খানজাদাকে রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বুঝতে পারে কতটা আঘাত সে তাঁকে করেছে, কিন্তু কিছু বিষয়ে তাঁকে সতর্ক করাটাও জরুরী ছিল। খানজাদাকে সে খুবই ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তিনি নন, সম্রাট হল সে আর তাই হুমায়ুন নিজে সিদ্ধান্ত নেবে কিভাবে সে রাজ্য পরিচালনা করবে।
তোমাকে সতর্ক করতে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। তুমি যদি মনস্থির করেই থাক যে আমার কোনো কথাই তুমি শুনবে না তাহলে আমার আর কিছু করার থাকে না… খানজাদার কণ্ঠস্বর নীচু আর সংযত কিন্তু হুমায়ুন ঠিকই লক্ষ্য করে তার কপালের পাশে একটা শিরা দপদপ করছে আর তার দেহটা থরথর করে কাঁপছে।
ফুপুজান… হুমায়ুন তাঁর বাহুমূল স্পর্শ করতে চেষ্টা করতে তিনি ঘুরে দাঁড়ান এবং দরজার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করেন আর নিজেই এক ধাক্কায় পাল্লা দুটো খুলে দেন। তার জন্য অপেক্ষারত নিজের দুই খাস পরিচারিকাকে ডেকে নিয়ে মশাল আলোকিত করিডোের দিয়ে দ্রুত নিজের কামরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। হুমায়ুন তাঁর গমনপথের দিকে নিরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। সে আগে কখনও খানজাদার সাথে কোনো কিছু নিয়ে তর্ক করেনি কিন্তু সে আজ তাঁকে যা বলেছে সেটা বলা প্রয়োজন ছিল, সে নিজেকে সেরকমই বোঝায়। তারকারাজি আর তাদের বয়ে আনা বার্তা কোনোমতেই উপেক্ষণীয় নয়। কোনো মানুষকে- এমনকি সে যদি সম্রাটের মতো ক্ষমতাধরও হয়- কোনোভাবেই অনন্ত বিশ্বের মাঝে তারকারাজির আপাতদৃষ্টিতে এই শেষ না হওয়া আবর্তনের সাথে তুলনা করা যায় না। সে যদি তাঁদের ইঙ্গিত অনুসরণ করে তবে তাঁর রাজত্ব অবশ্যই সমৃদ্ধি লাভ করবে।
আর গুলরুখের ব্যাপারে ফুপিজান যা বলেছেন…সেটাও ভুল। দরবারের আর দশজনের মতোই সেও অবশ্যই সম্রাটের নেক নজরে থাকতে চায়। তাকে তুষ্ট করে গুলরুখ হয়ত আশা করে যে সে নিজের সন্তানদের জন্য, তার সৎ-ভাই কামরান আর আসকারির জন্য সুযোগসুবিধা আর অনুগ্রহ নিশ্চিত করতে পারবে… কিন্তু এর বেশী কিছু না। গুলরুখের আফিম মিশ্রিত গাঢ় বর্ণের সুরা যা তাঁকে মননকে সমৃদ্ধকারী মার্গ দর্শনে সাহায্য করে সেটা তাঁকে দেয়া গুলরুখের উপহার এবং এই সুরা পান করা থেকে সে নিজেকে বিরত রাখতে চায় না, সে সেটা পারবেও না…বিশেষ করে এই সুরা যখন তাকে প্রতিনিয়ত অস্তিত্বের রহস্যময়তা পুরোপুরি আয়ত্ত করার কাছাকাছি নিয়ে চলেছে।
*
ঢাকের আওয়াজ করছে যে তাকে আসতে দাও। আজ শুক্রবার- আজি সেই দিন যেদিন আমি আমার সবচেয়ে দীনহীন প্রজার প্রতিও ন্যায়বিচার করতে প্রস্তুত। হুমায়ুন তাঁর উঁচু পৃষ্টদেশযুক্ত সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে হাসে। গত ছয়মাসের ভিতর আজই প্রথম সিংহাসনটাকে দর্শনার্থীদের সাথে সাক্ষাতের জন্য নির্ধারিত কক্ষের বাইরে এনে রাখা হয়েছে কারণ সম্রাটের কাছে সুবিচার প্রার্থনা করে অজ্ঞাত কেউ একজন মোষের চামড়া দিয়ে তৈরী অতিকায় ঢাকে বোল তুলেছে। শুরুতে শব্দটা মৃদু আর অনিয়মিত ছিল এবং এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল সেটাও বুঝি বন্ধ হয়েছে। হুমায়ুন তারপরে