আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনার কথাগুলো আমি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবো।
*
হুমায়ুনের সিংহাসনের সামনে পরিচরেরা আকাশের মতো দেখতে রেশমী নীল রঙের একটা বিশালাকৃতি বৃত্তাকার কার্পেট বিছান শুরু করতে সে চোখেমুখে সন্তুষ্টি নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। কার্পেটের জমিনে অনেকগুলো বৃত্তের একটা পর্যায়ক্রমের রূপরেখা- লাল, হলুদ, বেগুনী আর সবুজ রঙের শিকল ফোড়ের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং গ্রহমণ্ডলী উপস্থাপনকারী বৃত্তগুলো- সে যেভাবে আদেশ দিয়েছিল ঠিক সেভাবেই স্থাপন করা হয়েছে। তাঁতিদের সে পুরস্কৃত করবে তাঁদের এই অসামান্য দক্ষতা এবং যত দ্রুত তারা তার এই পরিষদমণ্ডলীর কার্পেটকে বাস্তবতা দান করেছে।
কয়েকমাস আগে বিশেষভাবে প্রাণবন্ত একটা স্বপ্নবেশের সময় সে প্রথম ধারণাটা লাভ করে- গুলরুখের আফিম আর সুরার মিশ্রণ পান করার পরে বাস্তবিকই তাঁর মাদকজনিত ঘুম প্রতিবারই যেন আরও বেশী চমকপ্রদ আর গুপ্ত তথ্যের বিস্ময়কর প্রকাশ হয়ে উঠছে। তারকাণ্ডলীর একটা যেন বিশেষভাবে তাকে কিছু বলতে চায়, এমন একটা কার্পেট তৈরী করতে বলে যার ফলে তাকে পরামর্শ দেবার কালে তার উপদেষ্টারা যে বিষয়ে সেই বিশেষ মুহূর্তে আলোচনা করছে সেই বিষয়ের সবচেয়ে নিয়ামক গ্রহের উপরে অবস্থান করতে পারে। সে কার্পেট তৈরীর বিষয়টা সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিল, দিনরাত চব্বিশ ঘন্টাই যেন তাঁতিরা কার্পেটের বয়ন অব্যাহত রাখে সেটা সে নিশ্চিত করেছিল। শারাফ ব্যতীত আর কেউ এই কার্পেট বয়নের কথা জানতো না- না বায়সানগার, না কাশিম এমনকি খানজাদাকেও সে কিছু জানায়নি। তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর সবার মতো, তাঁদের কাছেও ব্যাপারটা একটা চমক হিসাবে থাকুক, তাঁর সাথে যোগ দেবার জন্য তিনজনকেই এখন এখানে আসতে বলেছে সে।
উপদেষ্টাবৃন্দ দ্রুতই এসে উপস্থিত হয়। দিনটা আজকে বুধবার বিধায় হুমায়ুনের মতো তাঁদেরও পরণে উজ্জ্বল বেগুনী রঙের আলখাল্লা এবং কোমরে কমলা রঙের পরিকর। হুমায়ুন সামনে বিস্তৃত হাল্কা নীলের ঝকঝকে বৃত্তের দিকে সবাইকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসে। বাবা ইয়াসভালো নিজের বিভ্রান্তি লুকিয়ে রাখার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না।
এই বিস্ময়কর কার্পেটটা সম্বন্ধে আপনাদের তারিফ শোনার জন্য এখানে আসতে বলেছি। আমাদের মাথার উপরের চিরচেনা আসমানের একটা প্রতিকৃতি এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই বৃত্তগুলো একেকটা গ্রহকে উপস্থাপন করছে এই যে এখানে রয়েছে, মঙ্গল, বুধ আর বৃহস্পতি আর ওখানে দেখছেন আমাদের সবার পরিচিত চাঁদকে। আপনাদের কারও যদি আমাকে কিছু বলার থাকে তাহলে আপনাকে অবশ্যই উপযুক্ত বৃত্তের উপরে দাঁড়িয়ে সেটা উপস্থাপন করতে হবে। কেউ যদি আমার সাথে সামরিক বিষয়ে কিছু আলাপ করতে চায় তাকে অবশ্যই সেটা মঙ্গলের উপরে দাঁড়িয়ে বলতে হবে। যার ফলে আপনারা গ্রহমণ্ডলীকে সাহায্য করবেন আপনাদের পরিচালিত…
