বিভ্রান্ত হুমায়ুন তার মা আর খানজাদা আর অন্যান্য রাজ মহিষীদের খোঁজে চারপাশে ইতিউতি তাকায়, কিন্তু গুলরুখ আর তার পরিচারিকাদের ছাড়া তারা সম্ভবত সেখানে একা।
আমি ভেবেছিলাম, স্বল্প পরিসরে, আনুষ্ঠানিকতাবর্জিত উৎসব আয়োজন হয়ত তোমার পছন্দ হবে, গুলরুখ বলে। আজ আমি তোমার একমাত্র আতিথ্যকত্রী কিন্তু আশা করি তুমি আমার অসম্পূর্ণতা মার্জনা করবে।
হুমায়ুন এবার তার আসনে একটু সোজা হয়ে বসে, চোখে সতর্ক দৃষ্টি। গুলরুখ কি করতে চায়? নিশ্চয়ই জানে তাঁর আমন্ত্রণ সে সৌজন্যের খাতিরে গ্রহণ করেছিল- তাঁর বেশী কিছু না-কিন্তু সে বোধহয় আয়োজনটাকে অন্তরঙ্গ কিছু একটায় পরিণত করতে চায়। এক মুহূর্তের জন্য সে ভয় পায় যে গুলরুখ বোধহয়। তাঁকে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করবে, হয় সে নিজে বা তাঁর পরিচারিকাদের মাধ্যমে।
আমি তোমার জন্য একটা চমকের বন্দোবস্ত করেছি।
হুমায়ুন চারপাশে তাকায়, মনে ক্ষীণ আশা সে ঘন্টা আর মন্দিরার আওয়াজ শুনতে পাবে এবং সারিবদ্ধভাবে নাচিয়ে মেয়েদের এগিয়ে আসতে দেখবে নিদেনপক্ষে টলমল করে এগিয়ে আসা বাজিকর, দড়াবাজ এবং আগুন-খেকোদের দল যা দরবারের মনোরঞ্জনের বাধা উপকরণ। কিন্তু এর বদলে তার ডান পাশের ছায়ার ভিতর থেকে নমনীয় একটা অবয়ব আবির্ভূত হয়। অবয়বটা সরাসরি তার দিকে এগিয়ে আসলে, হুমায়ুন মেহমেদের ধুসর মুখাবয়ব চিনতে পারে। তুর্কী লোকটা তার সামনে নতজানু হয় এবং একটা পানপাত্র তার দিকে এগিয়ে দেয় যেটা লাল সুরার মতো দেখতে একটা পানীয় দ্বারা ভর্তি।
এটা কি? মেহমেদকে উপেক্ষা করে হুমায়ুন এবার সরাসরি গুলরুখের দিকে তাকায়।
কাবুলের দক্ষিণ থেকে সংগৃহীত উচচণ্ড আফিমের একটা বিশেষ মিশ্রণ এবং গজনীর লাল সুরা, আমি নিজের হাতে মিশ্রিত করেছি আমাদের পরিবারের ভিতরে সীমাবদ্ধ একটা প্রস্তুতপ্রণালী অনুসারে। মাঝে মাঝে তোমার আব্বাজান যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তেন-আমি এটা তার জন্য প্রস্তুত করতাম। তিনি বলতেন পানীয়টা তাকে আত্মহারা করে তুলে…
হুমায়ুন গাঢ়, প্রায় বেগুনী তরলটার দিকে যখন তাকিয়ে থাকে, তাঁর মানসপটে বাবরের একটা ধারাবাহিক প্রতিচ্ছবি ঝলসে উঠে, যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় লাভের পরে আনন্দে অধীর হয়ে আফিম নিয়ে আসতে বলে নিজেকে আরও তুঙ্গস্পর্শী উচ্চতায় নিয়ে যাবার জন্য…সে তার আব্বাজানের মুখাবয়বে পরমানন্দের অনুভূতি লক্ষ্য করেছে, তার আনন্দদায়ক অনুভূতির চাপা গুঞ্জন শুনেছে। তাঁর নিজের কাছেও অবশ্য আফিম অপরিচিত কিছু না। তার আব্বাজানের মৃত্যুর পরে এটা তার শোককে প্রশমিত করতে সাহায্য করেছে। পরবর্তীতে সে ইন্দ্রিয়পরবশ অবসন্নতা আবিষ্কার করেছে যা গোলাপজলে দ্রবীভূত কয়েকটা বড়ি উৎপন্ন করতে পারে এবং যা রমণের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বাবরকে যেমন আত্মহারা দেখাত সে কদাচিৎ সেরকম পুরোপুরি আত্মহারা হতে পেরেছে।
