এহেন অবিচারের কারণে সিতার কণ্ঠস্বর ক্রোধে কাঁপতে থাকে কিন্তু সে নির্ভয়ে সরাসরি হুমায়ুনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি আমার স্বামীর জন্য ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছি। সে মহামান্য সুলতানের একজন বিশ্বস্ত প্রজা এবং সর্বোপরি তাঁর বয়স হয়েছে। আপনার সৈন্যদের উচিত ছিল তাঁর প্রতি নির্দয় আচরণ না করে তাঁকে রক্ষা করা। আজ তিনি মৃতবৎ নিজের বাসায় শুয়ে আছেন তাঁদের দেয়া আঘাতের ফলে তার সারা দেহে সৃষ্ট ক্ষতস্থানগুলোতে পূজ জমেছে…
মহিলাকে প্রশ্ন করতে প্রস্তুত কাশিম সামনে এগিয়ে আসে কিন্তু হুমায়ুন তাঁকে পেছনে সরে আসতে ইঙ্গিত করে। সৈন্যদের এহেন আচরণ তাঁর মর্যাদার জন্য ক্ষতিকর। নিজের প্রজাদের কাছে তাঁকে সূর্যের মহিমায় মহিয়ান হতে হবে। তাঁদের সবার উপরেই যেন তাঁর দীপ্তি আর উষ্ণতা আপতিত হয় কিন্তু এই হতভাগ্য ব্যবসায়ী অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছেন…
এই সৈন্যদের সম্পর্কে আপনি আমাকে আর কিছু কি বলতে পারবেন? আপনি কি তাদের নাম জানেন?
আমার স্বামী কেবল বলেছেন যে সৈন্যদের একজন তাদের দলপতিকে মিরাক বেগ বলে সম্বোধন করেছিল এবং সে লম্বা, চওড়া দেখতে আর তার নাক ভাঙা এবং একটা সাদা ক্ষতচিহ্ন তাঁর ঠোঁটকে বিকৃত করেছে।
হুমায়ুন ভালো করেই চেনে মিরাক বেগকে বাদখশানের এক উজ্জ্বল, ন্যায়নীতি বিবর্জিত এক গোত্রপতি যে হিন্দুস্তান অভিযানের সময় হুমায়ুন আর তাঁর আব্বাজানের সাথে সেখান থেকে এসেছিল। পানিপথে নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে শত্রুপক্ষের একটা রণহস্তির পেছনের পায়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শত্রুপক্ষের তিরন্দাজদের হত্যা করতে, যারা জন্তুটার পিঠে স্থাপিত একটা হাওদায় অবস্থান করে হুমায়ুনের সৈন্যদের উদ্দেশ্যে অনবরত তীর নিক্ষেপ করছিল, সেখান থেকে একলাফে সে জন্তুটার পিঠে উঠে বসে স্বাতন্ত্রমণ্ডিত একজন যোদ্ধা হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানের অপরাধের জন্য অতীতের বীরত্ব কোনো অজুহাত হতে পারে না। মিরাক বেগকে অবশ্যই নিজের এই যথেচ্ছাচারের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
আপনি এতোক্ষণ যা বলেছেন সেটা যদি সত্যি হয়, আমি ওয়াদা করছি আপনি ন্যায়বিচার পাবেন। আপনি এখন বাসায় ফিরে যান এবং আমার সমনের জন্য অপেক্ষা করেন। কাশিম- মিরাক বেগকে খুঁজে বের করে যত দ্রুত সম্ভব আমার সামনে এনে হাজির কর।
হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং দর্শনার্থীদের জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছুটে বেড়িয়ে আসে। তার গা গুলিয়ে উঠে বমি পায়। তার মাথা আবার ব্যাথা করছে- তাঁর চোখের পেছনে তীক্ষাগ্র কোনো কিছু দ্বারা আঘাতের যন্ত্রণাটা আজকাল প্রায় নিয়মিতই হচ্ছে আর সেইসাথে ভুল দেখার মাত্রাও বেড়ে গিয়ে কোনো কিছুর প্রতি মনোনিবেশ করাটা তার জন্য আরও কঠিন করে তুলেছে। যন্ত্রণা উপশমের জন্য, তার মনকে প্রশান্ত করতে আর দরবারের এইসব বিরক্তিকর বাধ্যবাধকতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে, তাঁর আরও আফিম এবং সুরা প্রয়োজন।
