নিজের আবাসনকক্ষে ফিরে এসে, চোখে মুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে এবং বেগুনী রঙের একটা সাদাসিধে জোব্বা পরিহিত অবস্থায়, আধ ঘন্টা পরে হুমায়ুন পূর্বাঞ্চল থেকে আগত লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে যার আগমনের কারণে বিশ্রামরত অবস্থা থেকে উঠে আসতে সে বাধ্য হয়েছে। দীর্ঘকায়, হালকা পাতলা গড়নের বার্তাবাহক লোকটার ঘামের দাগ লেগে থাকা কাপড় তখনও রাস্তার ধূলোয় ধুসরিত। হুমায়ুনের সাথে কথা বলার জন্য অতিশয় ব্যগ্র থাকায় সে অভিবাদন জ্ঞাপনের কৃত্যানুষ্ঠান প্রায় ভুলতে বসেছিল যতক্ষণ না কাশেম তীক্ষ্ণ কণ্ঠে তাকে সে কথা মনে করিয়ে দেয়। নতজানু অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই সে কথা শুরু করে। সুলতান, আমার নাম কামাল। জৌনপুরে আপনার ভাই আসকারির অধীনে আমি কাজ করি। সেখানে শের শাহের নেতৃত্বে একটা জোরাল বিদ্রোহের কথা আমাদের কানে এসেছে। আপনার ভাই বিষয়টা কতখানি বস্তুনিষ্ট সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন তারপরেই আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে সর্তক করতে।
হুমায়ুন কোনো কথা না বলে তাকিয়ে থাকে। শেরশাহ বাংলায় যদিও বিশাল একটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু ঘোড়া বিক্রেতার নাতি নিশ্চয়ই তাকে হুমকি দেবার কথা স্বপ্নেও কল্পনা করবে না। মোগলদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সে নিজে বাবরের কাছে মুচলেকা দিয়েছে। উচ্চাকাঙ্খ অবশ্য অনেক সময়েই মানুষকে হঠকারী পথের দিকে নিয়ে যায়। সে শের উপাধি গ্রহণ করেছে, যার মানে ব্যাঘ, ব্যাপারটা সম্ভবত একটা অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। সম্ভবত সত্যিকারের ব্যাঘ্র রাজবংশ- মোগলদের, সরাসরি দ্বৈরথে আহবান জানাবার অভিপ্রায়ে সে এসব করছে। হুমায়ুন তার আঙ্গুলের তৈমূরীয় অঙ্গুরীয়টার দিকে তাকায়, কিন্তু আফিমের কারণে তখনও তার চোখের মণি প্রসারিত হয়ে থাকায়, সে অঙ্গুরীয়টার উপরিতলে খোদাই করা ক্রুদ্ধ গর্জনরত বাঘের খোদাই করা প্রতিকৃতির উপরে ঠিকমতো ফোকাস করতে পারে না।
হুমায়ুন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বার্তাবাহকের প্রতি পুনরায় নিজের মনোযোগ নিবদ্ধ করে। আমাকে আরও খুলে বল।
শেরশাহ মোগল এলাকার একটা বিশাল অংশ নিজের বলে দাবী করছে। সে নিজেকে মোগলদের বিরুদ্ধে সমগ্র হিন্দুস্তানের প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা হিসাবে ঘোষণা করেছে এবং শপথ নিয়েছে তৈমূরের বংশে জন্ম নেয়া সব যুবরাজের কবল থেকে হিন্দুস্তানকে রক্ষা করবে। এমনকি সবচেয়ে গর্বিত গোত্রপতিরাও ক্রমশ তাঁর বশংবদে পরিণত হচ্ছে। আপনার ভাইয়ের কাছ থেকে আমি আপনার জন্য একটা চিঠি নিয়ে এসেছি যা আপনাকে সেখানে আসলে কি ঘটেছে তার সবকিছু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করবে- শেরশাহ কতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে, তার প্রতি কতজন গোত্রপতি নিজেদের সমর্থন ঘোষণা করেছে…–চিঠিটা এখানে রয়েছে, উটের চামড়া দিয়ে তৈরী একটা থলি তার দিকে এগিয়ে দেয়।
