তুমি যদি আমার ইচ্ছাটা রাখো তাহলে সেটা আমাকে ভীষণ প্রীত করবে। হুমায়ুনের নিরবতা আপাতভাবে গুলরুখকে স্পর্শ করে না। তোমার গুজরাত বিজয় উদযাপন করতে, আমি তোমার সম্মানে একটা ভোজসভার আয়োজন করতে চাই। তোমার আম্মিজান আর ফুপু এবং রাজপরিবারের অন্যান্য মহিলারাও আমার অতিথি হবে। তোমার খাতিরে আমাকে এটুকু অন্তত করতে দাও, আমি তাহলে জানব যে তুমি সত্যিই আমার ছেলেদের ক্ষমা করেছে এবং বাবরের পরিবারে সম্প্রীতি ফিরে এসেছে।
হুমায়ুন নিজের ভিতরে স্বস্তির একটা আমেজ অনুভব করে। সে তাহলে এটা চায়- এটা তার ছেলেদের আগ্রায় ফিরিয়ে আনবার জন্য কোনো অশ্রুসিক্ত আবেদন নয়… কেবলই তার বিজয় উদযাপন। গুলরুখের অনুরোধের প্রতি নিজের সম্মতি প্রকাশ করতে সে তার মাথা নাড়ে, এবং শেষবারের মতো মাধুর্যপূর্ণ সৌজন্যতা প্রকাশ করে সে তার কাছ থেকে বিদায় নেয়।
ঘোড়সওয়াড়ীর ধারণা বাদ দিয়ে, সে এর বদলে মায়ের সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয়। মাহামের বাসকক্ষের দিকে অগ্রসর হবার সময়ে সে দিলদারের কক্ষের পাশ দিয়ে যায়। খুব অল্প বয়সে- দশ কি বারো দিন হবে- যখন বাবর হিন্দালকে মাহামের হাতে তুলে দিয়েছিল। তাঁর কেবল মনে আছে তার মা তাঁকে ডেকে এনে নিজের কোলের শিশুটিকে তাঁকে দেখিয়েছিল। দেখো, তোমার একজন নতুন ভাই এসেছে, মা বলেছিলেন। বিভ্রান্ত হুমায়ুন জোরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকা শিশুটির দিকে তাকায় সে ভালো করেই জানে তার মা নয় অন্য মহিলার…
সেই মুহূর্তে ভাবনাটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে সে। কাবুলে বড় হয়ে উঠার দিনগুলোতে তরবারি নিয়ে যুদ্ধের কৌশল আয়ত্ত্ব করা, মিনিটে ত্রিশটা তীর নিক্ষেপে পারদর্শিতা অর্জন আর পোলো খেলাটা ছিল অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরে সে বুঝতে পেরেছিল মাহামের হাতে হিন্দালকে তুলে দেয়াটা ছিল আব্বাজানের জীবনে দুর্বলতার পরিচায়ক নগণ্য কয়েকটা কাজের অন্যতম- যদিও নিখাদ ভালোবাসা থেকে তিনি কাজটা করেছিলেন।
বিষয়টা থেকে কার মঙ্গল হয়েছে? মাহামের শোকের প্রকোপ হয়ত এরফলে প্রশমিত হয়েছে কিন্তু এর ফলে পরিবারের ভিতরে মতানৈক্য পুষ্ট হয়েছে। প্রথম দিকের বছরগুলোতে সে হিন্দালকে দিলদারের কাছ থেকে আলাদা রাখতে সবসময়ে পাহারা দিত। কিন্তু হিন্দালের বয়স হলে এবং তার আসল মা কে সেটা সে জানতে পারলে, সঙ্গত কারণেই মাহামের কাছ থেকে সে দূরে সরে যায়। সম্ভবত এটাই কারণ, সবচেয়ে ছোট হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কামরান আর আসকারির চক্রান্তে হিন্দাল যোগ দিয়েছিল। সম্ভবত সেদিনের জন্য এটা ছিল তাঁর প্রতিশোধ যেদিন দিলদারের কোল থেকে তাঁকে পৃথক করা হয়েছিল।
