খানজাদার কণ্ঠস্বর মনে হয় যেন দূরে কোথায় থেকে ভেসে আসছে এবং সে যেন তার দিকে তাকিয়ে থাকায় তার আকৃতি হ্রাস পেতে শুরু করে, সে একটা খর্বকায় পুতুলে পরিণত হয় যে কিনা অনবরত নিজের হাত আন্দোলিত করছে আর মাথা নাড়ছে। পুরো ব্যাপারটাই একটা হাস্যরসাত্মক মাত্রা লাভ করে।
তুমি কি বিপদের ভিতরে আছো, আমি যখন সে বিষয়ে কথা বলছি তুমি হেসেই চলেছো… খানজাদা তার বাহু দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরলে, তার তীক্ষ্ণ নখ হুমায়ুনের বাহুর মাংসের গভীরে গেঁথে বসে, তাঁকে বাস্তবে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। আমার কথা তোমাকে শুনতেই হবে। কিছু বিষয় আছে যা নিয়ে কথা না বললেই চলছে না… যা কিনা সম্ভবত আমিই তোমাকে বলতে পারি… কিন্তু মনে রেখো তোমায় ভালোবাসি বলেই কথাগুলো আমি বলছি।
আপনি যা বলতে চান বলতে পারেন।
হুমায়ুন, তুমি আফিমে আসক্ত হয়ে বিভ্রান্তির মাঝে দিনযাপন করছে। একটা সময়ে যোদ্ধা হিসাবে, শাসক হিসাবে তোমার সুনাম ছিল। কিন্তু এখন একজন ভাবুক আর কল্পনাবিলাসী ছাড়া তোমাকে কি অন্য কিছু বলা যাবে? আমি কখনও চিন্তাও করিনি এই কথাগুলো আমি কখনও তোমায় বলবো…কিন্তু একজন শাসককে অবশ্যই দৃঢ়চেতা হতে হবে, তাকে অবশ্যই হতে হবে সিদ্ধান্তগ্রহণে সক্ষম। তাঁর প্রজারা সবসময়ে যেন জানে যে তার উপরে তারা নির্ভর করতে পারে। এসব তুমি জান। এসব বিষয়ে তুমি আর আমি অতীতে কতবার না আলোচনা করেছি। আজকাল কদাচিৎ তোমার সাথে আমার দেখা হয়… এবং আমি যখন দরবারের দিকে তাকাই সেখানে আমি কেবল আতঙ্কিত আর অনিশ্চিত অভিব্যক্তি দেখতে পাই, আর তোমার পিঠ পেছনে আড়ষ্ঠ হাসির শব্দে আমার কান বিদীর্ণ হয়। এমনকি যারা তোমায় একসময়ে ভালো করে চিনতো এবং দীর্ঘদিন বিশ্বস্ততার সাথে তোমায় আজ্ঞা পালন করছে- কাশিম আর বাবা ইয়াসভালো যেমন- তাঁদের কাছেও তুমি একজন আগন্তুকে পরিণত হয়েছে। তোমার বিবেচনাবোধের উপরে তারা আজকাল আর আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না। তোমার প্রতিক্রিয়া নিয়ে তাঁরা সন্দিহান তাদের আচরণে তুমি প্রসন্ন হবে না ক্রুদ্ধ হবে তাই নিয়ে তারা সবসময়ে সন্ত্রস্ত থাকে। কখনও ঘন্টার পর ঘন্টা তারা তোমার কাছ থেকে নিজেদের কর্তব্যকর্ম সম্বন্ধে সঙ্গতিপূর্ণ কোনো নির্দেশনা কিংবা মন্তব্য জানতে পারে না… এমনকি কখনও এমন পরিস্থিতি কয়েক দিনও বিরাজ করে…
খানজাদা পূর্বে কখনও তাঁর সাথে এভাবে কথা বলেনি এবং নিজের ভেতরে একটা বিরক্তি জমছে সে বুঝতে পারে। যদি আপনি কিংবা আমার অমাত্যরা আমার সিদ্ধান্তসমূহ এবং সাম্রাজ্য আমি যেভাবে শাসন করবে বলে মনস্থির করেছি। সেটা সম্বন্ধে বৈরী মনোভাব পোষণ করেন তাহলে বুঝতে হবে বিষয়টা আপনাদের কাছে বোধগম্য হয়নি। কিন্তু অচিরেই এমন একটা সময় আসবে যখন দেখবেন আমি আমাদের সবার মঙ্গলের জন্যই সবকিছু করেছি।
