নিজের দেহ থেকে মুক্তি পেয়ে, হুমায়ুন ধূমকেতুর মতো ভাসমান অবস্থায় নিজেকে অনুভব করে। সে নীচে যমুনার বুক চিরে বয়ে যাওয়া পানির গাঢ় স্রোত চিনতে পারে যেমন চিনতে পারে আগ্রা দূর্গের প্রকারবেষ্টিত সমতল ছাদে গুলরুখের সুরা ভর্তি পাত্রটা। সবদিক ছাপিয়ে হিন্দুস্তানের আপাত সীমাহীন সমভূমি প্রসারিত, উষ্ণ তমিস্র বিদীর্ণ হয়, কখনও এখানে, কখনও সেখানে, তাঁর নতুন প্রজাদের গ্রামের জ্বলন্ত ঘুঁটের আগুনের দ্বারা জোনাকির মতো। তাদের মাটির তৈরী বাড়ির বাইরে বটবৃক্ষ আর বাবলা গাছের নীচে নিজেদের মামুলি বিছানায় তারা টানটান হয়ে শুয়ে আছে, তাঁরা সেইসব মানুষদের স্বপ্নে দেখছে যাদের জীবন ঋতুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, কখন বীজ বপন করতে হবে আর কখন শস্য কাটতে হবে এবং যাঁদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা নিজেদের ষাড়ের স্বাস্থ্যসম্পর্কিত এবং তাদের দিয়ে কিভাবে জমি চাষ করবে।
তাঁর আত্মা উড়ে যখন সামনের দিকে এগিয়ে যায়, হুমায়ুন সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করে। কমলা রঙের একটা আলোর কুণ্ডু পৃথিবীর কিনারার উপর দিয়ে ক্ষরিত হয়ে উষ্ণতা আর নবায়ন বয়ে আনছে। এবং এখন ধুসর কমলা আভায় তার নীচে সে কি দেখতে পাচ্ছে?–মহান দিল্লী শহরের প্রাসাদসারি, মিনারসমূহ, এবং অতিকায় সব রাজকীয় সমাধিসৌধ, একদা যা লোদি সুলতানদের রাজধানী ছিল কিন্তু মোগলদের দ্বারা অবজ্ঞাত। হুমায়ুনের অবারিত আত্মা এখনও, হিন্দুস্তানের গরম আর ধূলো পেছনে ফেলে, ভেসে চলে। সে নীচে এখন সিন্ধুর নদের শীতল পানি দেখতে পায়। ওপারে হাড়ের মতো শক্ত আর রঙ জ্বলে যাওয়া সব পাহাড়ের সারি আর কাবুলের দিকে এগিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা গিরিপথ এবং সেটা এরপরে হিন্দু কুশের শক্ত, হীরক উজ্জ্বল চূড়ার দিকে এগিয়ে গিয়েছে, মোগলদের পিতৃপুরুষের স্বদেশ মধ্য এশিয়ার সমভূমির প্রবেশদ্বার। তারা কতদূর ভ্রমণ করে এসেছে। কি গৌরব তারা লাভ করেছে। এবং এখনও কি বিস্ময় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে…এই সমস্ত অন্তদৃষ্টির সাহায্যে নতুন কি উচ্চতায় তারা আরোহন করতে পারে? শূন্যে হুমায়ুনের তখনও ভাসমান আত্মার উপরে আকাশ তরল সোনার মতো দীপ্তি ছড়িয়ে সমগ্র পৃথিবীকে আলিঙ্গন করে।
১.৫ ভাগ্যের পরিহাস
০৫. ভাগ্যের পরিহাস
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেভাবে শাসন করি সেটা পাল্টে ফেলবো। আমি যেমনটা আশা করি রাজ দরবার মোটেই সেরকম নয়।
হুমায়ুনের সোনার গিল্টি শোভিত সিংহাসনের সামনে অর্ধবৃত্তাকারে আসন-পিঁড়ি হয়ে উপবিষ্ট উপদেষ্টারা, চোখে বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাই দেখে বাইসানগার আর কাশিম, তাঁর প্রতি পুনরায় মনোযোগী হবার পূর্বে, পরস্পরের দিকে বিমূঢ় ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে। যাই হোক না কেন তারা অচিরেই চমকপ্রদ ধারণাগুলো বুঝতে পারবে যা তার আফিম-ক্রিয়ায় স্বপ্নে সে লাভ করেছে যখন, শাসনকার্যের প্রাত্যহিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত, তাঁর ভাবনাগুলো তখন যেন স্ফটিক স্বচ্ছতায় প্রবাহিত হয়। সে স্বপ্নে যা কিছু দেখেছে- সবই যেন গ্রহ, নক্ষত্রের গতিপথে লিপিবদ্ধ রয়েছে…