*
সপ্তাহের মঙ্গলবার পরিচালিত হয় মঙ্গল গ্রহ দ্বারা, এদিনের জন্য যথার্থ পোষাক রক্ত লাল রঙের আলখাল্লা পরিহিত হুমায়ুন মিরাক বেগের অবাধ্য মুখাবয়বের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। শিকল দিয়ে বেঁধে তাঁকে দরবার কক্ষে আনা হয়েছে বটে, কিন্তু সে তারপরেও নিজের চিরাচরিত হামবড়াভাব ঠিকই বজায় রেখেছে। হুমায়ুনের মুখের দিকে সে তার কালো চোখ দিয়ে স্থিরভাবে তাকিয়ে থাকে এবং তাঁকে দেখে মনেই হয় না সদ্য তেল দেয়া কুঠার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জল্লাদদের বা প্রাণবধকারী পাথরের গায়ে জমে যাওয়া লাল রক্তের কালো দাগ- সে লক্ষ্য করেছে। সিংহাসনের ডান পাশে স্থাপিত প্রকাণ্ড কালো গ্রানাইট পাথরটার উপরে একটু আগেই উন্মত্তের হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে মিরাক বেগের চারজন লোক তাদের ডান হাত খুইয়েছে এবং সদ্য কর্তিত হাতের অবিশিষ্টাংশ সংক্রমন রোধে গনগনে লাল লোহার টুকরো দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। লোকগুলোকে সরিয়ে নেয়া হলেও, বাতাস এখনও তাদের মাংস পোড়র গন্ধে ভারী হয়ে আছে।
মিরাক বেগ, তোমার সৈন্যদের কপালে কি শাস্তি জুটেছে সেটা যাতে তুমি প্রত্যক্ষ করতে পার, সেজন্য আমি তোমাকে সবার শেষে আনতে বলেছি। তারা অন্যায় করেছে এবং সেজন্য উপযুক্ত শাস্তি পেলেও, তুমি, তাদের নেতা হিসাবে তাদের এই জঘন্য অপরাধের দায়দায়িত্ব তোমাকেই বহন করতে হবে। নিজের অপরাধ তুমি কোনো প্রকারের ভণিতা ছাড়াই স্বীকার করেছে কিন্তু শাস্তির হাত থেকে তুমি বাঁচতে পারবে না… তোমার কর্মকাণ্ডের কারণে আমার যে সম্মানহানি হয়েছে তোমার মৃত্যুই কেবল পারে সেই কলঙ্কমোচন করতে। আরেকটা কথা, জল্লাদের কুঠারাঘাতে তুমি মৃত্যুর অভয় লাভ করবে না। তোমার অপরাধের সম্পূরক মাত্রায় তোমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। বোন আপনি কাছে এগিয়ে আসেন।
গাঢ় নীল রঙের শাড়ি পরিহিত অবস্থায় দরবারের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বেশর বণিকের স্ত্রী সীতাকে ইঙ্গিতে হুমায়ুন সামনে এগিয়ে আসতে বলে। হুমায়ুন আপন মনে ভাবে, চোখের সামনে অঙ্গচ্ছেদ দেখেও মেয়েটা একটুও বিচলিত হয়নি এবং এবার সে দেখবে সত্যিকারের রাজকীয় ন্যায়বিচার। মিরাক বেগের জন্য যে শাস্তির কথা সে ঘোষণা করতে যাচ্ছে সেটার ধারণা সে স্বপ্নে লাভ করেছে আর এর যথার্থতা তাঁকে প্রীত করেছে। সবার জন্যই একটা চমক অপেক্ষা করছে সিংহাসনের দুপাশে তাঁর আদেশ অনুযায়ী দরবারে উপস্থিত সব অমাত্যদের মতো লাল পোষাক পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা কাশিম বা বাইসানগারের সাথেও সে এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করেনি।
