শারাফ ব্যতীত নিজের দর্শনাথী কক্ষ থেকে যখন সবাই বিদায় নেয় তখন হুমায়ুন পুনরায় উলুঘ বেগের নক্ষত্রের সারণি পরীক্ষা করে, সময়ের সব বোধ তাঁর লুপ্ত হয়। প্রথম ঘন্টা শেষ হতে পরবর্তী ঘন্টা তার ক্ষণ গণনা শুরু করে। সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে, আগ্রা দূর্গের দিকে বেগুনী ছায়া গুটিসুটি পায়ে এগিয়ে আসতে থাকলে, তখনি কেবল হুমায়ুন সারণির পাতা থেকে মুখ তুলে তাকায়। সে যখন তার আবাসনকক্ষের দিকে ফিরে আসছে তখন আফিমের নির্যাস সিক্ত সেই ঘন সুরার জন্য তার ভিতরে একটা আকুল আকাঙ্খার জন্ম হয় যা তাঁর আত্মাকে বন্ধনমুক্ত করে তাঁর মাঝে পুনরায় উত্থিত করে এবং নিজের অজান্তেই তাঁর হাঁটার গতি দ্রুত হয়ে উঠে।
*
কাশিম, আমি বুঝতেই পারিনি এত সময় অতিবাহিত হয়েছে, হুমায়ুন নিজের চোখ কচলায় এবং যেখানে ছিল সেখান থেকে সটান উঠে দাঁড়ায় আর সেখান থেকে বেগুনী-রেশমী কাপড়ে-আবৃত ডিভানে সে তাসের ঘরের মতো ভেঙেচুরে শুয়ে পড়ে। ডিভানটায় একটা পরস্পরচ্ছেদী নক্ষত্ররাজির জটিল নক্সা সোনার জরি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং হুমায়ুন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এটার উপরে শুয়ে অনেক গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে। পরিষদমণ্ডলী কি এখনও সমবেত রয়েছে? বাংলায় আমার মনোনীত রাজ্যপালের কাছ থেকে আগত প্রতিনিধির কি সংবাদ?
অনেকক্ষণ আগেই পরিষদমণ্ডলীর সভা শেষ হয়েছে। আর আপনার প্রতিনিধির খবর বলতে ইতিমধ্যে বহুবার তার সাথে সাক্ষাঙ্কার বাতিল করেছেন কারণ আপনি মনে করেন এ ধরনের আলোচনার জন্য বর্তমান সময়টা ঠিক উপযুক্ত না এবং একবার- সুলতান, এটা উল্লেখ করার জন্য আমায় মার্জনা করবেন- যখন আপনার উপস্থিতিতে দর্শনার্থী কক্ষে ভুল দরজা দিয়ে প্রবেশ করায় নিজের উপস্থিতিতে দর্শনার্থী কক্ষ থেকে তাঁকে বিবাসিত করেছিলেন, সেই দিনটাও এমন প্রকৃতির আলোচনার জন্য খুব একটা মঙ্গলময় নয় বলে আপনার ধারণা। গঙ্গা আর যমুনার বুক চিরে বাংলায় যাবার সময়টা ক্রমেই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে এবং আরও অপেক্ষা করাটা তার জন্য ক্রমেই কষ্টকর হয়ে উঠছে। বাইসানগার আর আমি তাই আপনার পক্ষ অবলম্বনপূর্বক নির্দেশনা প্রদানের গুরু দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে কর আরোপের মাত্রা এবং সৈন্য সংখ্যা কতটা বৃদ্ধি করতে হবে সেটা নির্ধারন করেছি। নিজের নৌকায় আরোহন করে সে ফিরতি পথে রওয়ানা হতে দুই ঘন্টা আগে তারা নোঙর তুলেছে।
এই দুই বৃদ্ধ তাঁর কর্তৃত্বের মাঝে অন্যায়ভাবে নাক গলিয়েছে ধরে নিয়ে হুমায়ুন ক্ষনিকের জন্য ক্রুদ্ধ হয়।
সুলতান, আমরা যা বলেছি আপনি যদি তার সাথে ভিন্ন মতো পোষন করেন তাহলে অবশ্যই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য আরেকটা দ্রুতগামী নৌকা পাঠাতে পারি।