হুমায়ুন নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে কিন্তু সহসা কোনো উপদেষ্টার মুখ আলাদা করে চিনতে পারে না- ভাবনায় কটি করা ললাট নিয়ে কে ওখানে দাঁড়িয়ে, কাশিম? …সে নিশ্চিত হতে পারে না…তার চারপাশের সবকিছুই যেন কেমন অস্পষ্ট। নিবিষ্টভাবে নক্ষত্রদের অবলোকনের জন্য রাতের বেলা আগ্রা দূর্গের প্রাকারবেষ্টিত ছাদে উঠে একাগ্র দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিংবা দীর্ঘক্ষণ নক্ষত্রদের সারণি পর্যালোচনা করার কারণে হয়ত ক্লান্তি এসে তার চোখের দৃষ্টি এমন ঝাপসা করে তুলেছে।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যায়। হ্যাঁ, কাশিমই তার দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে এবং বাবা ইয়াসভালের চোখে মুখে, সম্ভবত কার্পেটের প্রতীকীত্বের ক্ষমতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে, অথৈ জলে পড়া সাঁতার না জানা লোকের দৃষ্টি। কিন্তু ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা আসাফ বেগ কি ভাবছে? হুমায়ুনের কার্পেট খুটিয়ে দেখার সময় তার চেহারায় যেন একটা হাসির ভাব ফুটে উঠে- ঠোঁটের কোণে অবজ্ঞার ফণা। হুমায়ুনের দিকে সরাসরি তাকাবার জন্য সে যখন মাথা উঁচু করে তার অভিব্যক্তিতে তখন যেন ব্যঙ্গ-পরিহাসের চেয়েও ভিন্ন কিছু একটা ফুটে উঠে। হুমায়ুনের মাঝে দাবানলের মতো ক্রোধের একটা ঝাপটা বয়ে যায়। কাবুলের এই আকাঁ মূর্খ ছিঁচকে গোত্রপতির এভোবড় স্পর্ধা নিজের সম্রাটকে উপহাস করে?
এই যে আপনি! হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং ক্রোধে কাঁপতে থাকা আঙ্গুল তুলে আসাফ বেগকে নির্দেশ করে। আপনার এতখানি ধৃষ্টতা, ঠিক আছে আপনার এই অবজ্ঞার উপযুক্ত পুরষ্কারই আপনি পাবেন। প্রহরী- এই উজবুকটাকে বাইরের প্রাঙ্গণে নিয়ে গিয়ে পঞ্চাশ ঘা দোররা লাগাও। আসাফ বেগ নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবেন এই জন্য যে মাথার বদলে আজ কেবল আপনার নিতম্বের চামড়াই খোয়ালেন।
একটা সম্মিলিত শ্বাস নেবার শব্দের সাথে সাথে দরবারের ভিতরে কবরের স্তব্ধতা নেমে আসে। তারপরে একটা কণ্ঠস্বর শোনা যায়। সুলতান…
সমালোচনা কিংবা মতানৈক্য কোনটাই সহ্য করবে না বলে স্থির প্রতিজ্ঞ হয়ে, ক্রুদ্ধ বাঘের ঝাঁপট নিয়ে হুমায়ুন ঘুরে তাকায় কিন্তু দেখে সেটা কাশিমের কণ্ঠস্বর। তার এবং আব্বাজানের অধীনে যে লোকটা দায়িত্বের সাথে কর্তব্যরত ছিল, এবং যাকে সে বিশ্বাস করে, সেই লোকটার চেহারায় সত্যিকারের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ফুটে উঠতে দেখে, তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হতে শুরু করে। একই সাথে সে অনুভব করে তার শ্বাসপ্রশ্বাস অনিয়মিত, নাড়ীর স্পন্দনে ঘোড়ার খুরের বোল আর কপালে স্বেদবিন্দুর সৃষ্টি হয়েছে।