দিলদারের নিজের কি অবস্থা? এতোগুলো বছর তাঁর মনে কি ভাবনা খেলা করেছে? সে নিদেনপক্ষে গুলবদনকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা লাভ করতে পেরেছে…কিন্তু সে যখন ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, দিলদার কি শঙ্কিত হয়েছিল যে মাহাম মেয়েটাকেও তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেষ্টা করবে? হুমায়ুন আপনমনে মাথা নাড়ে। সে কখনও সেটা জানতে পারবে না। দিলদার এখন মৃত। মাহাম এসব বিষয়ে কখনও কথা বলে না এবং খানজাদাকেও এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে তাঁর দারুণ অনীহা। মেয়েদের জগতটা সম্ভবত অনেক জটিল আর অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা জায়গা। পুরুষদের পৃথিবীর যত যুদ্ধ আর সংঘাতের সাথে তুলনা করলে মনে হয়, যেখানে সব বিরোধের মীমাংসা মুষ্ঠাঘাত বা তরবারির এক আঘাতে নিস্পন্ন হতে পারে, সেটা অনেক বেশী পরিচ্ছন্ন আর সহজ।
*
একদম প্রায় সোনালী চাঁদের নীচে, দূর্গপ্রাঙ্গণ যা গুলরুখ তাঁর আয়োজিত উৎসবের জন্য মনোনীত করেছে স্থানটা তামার গোলাকার পাত্র বা দিয়ার মাঝে সঞ্চিত সুগন্ধি তেলের ভিতরে জ্বলতে থাকা অসংখ্য সলতের মৃদু আভায় আলোকিত। দূর্গপ্রাঙ্গণের একটা দেয়ালের সাথে একটা বিশাল তাবু দেখা যায়- মোগলদের মাতৃভূমিতে যেমনটা দেখা যায় অনেকটা তেমনি চোঙাকৃতি। কিন্তু শীতকালের তীব্র বাতাসের ঝাপটা সহ্য করার জন্য মজবুত লাঠি একত্রে আটকে এবং পুরু পশমে আবৃত করে তৈরী করার বদলে, হুমায়ুন দেখতে পায় যে কাঠামোটা সরু রৌপ্য দণ্ড দিয়ে নির্মিত যা ফুলের নক্সা শাভিত রেশমী কাপড় দ্বারা আবৃত। রেশমের কাপড়টাকে দুপাশ থেকে পেছনে টেনে বাঁধা হয়েছে মুক্তাখচিত ফিতা দিয়ে যাতে করে প্রবেশপথ রাতের উষ্ণ বাতাসে অর্ধেক উন্মুক্ত থাকে।
গুলরুখের দুজন পরিচারিকা তাঁকে পথ দেখিয়ে তাবুর ভিতরে নিয়ে যায় যেখানে সে অপেক্ষা করছে, পরণে গাঢ় বেগুনী রঙের আলখাল্লা এবং একই রঙের শাল সেটাতে আবার রূপার জরি দিয়ে কারুকাজ করা যা তার মাথা আর কাঁধ ঢেকে রেখেছে। কিন্তু গুলরুখের তরুণী পরিচারিকার দল অর্ধ-স্বচ্ছ মসলিনের পোষাক পরিহিত। দপদপ করতে থাকা আলোর মাঝ দিয়ে তারা এগিয়ে যাবার সময়, হুমায়ুনের দৃষ্টি তাঁদের নমনীয় কোমড়ের বাঁক, সুগঠিত স্তন আর ইন্দ্রিয়সুখাবহ গোলাকৃতি উরু আর নিতম্ব আটকে যায়। তাঁদের নাভিমূলে মূল্যবান পাথর ঝলসে উঠে এবং তাঁদের ঘন কালো চুল হিন্দুস্তানী রীতিতে সাদা জুই ফুল দিয়ে বেণী বাঁধা।
অনুগ্রহ করে… গুলরুখ একটা নীচু, মখমল মোড়া আসনের দিকে ইঙ্গিত করে। হুমায়ুন সেখানে আসন গ্রহণ করলে, তাঁর পরিচারিকাদের একজন চন্দন-সুবাসিত, শীতল পানি পূর্ণ কলাই করা সোনালী জগ হাতে তাঁর সামনে নতজানু হয় যখন আরেকজন সুতির একটা কাপড় নিয়ে আসে। হুমায়ুন তার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং প্রথম পরিচারিকা তাদের উপরে পানির ধারা বইয়ে দেয়। ধীরে, প্রণয়পূর্ণ ভঙ্গিতে অপরজন সেটা মুছে দেয়।
