সেই অভিযানটাকে এখন কতদিন আগের কথা বলে মনে হয় যেন অন্য কোনো জীবনের স্মৃতি। অভিযোগ প্রকাশ করে মিরাক বেগের বলা কথাগুলো আপনি আমাদের কোনো বিজয় এনে দেননি…আফিম সেবন আর তারকারাজির দিকে তাকিয়ে আপনি আপনার সময় অতিবাহিত করছেন। মিরাক বেগের মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য কিন্তু তাঁর অভিযোগের ভিতরে কোথায় যেন সামান্য হলেও সত্যের নিবিড়তা উঁকি দেয়। সে সাম্রাজ্যের শাসনকার্য যেভাবে পরিচালনা করছে, কিংবা তার আফিম সেবনের পরিমাণ সম্বন্ধে তার আব্বাজান কি মন্তব্য করতেন? কাশিম আর খানজাদা যেমন অনুরোধ করেছে, তার চারপাশে যারা রয়েছে তাঁদের প্রতি আরো বেশী মনোযোগী হবার স্বার্থেই হয়তো মাদক গ্রহণের মাত্রা তার হ্রাস করা উচিত। কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে, তাই কি মনে হয় না? মোগলদের যাযাবর, বর্বর সময় এখন কেবলই স্মৃতি। সে একটা সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা এবং সমৃদ্ধি আর অনুপ্রেরণার নতুন উৎস, শাসনকার্য পরিচালনার নতুন পদ্ধতি যে সে খুঁজে চলেছে সেটা আর কারো না একান্তই তার এক্তিয়ারভুক্ত। তারকারাজি যাদের দীপ্তি এমনকি কোহ-ই-নূরের চেয়েও প্রখর তারা তাকে হতাশ করবে না।
হতাশ করবে না সালিমাও। তাঁর পরিচারিকাটি দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করতে, সালিমা শোয়া অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে প্রণয়সিক্ত ভঙ্গিতে সে হুমায়ুনের লাল আলখাল্লার বাধন আলগা করতে শুরু করলে, নরম রেশমের নীচে তার কাঁধ আর বাহুর শক্ত পেশীর উপরে তার আঙ্গুলগুলো আসন্ন আনন্দের বার্তা নিয়ে দৌড়ে বেড়ায়। সে ফিসফিস করে কেবলই আউড়াতে থাকে, আমার সম্রাট। সালিমার নগ্ন স্তনে এলিয়ে থাকা লম্বা কালো চুল সে দুহাতে আকড়ে ধরে এবং সবেগে তাঁকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে, সঙ্গসুখের জন্য ব্যগ্র তারা পরস্পরের সান্নিধ্য উপভোগ করে যতক্ষণ না মোনতা ঘামের ধারায় তাঁদের দুজনের দেহ সিক্ত হয়ে উঠে অবশেষে রিক্ত পরিশ্রান্ত হয়ে একে অপরের আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় তারা বিছানায় লুটিয়ে পড়ে।
কয়েক ঘন্টা পরের কথা, হুমায়ুন সালিমার পাশে শুয়ে আছে। উন্মুক্ত বাতায়ন পথে বাতাসের স্নিগ্ধ একটা স্রোত বয়ে চলে আর পূর্বদিকের আকাশে ইতিমধ্যে ধুসর আলো ফুটতে শুরু করেছে। সালিমা ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে কিছু বলে এবং তারপরে ঘুরে গিয়ে নিজের নরম, মসৃণ কটিদেশ দিয়ে হুমায়ুনকে স্পর্শ করে, নিজের স্বপ্নের মাঝে বিভোর হয়ে যায়। কিন্তু কোনো দুর্বোধ্য কারণে নিদ্রাদেবী হুমায়ুনের কাছ থেকে কেবলই পালিয়ে বেড়ায়। সে চোখ বন্ধ করে যতবার ঘুমাতে চেষ্টা করে প্রতিবারই মিরাক বেগের