হুমায়ুন তার ডান হাত উত্তোলিত করে এবং তাঁর ব্যক্তিগত জ্যোতিষী সারাফ, কৃশকায়, বয়স্ক আর পাখির চঞ্চুর ন্যায় নাকের অধিকারী একটা লোক যার পরনে বাদামী রঙের বাদামী বর্ণের একটা ঢাউস আলখাল্লা, চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা একটা ভারী ঢাউস খণ্ড শিরাবহুল চওড়া হাতে ধরে সামনে এগিয়ে আসে। ঘোঁতঘোঁত শব্দে স্বস্তি প্রকাশ করে, গ্রহমণ্ডলীর প্রতিকৃতি খচিত সাদা মার্বেলের টেবিলে ঢাউস খণ্ডটা সে নামিয়ে রাখে, হুমায়ুন তাঁর সোনার গিল্টি শোভিত সিংহাসনের যা যা স্থাপন করতে বলেছে।
হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং পাতা উল্টাতে থাকে যতক্ষণ না সে যা খুঁজছিলো সেটা খুঁজে পায়। সেখানে তাঁর পূর্বপুরুষ, মহান জ্যোতিষবিদ উলুঘ বেগের হাতে তৈমূরের পৌত্র- একটা ছক যেখানে মহাকাশে গ্রহমণ্ডলী আর নক্ষত্রের গতিপথ অঙ্কিত রয়েছে। জটিল এই নক্সাটার দিকে যখন তাকিয়ে থাকে সে, তখন দিব্য অনুষঙ্গগুলো যেন নড়তে আরম্ভ করে রাষ্ট্রীয় সফরের আঙ্গিকে, প্রথমে ধীরে কিন্তু যখন গতিবেগ সঞ্চিত হয় তখন যেন একে অন্যকে ধাওয়া করতে থাকে। সে চোখের পলক ফেলে এবং ভালো করে তাকায়, দেখে পাতাটা স্থির হয়ে রয়েছে…এটা নিশ্চয়ই গতরাতে সেবন করা আফিমের প্রতিক্রিয়া। গুলরুখের দ্বারা কেবলই তাঁর জন্য বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে প্রস্তুতকৃত মিশ্রণটা এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে, যা তার আবাসকক্ষে মেহমেদ পৌঁছে দিয়েছে নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো জোরাল উপাদান তাতে ছিল। সূর্য দিগন্তের উপরে এক বর্শা পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করবার পরেই কেবল তার ঘুম ভাঙে এবং এমন একটা দিনে যেদিন সে তার অর্ন্তদৃষ্টি প্রকাশ করবে, তাঁকে সকাল সকাল ঘুম থেকে না উঠাবার জন্য সে জওহরকে ভর্ৎসনা করে।
হুমায়ুন সহসা সচেতন হয়ে উঠে, টের পায় তার উপদেষ্টারা তাঁর দিকে আগ্রহী চোখে তাকিয়ে রয়েছে। সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল যে তারাও এখানে উপস্থিত আছে। সে নিজেকে সোজা করে দাঁড় করায়। তোমরা জান আমি গ্রহ আর নক্ষত্রের শেষ না হওয়া আবর্তন পর্যবেক্ষন করেছি, যেমনটা করেছিলেন আমার পূর্বপুরুষ। উলুঘ বেগ। অনেক ভাবনা চিন্তার পরে আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে তার গবেষণাকে আমরা অতিক্রম করে যেতে পারি এবং সেই তারকারাজির ছক আর সারণি এবং বহু পূর্বে সংঘঠিত ঘটনাবলীর নথী যখন বিজ্ঞ জ্যোতিষীর সহায়তায় এবং কোনো মানুষের শুদ্ধ ভাবনার আপন ক্ষমতার দ্বারা বিবক্ষিত হয়, সেটা থেকে জীবনযাপন প্রণালীর এমনকি শাসনকার্যের একটা কাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব।