তুমি কি প্রথমে তোমার ব্যক্তিগত খাদ্য আস্বাদকারীকে ডেকে পাঠাতে চাও?গুলরুখ জানতে চায়। কিন্তু হুমায়ুন কোনো উত্তর দেবার আগেই সে সামনে এগিয়ে এসে মেহমেদের হাত থেকে পানপাত্রটা তুলে নেয় এবং সেটাকে নিজের নিখুঁত ঠোঁটের কাছে তুলে আনে। সে ঢোক গেলাতে তাঁর ভরাট গলা কেঁপে উঠে এবং হুমায়ুন দেখে গুলরুখ নিজের হাত উঁচু করে চিবুক বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসা। তরলের কয়েকটা ফোঁটা ধরে এবং তারপরে কমনীয় ভঙ্গিতে চেটে নিজের আঙ্গুল পরিষ্কার করে।
সুলতান, পান করুন। আপনার জন্য এটা আমার উপহার… হুমায়ুন সামান্য ইতস্তত করে তারপরে পানপাত্রটা হাতে নেয়, তখনও সেটা তিন-চতুর্থাংশ পূর্ণ, এবং সেটাকে নিজের ঠোঁটের কাছে তুলে এনে একটা চুমুক দেয়। সুরাটার স্বাদ কেমন একটু অগ্নিগর্ভ মনে হয়- গুলরুখ নিশ্চিতভাবেই আফিমের হাল্কা তিতা স্বাদ ঢাকতে মশলা ব্যবহার করেছে। হুমায়ুন আবারও পান করে, এইবার আরও জোরালভাবে এবং অনুভব করে তার দেহের ভিতরে এক ধরনের কোমল উষ্ণত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে- গলা দিয়ে সেটা প্রথমে নামে, তারপরে তাঁর পাকস্থলীর গর্ভে গিয়ে থিতু হয়। কয়েক মুহূর্ত পরে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ভারী হয়ে উঠতে থাকে। একটা আনন্দদায়ক, দুর্নিবার একটা নিশ্চেষ্টতা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে থাকে এবং হুমায়ুন পরিশ্রান্ত একজন মানুষের মতো যিনি একটা নরম বিছানা তাঁর জন্য প্রস্তুত দেখতে পেয়ে সেটাতে শোয়ার জন্য অপেক্ষা করতে অপারগ এমনভাবে নিজেকে এই আলস্যের হাতে সঁপে দেয়।
পানপাত্রে থেকে যাওয়া বাকি পানীয়টুকুও গিলে নেয় সে। তার চোখ ইতিমধ্যে অর্ধেক বন্ধ হয়ে গিয়েছে সে অনুভব করে তাঁর কাছ থেকে একটা কোমল হাত পানপাত্রটা নিয়ে নেয় এবং চেয়ার থেকে তাকে তুলে নিয়ে এবং তাকে পথ দেখিয়ে একটা নরম গদির কাছে নিয়ে আসে যেখানে তাঁরা তাঁকে শুইয়ে দেয়। কেউ একজন তার মাথার নীচে একটা বালিশ রাখে এবং সুগন্ধিযুক্ত পানি দিয়ে আলতো করে তার মুখটা মুছিয়ে দেয়। ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগে এবং হুমায়ুন বিলাসপ্রিয় ভঙ্গিতে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে। শীঘ্রই তাঁর দেহে এমন একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে যেন একটা শূন্যতার মাঝে দেহটা দ্রবীভূত হচ্ছে। সে নিজের দেহের কোনো অংশই অনুভব করতে পারে না কিন্তু এতে কিবা এসে যায়? তাঁর আত্মা- সে যা তাঁর মূল নির্যাস, পৃথিবীর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ, হেঁটমুখ করে থাকা একটা জমতো না সে একদা যেমন ছিল- যেন তারকা-শোভিত স্বর্গের দিকে ধাবিত হচ্ছে যা সহসা তাঁর সামনে অবারিত হয়েছে।