বিকৃত, নিঃশ্বাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকা মুখবিবরে ফেনায়িত হলুদ লালা আর করোটি থেকে অর্ধেক বেড়িয়ে আসা আতঙ্কগ্রস্থ দুটো চোখ সে দেখতে পায়। অস্থিরতা সৃষ্টিকারী এসব প্রতিকৃতিগুলোকে মন থেকে বিতাড়িত করতে অনেক আগেই তার উচিত ছিল গুলরুখের বিখ্যাত সুরা পান করা কিন্তু সুরার পাত্রটা সে নিজের আবাসন কক্ষে রেখে এসেছে। সে যাই হোক, নিজের অস্থির চিত্তকে সে এখনও প্রশান্ত করতে পারে। সে নিজের গলায় একটা সরু চেন দিয়ে ঝোলান নীলকান্তমণি খচিত সোনার লকেটের ভেতর থেকে আফিমের বেশ কয়েকটা দলা বের করে এবং একটা পাত্রে পানি নিয়ে সেগুলো গলাধঃকরণ করে। সে গলায় সেই পরিচিত তিক্ত কটু স্বাদ টের পায় কিন্তু তারপরেই সে টের পায় তন্দ্রালু, অবসন্ন একটা উষ্ণতা কোথা থেকে যেন চুঁইয়ে তার ভিতরে ছড়িয়ে পড়ছে। চোখের পাতা শেষ পর্যন্ত ভারী হয়ে আসতে থাকলে, হুমায়ুন টানটান হয়ে শুয়ে থাকে। চন্দনকাঠের তেলের মানসিক প্রসন্নতা আনয়নকারী মাধুৰ্য যা দিয়ে সালিমা নিজের দেহ সিক্ত করতে পছন্দ করে, হুমায়ুনের নাসারন্ধ্র আপুত করলে সে ধীরে ধীরে তার অতলে তলিয়ে যেতে শুরু করে।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই- অন্তত হুমায়ুনের কাছে তাই মনে হয় নির্বন্ধিতভঙ্গিতে একটা নারী কণ্ঠ তাঁকে সম্বোধন করছে সে শুনতে পায়।
সুলতান…সুলতান…একজন বার্তাবাহক এসেছে।
বিমূঢ় অবস্থায়, হুমায়ুন উঠে বসে। সে কোথায় আছে? সে ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাতে সালিমাকে দেখতে পায়, তাঁর পাশে এখন উঠে বসছে আর রেশমের একটা গোলাপী রঙের আলখাল্লা টেনে নেয় নিজের নগ্নতাকে আড়াল করতে। কিন্তু যাঁর কণ্ঠস্বরে সে ঘুম থেকে জেগেছে সেটা তাঁর না। সেটা হারেমের এক খিদমতগার, বারলাসের বেটে আর মোটা একটা মহিলা যার মুখের ত্বক আখরোটের মতো বলিরেখায় পূর্ণ।
সুলতান, আমায় মার্জনা করবেন, হুমায়ুনের নগ্ন দেহের উপর থেকে বারলাস নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। বার্তাবাহক পূর্ব দিক থেকে এসেছে, সে বলছে আপনার ভাই আসকারির কাছ থেকে জরুরী সংবাদ নিয়ে এসেছে। এখন যদিও অনেক সকাল, সে অবিলম্বে আপনার সাথে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছে এবং কাশিম আমাকে আদেশ করেছে আপনাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে সংবাদটা জানাতে।
বারলাসের দিকে হুমায়ুন অমনোযোগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে কি বলছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করে কিন্তু আফিম তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাকে অনেক শ্লথ করে ফেলেছে। ঠিক আছে। আমি এখনই আমার আবাসনকক্ষে ফিরছি। কাশেমকে বলবে বার্তাবাহককে নিয়ে সেখানে আমার সাথে দেখা করতে।