পুনরায় শব্দটা শুনতে পায়। ন্যায়বিচারের ঢাকে যেই বোল তুলে থাকুক মনে হচ্ছে এবার যেন সে একটু সাহসী হয়েছে। ঢাকের বোলের আওয়াজ জোরাল হয় এবং সেটা এবার দ্রুত লয়ে ধ্বনিত হয়। এই মুহূর্তটার মুখোমুখি তাকে হতে হবে সেটা সে আগেই জানতো ঠিক যেমন সে জানে- সময়ে তার অমাত্যবৃন্দ ঠিকই সে যেসব সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সেসব মেনে নেবে। এমনকি পোড় খাওয়া কাশিমও, যে এই মুহূর্তে তার সিংহাসনের পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে, স্বীকার করতে বাধ্য হবে সেই সঠিক ছিল।
নীল পাগড়ি পরিহিত তাঁর দেহরক্ষী দলের ছয়জন সদস্য দূর্গ প্রাঙ্গন থেকে বের হয়ে যেতে তাদের পায়ের শব্দে পাথুরে মেঝেতে প্রতিধ্বনি তুলে। তারা যখন ফিরে আসে তাদের সাথে লাল সিল্কের শাড়ি পরিহিত কপালে লাল তিলক দেয়া একজন অল্পবয়সী হিন্দু রমণীকে দেখা যায়। মেয়েটার মাথার লম্বা কালো চুল তার কাঁধের উপরে ঢেউয়ের মতো ভোলা পড়ে আছে এবং তার অভিব্যক্তির মধ্যে একাধারে উদ্বেগ আর দৃঢ়তা ফুটে আছে। প্রহরীর দল তাঁকে সিংহাসনের দশ ফিটের ভিতর নিয়ে আসতে সে হুমায়ুনের সামনে নিজেকে নতজানু করে।
উঠে দাঁড়ান। সম্রাট আপনার অনুরোধ শ্রবণে প্রস্তুত, কাশিম মন্দ্র কণ্ঠে বলে। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে আপনি অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবেন।
সিংহাসনে উপবিষ্ট হুমায়ুনের রত্নশোভিত, দীপ্তিময় অবয়বের দিকে মেয়েটা কেমন একটা অনিশ্চয়তা নিয়ে তাকিয়ে থাকে যেন তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছে না সে সম্রাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সুলতান, আমার নাম সিতা। আমি আগ্রার এক ব্যবসায়ীর স্ত্রী। আমার স্বামী লবঙ্গ, জাফরান আর দারুচিনির মতো মশলার একজন ব্যবসায়ী। এক সপ্তাহ পূর্বে তিনি দিল্লীর বাজার থেকে মশলা কিনে সেগুলো খচ্চরের একটা ছোট বহরের পিঠে চাপিয়ে আগ্রায় ফিরে আসছিলেন। দিল্লী থেকে দুদিনের দূরত্বে আমাদের পবিত্র হিন্দু শহর মধুরার কাছে তিনি আর তাঁর সঙ্গীসাথীরা ডাকাতের কবলে পড়েন যাঁরা তাঁদের বহন করে আনা সবকিছু লুট করে নেয়- এমনকি তাদের পরনের কাপড়ও তাঁরা খুলে নেয়। ডাকাতের দল খচ্চরের বহর নিয়ে রওয়ানা দেবে এমন সময় আপনার একদল সৈন্য সেখানে এসে উপস্থিত হয়। সৈন্যরা ডাকাতদের হত্যা করে ঠিকই কিন্তু আমার স্বামীকে তার মালপত্র ফিরিয়ে দেবার বদলে তারা আমার স্বামীকে উপহাস করে। তারা বলে যে তিনি ভেড়ার মতো ভয়ে ভ্যা ভ্যা করছিলেন আর তার সাথে সেরকমই আচরণ করা উচিত। ডাকাতদের বাধা দড়ি খুলে দিয়ে তাঁকে বাধ্য করে নগ্ন অবস্থায় এবং খালি পায়ে তপ্ত বালির উপর দিয়ে দৌড়াতে, ঘোড়ার পিঠে সওয়াড় হয়ে তাঁরা তাঁকে ধাওয়া করে এবং বিদ্রূপ করে আর তাঁদের বর্শার ডগা দিয়ে তাকে নির্মমভাবে খোঁচাতে থাকে। তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডে নিজেরাই হাঁপিয়ে উঠলে, রক্তাক্ত আর পরিশ্রান্ত অবস্থায় আমার স্বামীকে বালির উপরে ফেলে রেখে তারা চলে যায়। এবং যাবার সময় তারা মূল্যবান মশলা বোঝাই আমার স্বামীর সবগুলো খচ্চর তাদের সাথে করে নিয়ে যায়…।