কাশিম নিশ্চিতভাবেই তাঁর বিরক্তি আঁচ করতে পেরেছে, হুমায়ুন ভাবে। তারই অন্যায় হয়েছে। বার্তাবহ কূটনীতিক লোকটা একাধারে বাঁচাল এবং সেই সাথে বিরক্তিকর। সে ইচ্ছাকৃতভাবেই লোকটার সাথে দেখা করতে দেরী করেছে, কখনও এমনসব অজুহাত দেখিয়েছে যা তার নিজের কাছেই অনেকসময় অকিঞ্চিৎকর বলে মনে হত। হুমায়ুন তাঁর কণ্ঠস্বরের তীব্রতা হ্রাস করে। কাশিম, আমি নিশ্চিত যে আগামীকাল সকালে আমি যখন শুনবো আপনি আর বাইসানগার কি উপদেশ দিয়েছেন সেটা আমার পছন্দই হবে। এখন আপনি যান, আমি আরেকটু বিশ্রাম আর নিরুদ্বিগ্নভাবে সময় কাটাতে চাই।
কাশিমকে দেখে মনে হয় সে আরও কিছু বলতে চায়, সে দাঁড়িয়ে থেকে কেবল দুই পায়ের উপরে দেহের ভার পরিবর্তন করে আর বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে নিজের আলখাল্লার একটা সোনালী টাসেল নিয়ে আপনমনে নাড়াচাড়া করে। তারপরে সে নিজের মন ঠিক করে এবং যা বলতে চেয়েছিল সেটা বলতে শুরু করে। সুলতান, আপনি বোধহয় অবগত আছেন যে আপনার মরহুম আব্বাজান আর আপনার অধীনে কত দীর্ঘ সময় আমি বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্বপালন করছি।
হ্যাঁ, আর আমি সেটার প্রশংসাও করি।
আমি কি তাহলে আমার এতো বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে আপনাকে সামান্য কিছু পরামর্শ দিতে পারি? সুলতান মার্জনা করবেন কিন্তু আমি না বলে পারছি না, আপনি আফিমে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। আপনার আব্বাজানও সুরা আর ভাঙ- গাঁজার মতোই আফিমটাও উপভোগ করতেন।
তবে?
আমাদের ভিতরে অনেকেই এসব নেশাজাতীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে বেশী সহজাত সহ্যক্ষমতার অধিকারী হয়। এমনকি আমার যখন বয়স অল্প ছিল, ভাঙের কারণে কখনও এমনও হয়েছে যে পরপর বেশ কয়েকদিন আমি সব কাজ ফেলে নির্জীবের মতো পড়ে রয়েছি তাই আপনার আব্বাজানের শত অনুরোধ সত্ত্বেও এধরনের উপাচার গ্রহণ করা থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিরত রাখি। মহামান্য সুলতান আপনি যতটা অনুমান করছেন এগুলো সম্ভবত তারচেয়েও বেশী আপনাকে প্রভাবিত করছে।
না, কাশিম। তাঁরা আমাকে চিন্তা করতে আর দেহমনকে প্রশমিত করতে সাহায্য করে। আপনি কি আমাকে এটাই বলতে চেয়েছিলেন?
হ্যাঁ, কিন্তু অনুগ্রহ করে কেবল একটা কথা মনে রাখবেন যে এমনকি আপনার আব্বাজানও প্রতিদিন এই জিনিষটাকে প্রশ্রয় দিতেন না, বিশেষ করে যখন তাঁকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। কাশিম মাথা নত করে চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালে, হুমায়ুন তাঁর বলিরেখা পূর্ণ মুখমণ্ডলে গভীর দুশ্চিন্তার একটা অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে। তার উৎকণ্ঠায় কোনো খাদ নেই। আত্মবিলোপী, স্বল্পভাষী এই বৃদ্ধ লোকটাকে এই অল্প কয়টা কথা বলতে গিয়ে প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছে। হুমায়ুন তার উপরে রাগ করতে পারে না।