ওটা আমার উজিরকে দেবে। আমি যখন বিশ্রাম নেব তখন আমি চিঠিটা পড়ে দেখবো।
বার্তাবাহক লোকটা বিস্মত দেখায় কিন্তু এক মুহূর্তও দেরী না করে সে থলিটা কাশিমের হাতে তুলে দেয়।
কাশিম- আপনি নিজে বিষয়টা লক্ষ্য করবেন যেন দূর্গের ভেতরে বার্তাবাহকের থাকা আর খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। কিন্তু কাশিমও তাঁর দিকে বিচিত্র ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে বলে মনে হয়। সে বুঝতে পারেনি যে তাড়াহুড়ো করে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে কোনো লাভ হবে না। হুমায়ুনের মনের ঘোর যখন কেটে যাবে- পরে কখনও- তখন সে নিজের কর্তব্যকর্ম সম্বন্ধে ভেবে দেখবে। এখন যাও। আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।
বার্তাবাহক আর কাশিমের পেছনে দরজার পাল্লা বন্ধ হয়ে যেতে, হুমায়ুন গবাক্ষ দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। নির্মেঘ আকাশের বুকে একটা নিখুঁত কমলা রঙের চাকতির মতো সকালের সূর্য উঠছে। দূর্গের লাল বেলেপাথর এমন ভাবে আভা ছড়ায় যেন এক্ষুনি পুরো দূর্গটা আগুনের শিখায় ঝলসে উঠবে। হুমায়ুন চোখ কচলায় এবং তার পরিচারককে ইশারায় জানালার শুকনো ঘাসের তৈরী পর্দা টাট্টি নামিয়ে দিয়ে নির্মম উজ্জ্বলতাকে আড়াল করতে বলে যার ফলে তাঁর মাথার ভেতরটা দপদপ করছে। শেরশাহের খবরটা সত্যিই আতঙ্কিত হবার মতো এবং তাকে অবশ্যই সমুচিত জবাব দিতে হবে কিন্তু তারও আগে তাঁর ঘুম দরকার আর এমন কিছু একটা করা যার ফলে তাঁর মন প্রশান্ত হবে। সে লাল রঙের সুগন্ধিযুক্ত রোজউডের তৈরী একটা কারুকার্যখচিত আলমারির দিকে এগিয়ে যায় এবং সেটা খুলে ভেতর থেকে গুলরুখের তৈরী সুরার একটা বোতল বের করে আনে। এটা তাকে সাহায্য করবে, করার তো কথা? সে বোতলটার ছিপি খুলে কিন্তু তখন তার মনে হয় মধ্যাহ্নের আগে শেরশাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার সময় তাঁর মাথা পরিষ্কার থাকা দরকার। কিন্তু কি এমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণটা মধ্যাহ্ন পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়া হয়। সে আকিক পাথরের তৈরী পানপাত্রে গুলরুখের তৈরী মিশ্রণটা ঢালে। কয়েক মিনিটের ভিতরের সে ভেসে যেতে থাকে আর প্রায় সাথে সাথে তার স্বপ্নের ভেতর এক ধরনের উত্তেজনা এসে ভর করে।
টাট্টিগুলো তুলে দাও আর সুলতানের সাথে আমাকে একটু একা থাকতে দাও, একটা ক্রুদ্ধ মহিলা কণ্ঠ শোনা যায়। হুমায়ুন। কণ্ঠটা এবার তাঁর নাম ধরে চিৎকার করে ডাকছে এবং ক্রমশ মনে হয় তার দিকে এগিয়ে আসছে। হুমায়ুন! শীতল পানি একটা ঝাপটা তাঁকে সচেতন করে তুলতে সে হাঁসফাঁস করে উঠে বসে। কোনোমতে চোখ খুলে সে খানজাদাকে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, হাতে পিতলের একটা খালি পানির কলসি আর দুচোখ দিয়ে আগুন ঝরছে।
