কাশিম, আপনি কি কিছু বলবেন?
সুলতান, আমি নিশ্চিত যে আপনাকে অসম্মান করাটা আসাফ বেগের অভিপ্রায় ছিল না…পুর্নবিবেচনার জন্য আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।
আসাফ বেগ, ভয়ে বিবর্ণ এবং তাঁর চওড়া ঠোঁটে হাসির লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না আর সচরাচর হাস্যোজ্জ্বল, চোখে মিনতি নিয়ে হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের মতো অসম্মান আসাফ বেগের সাথে সাথে তার গোত্রের জন্যও ভীষণ অপমানজনক বলে বিবেচিত হবে, হুমায়ুন সেটা ভালো করেই জানে। যুদ্ধক্ষেত্রে আসাফ বেগের সাহসিকতার কথা সে বিবেচনা করে। নিজের হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য সে ইতিমধ্যেই অনুতপ্ত।
কাশিম- বরাবরের মতোই, আপনি যথার্থই বলেছেন। আসাফ বেগ, আমি এবারের মতো আপনাকে মার্জনা করলাম। কিন্তু ভবিষ্যতে আর কখনও আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে যাবেন না তখন হয়ত আমি এতটা দয়ালু নাও হতে পারি। হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় নিজের উপদেষ্টাদের বিদায় নেবার ইঙ্গিত করতে তারা সবাই সচরাচরের চেয়ে যেন দ্রুতই তাঁর আদেশ পালন করে। হুমায়ুন যখন আবার বসে সে নিজেকে তখন থরথর তরে কাঁপতে দেখে। কার্পেটের আবেদন পুরোপুরি লুপ্ত হয়েছে। রাতও অনেক হয়েছে। বিশ্রামের জন্য বোধহয় তাঁর এখন নিজের আবাসনকক্ষে ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু সে নিজের কক্ষে যখন প্রবেশ করতে খানজাদাকে সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করতে দেখে বিস্মিত হয়।
ফুপুজান, কি ব্যাপার?
তোমার পরিচরদের বিদায় কর। আমি তোমার সাথে একা কিছু কথা বলতে চাই।
হুমায়ুন জওহর আর অন্যান্য পরিচরদের ইঙ্গিতে বাইরে যেতে বলে। দুই পাল্লার দরজা বন্ধ হয়েছে কি হয়নি খানজাদা শুরু করেন। ঝরোকার পেছন থেকে আজ উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনার সময়ে কি হয়েছে আমি সেটা প্রত্যক্ষ করেছি। হুমায়ুন…এমনটা ঘটা সম্ভব আমি কল্পনাও করতে পারি না…প্রথমে তুমি একজন মোহগ্রস্ত লোকের মতো আচরণ করলে এবং তারপরে বদ্ধ উন্মাদের মতো…
আমার উপদেষ্টারা সবসময়ে বুঝতে পারে না, আমি যা করছি সেটা যে মঙ্গলের জন্য কিন্তু আপনার সেটা বুঝতে পারা উচিত। একজন শাসকের কাছে নিজেকে জাহির করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা আপনার কাছেই আমি শিখেছি তুল্যমূল্য অনুষ্ঠান আয়োজনের পরামর্শ আপনিই দিয়েছিলেন এবং শাসনকার্যের সহায়ক হিসাবে কৃত্যানুষ্ঠানের ব্যবহারে আমাকে উৎসাহিত করেছেন…
কিন্তু সেজন্য যুক্তি বা মানবতাকে বিসর্জন দিতে বলিনি…
নক্ষত্রদের বরাভয় স্মরণে রেখে আমি নতুন পদ্ধতি আর রীতির পরিকল্পনা করেছি। শাসনকার্য এর ফলে সহজ হবে। আমার উপদেষ্টা আর পরামর্শদাতারা যদি আমার নির্দেশনা অনুসরণ করে তাহলে দরবার কক্ষে সময়ের বিরক্তিকর অপচয় হ্রাস পাবে, ভাগ্যেচক্রের অথৈই গভীরতায় আরও ব্যাপক অনুসন্ধানের জন্য আমাকে মুক্তি দেবে।
নক্ষত্রের নখরামি আপাতত বাদ দাও। তোমার সমস্ত মনকে তারা আচ্ছন্ন করে রেখেছে এবং তুমি বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছ। আমি তোমাকে আগেও সতর্ক করতে চেয়েছি কিন্তু তুমি আমার কথায় কর্ণপাত করেনি। এখন তোমাকে নিশ্চয়ই শুনতে হবে নতুবা যা কিছু অর্জনের জন্য তুমি বিচেষ্টিত হয়েছে সেসব কিছু তোমার হাতছাড়া হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে- তোমার আব্বাজানের অর্জিত সবকিছু… হুমায়ুন আমার কথা কি আদৌ তোমার কানে যাচ্ছে?
