র জানতে পেরেছি। তুমি তোমার উপদেষ্টামণ্ডলীদের তখনই কেন ডেকে পাঠাওনি?
আমি যখন প্রস্তুত হব তখন তাদের ডেকে পাঠাব…
নিজের দিকে একবার চেয়ে দেখো! খানজাদা রুবি দিয়ে কারুকাজ করা একটা আরশি তুলে নিয়ে সেটা হুমায়ুনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। বার্ণিশ করা উপরিতলে সে বিষণ্ণ একটা মুখ আর বিস্ফারিত তারারন্ধ্রযুক্ত দূরাগত একজোড়া চোখ আর তাঁদের নীচে সৃষ্ট প্রায় গাঢ় বেগুনী বর্ণের থলের ছবি ফুটে উঠতে দেখে। খুবই পরিচিত মনে হওয়া মুখাবয়বের দিকে সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে কিন্তু খানজাদা এক ঝটকায় আরশীটা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সেটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারতে আরশীর ধাতব উপরিতল বেঁকে যায় আর অনেকগুলো রুবি স্থানচ্যুত হয়ে মেঝেতে খসে পড়ে। রক্তবিন্দুর মতো লাল পাথরগুলো মেঝেতে পড়ে থাকে।
খানজাদা হুমায়ুনের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে তার কাঁধ আকড়ে ধরে। আফিম তোমার স্মৃতি শক্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে…আরশিতে তুমি নিজেকেই নিজে চিনতে পারনি, তাই না? তুমি কে সেটা কি আমাকে তোমায় মনে করিয়ে দিতে হবে… তোমার সাহসিকতা, তোমার আব্বাজানের পক্ষে তোমার অগণিত যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস, তোমার নিয়তি আর মোগল রাজবংশের প্রতি তোমার দায়িত্বের কথা কি আমি তোমায় বলে দিব? আমরা কে- তৈমূরের উত্তরসূরী- আমরা- তুমি আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছি সবকিছু কি তুমি ভুলে গিয়েছে? আমি তোমাকে আগেও সতর্ক করতে চেষ্টা করেছি যে বাস্তবতার সাথে তোমার সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে আসছে কিন্তু তুমি আমার কথায় গুরুত্ব দাওনি। কিন্তু আমি এবার বাধ্য হব জোর করতে। তোমার ধমনীতে যে রক্ত বইছে আমার ধমনীতেও সেই একই রক্ত বইছে। তোমার আব্বাজান আমার ভাই- যার জন্য লড়াই করেছেন এতো কষ্ট সহ্য করেছেন, সেসব কিছু খোয়াবার ভয় ছাড়া আর কোনো কিছু নিয়েই আমি ভীত নই।
ফুপিজান এসব কি বলছে? সহসা সে হুমায়ুনকে ছেড়ে দিয়ে, পেছনে হেলান দিয়ে বসে, নিজের ডান হাত দিয়ে গায়ের সমস্ত শক্তিতে হুমায়ুনের একটা চড় বসিয়ে দেয়। খানজাদা পাগলের মতো তাঁকে আঘাত করতে থাকে। প্রথমে ডান গালে তারপরে তাঁর বাম গালে। তার গাল বেয়ে অঝোরে কান্নার ঢল নেমে আসে।
তুমি আবার আগের মতো হও। তোমার আব্বাজানের মনোনীত উত্তরাধিকারীর যোগ্য হয়ে উঠ, সে চিৎকার করে বলতে থাকে। আফিম আর কৃত্যানুষ্ঠানের এই জাল যা তোমার অমাত্যদের বিরূপ করে তুলছে আর শাসক হিসাবে তোমার যোগ্যতাকে আপোসপ্রবণ করে তুলেছে এসব পরিত্যাগ কর। তোমার বাবার মতোই তুমিও একজন যোদ্ধা। তারকারাজি কি বলছে সে সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা করা বন্ধ কর এবং বাবর যেমন প্রত্যাশা করতেন পারলে সেরকম হয়ে উঠ, দোহাই এই একটা কাজ কর!
ফুপিজান তাকে আঘাত করা বন্ধ করেছে কিন্তু তীব্র ব্যাথায় তার মনের কুয়াশা পরিষ্কার হতে শুরু করে। তিনি প্রথমে কথা শুরু করার পরে সেই কথাগুলো যা প্রথমে অর্থহীন মনে হয়েছিল ধীরে ধীরে অর্থবোধক হয়ে উঠতে থাকে। কথাগুলো তার মনের ভিতরে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট অতীতের প্রতিচ্ছবি যা তারা তাঁর মানসপটে ভাসিয়ে তুলে- যুদ্ধের উন্মাদনা, অমাত্যদের সাথে মল্লযুদ্ধের সময় বা আব্বাজানের সাথে দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে শিকারে যাবার সময়ে সে নিজের মাঝে যে আন্ত্রিক উত্তেজনা অনুভব করে। সেই প্রাণবন্ত, পরিপূর্ণ, পার্থিব জগত এক সময়ে সে নিজে যেখানে বাস করতো…
হুমায়ুন, আফিমের নেশা ত্যাগ কর…নেকাটা তোমাকে শেষ করে ফেলছে। আফিম তুমি কোথায় রাখো?।
কয়েকমাস আগে বাংলায় তার মনোনীত শাসনকর্তার প্রতিনিধিকে কাশিম আর বাইসানগার তার পরিবর্তে যখন পরামর্শ দিতে বাধ্য হয় তখন কাশিমের মৃদুকণ্ঠে, উচ্চারিত সতর্কবাণীর কথা তার মনে পড়ে যায়। সে যদি নিজে লোকটার সাথে কথা বলতো তাহলে হয়তো সে লোকটার আচরণে কোনো তারতম্য খেয়াল করতো বা কোনো নির্দেশনা দিতে পারতো যা শেরশাহকে বিদ্রোহ করা থেকে বিরত রাখতে পারতো? বা শেরশাহ সম্ভবত বাংলায় কি ঘটছে সে বিষয়ে তাঁর অনীহা সম্বন্ধে কোনভাবে জানতে পেরেছিল। হুমায়ুনের হাত ধীরে ধীরে তার গলায় মালার ঝুলতে থাকা লকেট স্পর্শ করে। সেটা খুলে নিয়ে সে লকেটটা খানজাদার হাতে তুলে দেয়। তারপরে, একইরকম মন্থরবেগে, সে তখনও আধখোলা অবস্থায় থাকা আলমারির দিকে হেঁটে যায় যেখানে সে গুলরুখের আফিম মিশ্রিত সুরার বোতল রাখে। বোতলের খোঁজে সে ভিতরে হাত দিলে ভেতরের অন্ধকারে গাঢ়, প্রায় বেগুনী বর্ণের তরল চিকচিক করে উঠে। এতো জ্ঞান, এতো আনন্দ এটা তার জন্য বয়ে নিয়ে এসেছে…চিন্তার এতো খোরাক যুগিয়েছে। কাশিম আর খানজাদার দাবী অনুযায়ী আসলেই কি এটা এতো ধ্বংসাত্মক শক্তির অধিকারী?
