মিরাক বেগ, হাঁটু গেড়ে বসে নতজানু হও। গোত্রপতির চেহারায় এতক্ষণে বিস্ময় ফুটে উঠে যেন এর আগ মুহূর্ত পর্যন্তও সে বিশ্বাস করেনি হুমায়ুন তাঁকে সত্যিই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করবে। তার মুখ রক্ত শূন্য হয়ে পড়তে তার উপরের ঠোঁটের সাদা ক্ষতচিহ্নটা প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়ে পুরো মুখে মসৃণ পাণ্ডুর পৃষ্টের মতো একটা অশুভ দীপ্তি ফুটে উঠে। সে জীহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজায়, তারপরে পুনরায় সাহস সঞ্চয় করে, দরবারে উপস্থিত সবাই শুনতে পাবে এমন কণ্ঠে কিছু বলতে শুরু করে।
সুলতান…প্রথমে পানিপথে এবং পরবর্তীতে গুজরাতে আমি জীবনপণ করে আপনার জন্য লড়াই করেছি…আপনার প্রতি আমি সবসময়ে অবিচল আনুগত্য প্রদর্শন করে এসেছি। পেটমোটা, ভীরু আর কাপুরুষ এক বণিকের সাথে রঙ্গরসিকতা করতে গিয়ে আমি একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। সেজন্য মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য হতে পারে না। আমি আর আমার লোকেরা সবাই যোদ্ধার জাত, কিন্তু গুজরাতের পরে আপনি আমাদের আর কোনো যুদ্ধের সুযোগ দেননি…না কোনো বিজয়ের গৌরব…আফিম সেবন করে তারকারাজির দিকে তাকিয়ে থেকেই আপনি আজকাল সময় অতিবাহিত করছেন যখন আপনার উচিত ছিল নিজের সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়া। নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে আমরা সেজন্যইতো এসেছি…সে প্রতিশ্রুতিই আপনি আমাদের দিয়েছিলেন…একটার পরে একটা বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার সময় আমাদের ঘোড়ার খুরের দাপুটে বোল পৃথিবীর বুকে প্রতিধ্বনি তুলবে…।
যথেষ্ট! দাঁড়িয়ে থাকা দুই জল্লাদকে হুমায়ুন তাঁর হাত তুলে কিছু একটা ইশারা করে। তারা তাদের হাতের কুঠার নামিয়ে রাখে এবং পাশের একটা স্তম্ভের আড়াল থেকে তাদের একজন একটা ছোট বস্তা তুলে নেয়। তারপরে, হুমায়ুনের প্রহরীরা দুপাশ থেকে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মিরাক বেগের কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরতে, জল্লাদদের একজন তার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে, আকষ্মিকভাবে তার মাথা পেছনের দিকে টেনে ধরে এবং তাঁকে মুখ খুলতে বাধ্য করে। বস্তা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা এবার বস্তার ভেতরে হাত ঢুকায়। লোকটা এবার উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের একমুঠো গুড়ো বস্তার ভেতর থেকে বের করে এনে সেটা, মিরাক বেগের ব্যাদান হয়ে থাকা মুখের গহ্বরে ঠেসে গুঁজে দিতে গোলমরিচ আর হলুদ গুড়োর তীব্র ঝাঝালো গন্ধ হুমায়ুনের নাকে এসে ধাক্কা দেয়।
মিরাক বেগ সাথে সাথে নিঃশ্বাস নেবার জন্য খাবি খেতে শুরু করে। তাঁর হা-হয়ে থাকা চোয়ালের ভিতর দিয়ে তাঁর গলার ভেতরে দ্বিতীয়বার তারপরে তৃতীয়বার মুঠোভর্তি গুড়ো ঠেসে দিতে বেচারার দড়দড় করে পানি পড়তে থাকা চোখ দুটো যেন মাথার ভেতর থেকে ঠিকরে বেড়িয়ে আসতে চায়। তার মুখ ইতিমধ্যে বেগুনী বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে এবং তার নির্যাতিত মুখ থেকে হলুদ নিষ্ঠীবনের ধারা গড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে নাক দিয়ে অঝোরে শ্লেষ্ম ঝরছে। নতজানু অবস্থায় তাকে ঠেসে ধরে থাকা লৌহমুষ্ঠির হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সে মরীয়া হয়ে চেষ্টা করতে থাকে এবং উঠে দাঁড়াবার জন্য ধ্বস্তাধ্বস্তির সময়ে ফাঁসিতে ঝোলান কোনো লোকের মতো পা দুটো উদ্দেশ্যহীনভাবে লাথি মারে।
হুমায়ুন তার চারপাশে আঁতকে উঠে দমবন্ধ করার শব্দ শুনতে পায়। কাশিম মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং বাইসানগারও আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজের দৃষ্টি অন্যত্র নিবদ্ধ করতে। এমনকি সীতাকেও বিপর্যস্ত দেখায়, নিজের অজান্তে হাতের তালুতে নখ গেঁথে যাওয়া একটা হাত সে মুখের কাছে তুলে আনে এবং তাঁর চোখ দুটো আতঙ্কে গোল দেখায়। আর কয়েকটা মুহূর্ত এবং তারপরেই সবকিছু চুকেবুকে যাবে। মিরাক বেগ শেষবারের মতো দেহের সবটুকু শক্তি জড়ো করে অঝোরে পানি পড়তে থাকা চোখ দুটো খুলে এবং এক মুহূর্তের জন্য সে চোখের দৃষ্টি হুমায়ুনকে বিদ্ধ করে, আর তারপরেই তাঁর দেহ নিথর হয়ে যায়।
হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায়। অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি। আমার আইন অমান্য করার ধৃষ্টতা যারা দেখাবে তাঁদের সবাইকে এই একই পরিণতি বরণ করতে হবে। হুমায়ুনের সোনালী সিংহাসন, সিংহাসনের গদি- দিনটি মঙ্গলের প্রভাবাধীন হওয়ায় লাল মখমলে আবৃত, যে মঞ্চে অবস্থিত সেখান থেকে সে নেমে দাঁড়ায় এবং দুপাশে নিজের দেহরক্ষীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে সে দরবার কক্ষ ত্যাগ করে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সেখানে নিরবতা বিরাজ করে, তারপরে তাঁর অমাত্যরা আরো একবার নিজেদের জীহ্বার উপর দখল ফিরে পেলে তার পেছনে অনেকগুলো কণ্ঠস্বরকে একসাথে হড়বড় করে কথা বলতে শোনে।
সবেমাত্র সন্ধ্যা হয়েছে। যমুনার বুকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, ইতিমধ্যে চাঁদ উঠেছে এবং রূপালী আলোয় নদীর তীর ভাসিয়ে দিচ্ছে যেখানে উট আর গরুর পাল জলের তৃষ্ণা মেটাতে এসেছে। সে আজকে সালিমার কাছে যাবে। আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার কারণে আজকাল আর সে আগের মতো তাঁর কাছে যায় না। সালিমার তুলতুলে, সোনালী দেহটার কথা ভেবে সে মুচকি হাসে।
রূপালী কারুকার্যখচিত একটা নীচু ডিভানে সালিমা শুয়ে তার খিদমতে নিয়োজিত এক পরিচারিকা তাঁর পায়ের পেলব পাতায় মেহেদীর জটিল নক্সা আঁকছে। গুজরাত অভিযানের সময় হুমায়ুন যে ধনসম্পদ অভিহরণ করেছিল সেখান থেকে সালিমাকে সে রত্নখচিত যে পরিকরটা দিয়েছিল দুই মেয়েটা কেবল সেটাই পরিধান করে রয়েছে।