হ্যাঁ, আমি শুনছি। কিন্তু সে মনে মনে ভাবে, খানজাদা ভুল করছে…তাকে দীর্ঘদিন ধরে একাধারে কষ্ট দিয়েছে আবার আকর্ষণ করেছে অন্য যেসব প্রশ্নগুলো তাদের উত্তর সে কেবল গ্রহ আর নক্ষত্রের বিন্যাসের মাঝে খুঁজে পেতে পারে। নিয়তির দ্বারা আসলেই কি সবকিছু কোনোভাবে পূর্ববিহিত করা? তার আব্বাজানের অকালমৃত্যু কি আসলে আরেকটা বিশাল পরিকল্পনার একটা অংশ? একটা মানুষের নিয়তির কতটুকু তার নিজের হাতে থাকে? নিয়তির কতটুকু পূর্বনির্ধারিত যেমন অবস্থান বা পরিবার যেখানে সে জন্মগ্রহণ করেছে এবং এর সাথে প্রাপ্ত সুবিধা আর দায়িত্বসমূহ? এবং সে এসব কিভাবে জানতে পারবে…? একজন বৃদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষু হুমায়ুনের যৌবনে যার সাথে তার দেখা হয়েছিল- কাবুল থেকে প্রায় একশ মাইল পশ্চিমে বামিয়ানের উপত্যকায় পাহাড়ে খোদাই করা বিশাল এক বৌদ্ধ মূর্তির পাশে সেই ভিক্ষুর নির্জন আশ্রয়ে, তিনি তাঁকে বলেছিলেন যে তার জন্মের সময়, স্থান এবং তারিখ নির্ভুল আর ঠিক কাঁটায় কাঁটায় বলতে পারলে তিনি হুমায়ুনের জীবনের পরিণতি কেবল না সেইসাথে পরবর্তী জীবনে কোনো প্রাণী হিসাবে তাঁর পুনর্জন্ম হবে সবকিছু আগাম বলতে পারবেন। তাঁর কাছে পুনর্জন্মের ধারণাটা অবান্তর মনে হয়েছে কিন্তু সেই ভিক্ষুর বাকি কথাগুলো তাকে ভাবিত করে তুলে। সে ইতিমধ্যে একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে- যে রাশিচক্র আর গ্রহ, নক্ষত্রের অবস্থান, সারণি এবং বহুকাল পূর্বের ঘটনাবলীর লিপিবদ্ধ ভাষ্য যার অধ্যয়নে সে প্রচুর সময় ব্যয় করেছে এবং তাঁর আফিম-উদ্বুদ্ধ স্বপ্নে তাঁর কাছে জীবন্ত বলে প্রতিয়মান স্বপ্নগুলো দ্বারা সে জীবন যাপন আর শাসনকার্যের একটা কাঠামো সৃষ্টি করতে পারবে এবং ইতিমধ্যে সেই কাজে অনেকদূর অগ্রসরও হয়েছে।
হুমায়ুন! তুমি কি আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে?