সময় এখন আর তোমার অনুকূলে নেই। তুমি যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করতে ব্যর্থ হও, তোমার অনুগত সেনাপতি আর অভিজাতদের মনোযোগ তখন তোমার সৎ-ভাইদের দিকে আকৃষ্ট হবে। বিশেষ করে আমি কামরানের কথা বলছি। হুমায়ুন, মাথা স্থির করে একবার ভেবে দেখো। সে বয়সে তোমার চেয়ে কয়েকমাসের ছোট এবং ইতিমধ্যে নিজের শাসনাধীন প্রদেশে একজন দক্ষ যোদ্ধা আর কঠোর শাসক হিসাবে সে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। তোমার মতোই তারও ধমনীতে বাবর আর সেইসাথে তৈমূরের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। তুমি জান সে উচ্চাকাঙ্খি- এতটাই উচ্চাকাঙ্খি যে তোমার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে একবার ষড়যন্ত্র করেছে। সে আবারও একই কাজ করবে না তোমার এমনটা ভাববার কোনো সুযোগ নেই। তোমার মনে কি একবারও প্রশ্ন জাগেনি কেন গুলরুখ নিজেকে তোমার সেবাদাসীতে পরিণত করেছে, কেন সে তার সেই পানীয় দিয়ে তোমায় সিক্ত করছে? দূর আকাশের নক্ষত্রের মাঝে নিহিত অপার রহস্যের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে নিজের চারপাশের লোকদের মনের গভীরে ডুব দিয়ে দেখাটাই…তাদের অভিসন্ধি সম্বন্ধে সজাগ থাকা একজন শাসকের পক্ষে শোভনীয়। কামরান আর আসকারির হয়ে তোমার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহের সাহস গুলরুখের কখনও হবে না…কতখানি ধুরন্ধর আর কুশলী হলে আফিমের নেশায় আসক্ত করে সে তোমাকে অধঃখাতে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করতে পারে। এবং তোমার ক্ষমতা যখন দুর্বল হবে এবং শীথিল হয়ে আসবে আর তোমার প্রজারা একদা যে শাসককে শ্রদ্ধা করতো তাঁকেই অবজ্ঞা জ্ঞানে তাচ্ছিল্য করতে শুরু করবে, তার কোনো সন্তানের কাছে তখন যদি তারা শরণ প্রার্থনা করে তখন কিন্তু বিষয়টাকে মোটেই অস্বাভাবিক মনে হবে না? উলুঘ বেগের পরিণতির কথা স্মরণে রেখো। তোমার মতোই- সে যখন তারকারাজি এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাঁরা তাঁকে কি সলুকসন্ধান দিতে পারে সেসব নিয়ে বেশী আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, তখন তারই এক ছেলে তাঁকে হত্যা করে এবং তাঁর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়।
ঈর্ষা আর ক্রোধে আচ্ছন্ন হয়ে আপনি কথা বলছেন। উৎসব বিষয়ে আমি আপনার ভাবনাগুলো গ্রহণ করে গণনার সাহায্যে আপনার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ছাপিয়ে তাদের উন্নত করেছি বলে আপনি বিষয়টা মেনে নিতে পারছেন না। আমি একদা আপনার উপর যেমন নির্ভরশীল ছিলাম তেমনটা আজ আর নই বলে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে এমন একজন মানুষে পরিণত হয়েছি বলে এবং কোনো স্ত্রীলোকের- আপনার, বা গুলরুখের কারও পরামর্শ তার প্রয়োজন নেই দেখে, আপনি বিরক্ত…আপনাদের সবারই…নিজ নিজ অবস্থান সম্বন্ধে সচেতন হওয়া উচিত।
