তার উপদেষ্টাদের অভিব্যক্তির দ্বারা হুমায়ুন বুঝতে পারে সে কি বিষয়ে কথা বলছে সে সম্বন্ধে এখনও তাদের কোনো ধারণা নেই। কিন্তু তাঁরা তাহলে কিভাবে এটা পারবে? সে যা অবলোকন করেছে তারা সেসব কিছুই দেখেনি যখন গুলরুখের উপাচারের কল্যাণে মুক্তি লাভ করে। তারা কল্পনাও করতে পারবে না সে মানসপটে এমনসব কল্পলোকে সে ভ্রমণ করে এসেছে। কিন্তু সে তার শাসনপদ্ধতিতে যে ব্যাপক উন্নতিসাধনের পরিকল্পনা করেছে তারা সে বিষয়ে অচিরেই জানতে পারবে।
আমি অনুধাবন করতে পেরেছি যে আমরা গ্রহমণ্ডলী আর নক্ষত্র থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি। সর্বশক্তিমান আল্লাহতালার অধীনে তারা আমাদের পরিচালনা করে, কিন্তু একজন ভালো শিক্ষকের ন্যায় আমাদের অনেক কিছু শেখাতেও পারে। আগামীতে আমি কেবল সেদিনের জন্য আদিষ্ট নক্ষত্র যেসব বিষয়কে মঙ্গলময় বলে বিবেচনা করবে কেবল সুনির্দিষ্ট সেসব বিষয় আমি বিবেচনা করবো… এবং সে অনুযায়ী মানানসই পোষাক পরিধান করবো। নক্ষত্ররাজি আমাদের বলছে যে আজকের দিনটাকে, মানে রবিবারকে পরিচালনা করছে সূর্য যাঁর সোনালী রশ্মি সার্বভৌম ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। সেজন্য এখন থেকে রবিবার, উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের কাপড়ে সজ্জিত হয়ে আমি রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের বিহিত করবো। সোমবার-চন্দ্র এবং প্রশান্তির জন্য নির্দিষ্ট দিন- সেদিন অবসর সময় কাটাব এবং সবুজ রঙের পোষাক পরিধান করবো যা প্রশান্ত অভিব্যক্তির রঙ। মঙ্গলবার এই দিনটা সৈন্যদের পৃষ্টপোষক, মঙ্গলগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট- সেদিন যুদ্ধ আর ন্যায়বিচারের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদির নিষ্পত্তিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখবো। সেদিন আমি মঙ্গলের জন্য নির্দিষ্ট লাল পোষাক পরিধান করবো, প্রতিশোধ আর ক্রোধের রঙ এবং বজ্রপাতের দ্রুততায় একই সাথে শাস্তি আর পুরষ্কার বন্টনে পারদর্শী। পুরস্কৃত করার জন্য কোষাগারের সম্পদ প্রস্তুত রাখা হবে এমন কারো জন্য যাকে উপযুক্ত মনে করবো, একই সাথে রক্ত লাল পাগড়ি মাথায় প্রহরীর দল কুঠার হাতে বর্ম পরিহিত অবস্থায় আমার সিংহাসনের সামনে প্রস্তুত থাকবে সাথে সাথে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে…
শনিবার- শনি গ্রহের জন্য আদিষ্ট দিন- এবং বৃহস্পতিবার বৃহস্পতি গ্রহের দিন-শিক্ষা আর ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি দিনটাকে উৎসর্গ করতে এবং বুধবার- বুধ গ্রহের দিনটা হবে আনন্দোচ্ছল যখন আমরা বেগুনী রঙের পোষাক পরিধানের ব্যাপারটা আসলে ঠিক কি? যেকোনো পুরুষ আর মহিলা ওয়ার্নার ব্রাদার্সের কাছে উপস্থিত হলে, তার বোনের পরণে আজকে বেগুনী বর্ণের পোক। এবং শুক্রবার নীল পোষাকে সজ্জিত হবো, অনেকটা সবকিছুকে আকর্ষণকারী নীল আকাশের মতো, এদিন আমি যেকোনো বিষয়ের বিহিত করতে পারি। যেকোনো নারী কিংবা পুরুষ- তারা কতটা দরিদ্র কিংবা বিনয়ী সেটা বিবেচ্য না আমার কাছে আসতেই পারে…তাদের যা করতে হবে সেটা হল ন্যায়বিচারের দামামাটাকে তাঁদের পরাস্ত করতে হবে আমি সেটাকে দরবার কক্ষের বাইরে স্থাপণের আদেশ দিয়েছি।
হুমায়ুন আরো একবার কথা বন্ধ রাখে। কাশিমকে, যে তাঁর খতিয়ান বইয়ে হুমায়ুনের ঘোষণা লিপিবদ্ধ করছিলো, দেখে মনে হয় সে যেন বাক্যের মাঝখানে থমকে গিয়েছে আর বাইসানগার তার বাম হাতের আঙ্গুল দিয়ে বহু বছর আগে তার কর্তিত ডান হাতের জায়গায় স্থাপিত ধাতব আকর্ষী টানছে। অবশিষ্ট উপদেষ্টারা তার ঘোষণা শুনে চোখেমুখে বিস্ময় এঁকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু তারা একটা সময় তার অন্তৰ্জনকে ঠিকই গ্রহণ করবে। নক্ষত্ররাজি আর গ্রহমণ্ডলীর যান্ত্রিক গতিবিধির মাঝে সবকিছু যথাযথভাবে তাঁদের আদিষ্ট স্থানে রয়েছে। এবং একটা বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ঠিক এমনই হওয়া উচিত। সবকিছু যথোপযুক্ত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে এবং যথাযথ সময়ে…
দুই কি এক মিনিট বিরতির পরে হুমায়ুন ধীরে ধীরে বলতে থাকে, তার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট আর আনুষ্ঠানিক। আমি আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমার সরকারের বিভিন্ন দপ্তর আমি পুনর্গঠিত করবো চারটা প্রধান উপাদানের কোনটা- অগ্নি, বায়ু, জল এবং মৃত্তিকা- তাঁদের উপরে আধিপত্য করে। আমার সেনাবাহিনীর জন্য জবাবদিহি করবে অগ্নির আধিপত্য বিশিষ্ট দপ্তর। বায়ুর আধিপত্যযুক্ত দপ্তর জবাবদিহি করবে রন্ধনশালা, অশ্বশালা আর পোশাকভাণ্ডারের। জলের আধিপত্যবিশিষ্ট দপ্তর আমার সাম্রাজ্যের সব নদী আর জলাশয়ের সবকিছুর জন্য জবাবদিহি করবে, সেচের ব্যবস্থা আর রাজকীয় মদ্য-ভাণ্ডারের দায়িত্ব এই দপ্তরের উপরে অর্পিত হবে। আর মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যযুক্ত দপ্তর কৃষিকাজ আর ভূমি প্রদান বা মঞ্জুরির দায়িত্ব পালন করবে। আর সব সিদ্ধান্ত, কর্মোদ্যোগ রাশিফলের গণনার নির্দেশনার সাথে সঙ্গতি রেখে গৃহীত হবে কেবল একটা বিষয় নিশ্চিত করতে যে সবচেয়ে মাঙ্গলিক উপায় অনুসৃত হয়েছে…।
আর তোমরা আমার উপদেষ্টা আর অমাত্যবৃন্দ-এই নতুন কাঠামোর ভিতরে তোমাদের সবার সুনির্দিষ্ট স্থান থাকবে। রাশিফল পর্যালোচনা করলে আমরা জানতে পারি যে মানুষকে সাধারণত তিনটা শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। আমার অভিজাত ব্যক্তি, আধিকারিক আর সেনাপতি, তোমরা সবাই সরকারের মন্ত্রীবর্গ। কিন্তু সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি আর কল্যাণের জন্য অন্য শ্রেণী দুটো গুরুত্বপূর্ণ- মহানুভব মানুষের কাফেলা, যাদের ভিতরে রয়েছে আমাদের ধর্মীয় নেতা, দার্শনিক, জ্যোতিষী আর বিনোদনের কর্তাব্যক্তিরা যাদের ভিতরে আছে কবি, গায়ক, জাদুকর, চারু আর কারুশিল্পী- যারা আমাদের জীবনকে সুন্দর আর সমৃদ্ধ করে ঠিক যেমন করে তারকারাজি আকাশকে সাজিয়ে তুলে। এই তিনটা শ্রেণীর প্রতিটাকে বারোটা স্তরে বিভক্ত করা হবে আর প্রতিটা স্তরে আবার তিনটা করে পদমর্যাদা থাকবে- উচ্চ, মধ্য আর নিম্ন। আমি যথা সময়ে তোমাদের সবাইকে জানিয়ে দেব কোনো শ্ৰেণী আর পদমর্যাদা তোমাদের জন্য ধার্য করেছি…তোমরা এবার যেতে পার। আমার এখনও অনেককিছু চিন্তা করা বাকি।
