সুলতান, মহামান্য গুলরুখ আপনার সাথে কথা বলার অনুমতি প্রার্থনা করছেন। একটা কোমল, অদ্ভুত বাচনভঙ্গি বিশিষ্ট কণ্ঠস্বর তার ভাবনায় বিঘ্ন ঘটায়। ঘুরে দাঁড়িয়ে, হুমায়ুন কালো চোখের এক যুবককে দেখে যার মাথা ভর্তি কালো ঝাকড়া চুল কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে। হুমায়ুন তাঁকে আগে কখনও দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। নমনীয় এবং পেলব দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী ছেলেটাকে দেখে কোনো মতেই বিশ বছরের বেশী বয়সী বলে মনে হয় না। তাঁর বাহুদ্বয় পরণের লাল কারুকার্যখচিত আস্তিনহীন পোষাকের কারণে নগ্ন সাবলীলভাবে পেশীবহুল।
তোমার নাম কি?
মেহমুদ, সুলতান।
এবং তুমি আমার সৎ মায়ের খিদমত কর।
মেহমুদের চোখের মণি ঝিলিক দিয়ে উঠে। হ্যাঁ, সুলতান।
তোমার দেশ কোথায়?
ইস্তাম্বুলের অটোম্যান দরবার। আমি আমার মশলা ব্যবসায়ী প্রভুর সাথে আগ্রা এসেছিলাম কিন্তু তিনি যখন দেশে ফিরে যান ভাগ্যান্বেষণের জন্য এখানেই থেকে যাই। আমি ভাগ্যবান রাজমহিষীর কৃপা দৃষ্টি আমি লাভ করেছি।
গুলরুখ কি চায়? সে কদাচিৎ তাঁকে বিব্রত করে। বস্তুতপক্ষে তাঁর আব্বাজানের ইন্তেকাল এবং তার সৎ ভাইদের চক্রান্তের পরে গুলরুখের সাথে তার কদাচিৎ দেখা হয়েছে। তিনি আগে কখনও তাঁর সাথে দেখা করতে চাননি। গুলরুখের অনুরোধ তাঁকে দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভিতরে ফেলে দেয়। অনিচ্ছাসত্তেও হুমায়ুন তার বেড়াতে যাবার সিদ্ধান্ত বাতিল করে। তাঁর সাথে এখন দেখা করতে গেলে সেটা ভদ্রতার পরিচায়ক হবে এবং সে যত তাড়াতাড়ি যাবে তত তাড়াতাড়ি জানতে পারবে পুরো বিষয়টা কি নিয়ে। বেশ, আমাকে তোমার গৃহকত্রীর কাছে নিয়ে চল।
হুমায়ুন মেহমুদকে অনুসরণ করে নিজের কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে, ভিতরের প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে এবং সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসে, যা নীচের ফুলের বাগান দেখা যায় এমন কতগুলো কক্ষের দিকে চলে গিয়েছে যেখানে রাজপরিবারের বয়স্ক মহিলাদের খানজাদা ব্যতীত, যিনি দূর্গের অন্য অংশে থাকতেই পছন্দ করেন- কক্ষ রয়েছে। বাবরের দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তাঁর দুই সন্তান, আসকারি এবং কামরানের মা হিসাবে গুলরুখের মর্যাদার সাথে তাঁর বাসস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। রূপার কারুকার্যখচিত উঁত কাঠের তৈরী দরজার দরজার সামনে তারা যখন পৌঁছায়, পরিচারকের দল দরজার পাল্লা খুলে দিতে হুমায়ুন কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করে।
তুমি হৃদয়বান তাই এতো দ্রুত এসেছো, গুলরুখ তাঁর উষ্ণ, ভারী কণ্ঠে বলে- যা অনায়াসে তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ- তাঁর দিকে এগিয়ে আসে। এতোটা সম্মান আমি আশা করিনি।
তার আপন মায়ের চেয়ে দুই বছরের বড়, গুলরুখের বয়স চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে, কিন্তু মসৃণ, ঢলঢলে দেহসৌষ্ঠবের কারণে তাকে অনেক অল্পবয়সী মনে হয়। কামরান- পাহাড়ী মার্জারের মতো প্রাণশক্তির অধিকারী যার চোখগুলো সরু আর সবুজ- হুমায়ুন ভাবে, দেখতে বাবরের মতো হয়েছে, মায়ের চেহারা পায়নি। কিন্তু গুলরুখের খুদে কালো চোখ- আগ্রহের সাথে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে- একেবারে আসকারির মতো।
তুমি কি অনুগ্রহ করে একটু বসবে না? সে লাল রেশমের একটা তাকিয়ার দিকে ইঙ্গিত করতে হুমায়ুন সেটায় হেলান দিয়ে বসে।
আমি বিষয়টা নিয়ে কখনও তোমার সাথে আলাপ করিনি কারণ আমি লজ্জিত, কিন্তু আমার ছেলেরা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে সেটা আমার যথেষ্ট মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে। তোমার আব্বাজান আল্লাহ্তালা তাঁর আত্মাকে বেহেশত নসীব করুন- তোমাকে তার উত্তরাধিকার নির্বাচিত করেছেন এবং এর বিরুদ্ধাচারণ করা কারও উচিত নয়। আমাকে বিশ্বাস কর আমি তাদের হঠকারী আর ছেলেমানুষী পরিকল্পনার বিষয়ে কিছুই জানতাম না। তারা কি করেছে আমি যখন শুনতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম তুমি তাদের প্রাণদণ্ডের আদেশ দেবে। যখন তাদের প্রাণভিক্ষা চাইতে তোমার কাছে আসব বলে ঠিক করেছি তখনই আমি তোমার উদারতার কথা শুনতে পাই কিভাবে তুমি তাদের বুকে টেনে নিয়েছে এবং তাদের মার্জনা করেছে আর সমৃদ্ধ প্রদেশের শাসক হিসাবে তাঁদের মনোনীত করেছো…আমার বহুদিনের ইচ্ছা এই বিষয়ে তোমার সাথে আলাপ করি কারণ একজন মা হিসাবে আমি তোমাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। আমি আজকের দিনটা বেছে নিয়েছি কারণ আজ তোমার রাজত্ব আরম্ভ হবার তৃতীয় বার্ষিকী। আমি বিষয়টাকে মাঙ্গলিক হিসাবে বিবেচনা করছি আর আমি তোমাকে অভিনন্দনও জানাতে চাই। তুমি খুব বেশী দিন হয়নি যে সম্রাট হয়েছে কিন্তু এরই ভিতরে তোমার অর্জন প্রচুর।
আমি বিশ্বাস করি আমার ভাইয়েরা তাদের কৃতকর্মের শিক্ষা পেয়েছে এবং তাঁরা এখন জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পাবে… তাকিয়ার উপরে হুমায়ুন অস্বস্তি নিয়ে নড়েচড়ে উঠে, বিব্রতবোধ করে এবং চলে যাবার জন্য রীতিমতো উৎকণ্ঠায় ভুগতে আরম্ভ করে। কিন্তু, তাঁর সন্দেহ হয়, গুলরুখের আরও কিছু বলবার আছে। গুলরুখ তাঁর মেহেদী রঞ্জিত আঙ্গুল বুকের উপরে চেপে ধরে আরও কাছে। এগিয়ে আসে।
আমি তোমার কাছে একটা অনুগ্রহ আশা করি যদিও আমার ঠিক সাহস হয় না…
কামরান আর আসকারিকে দরবারে ডেকে পাঠাবার অনুরোধ কি গুলরুখ করতে চাইছে? তার কথা শেষ করার জন্য অপেক্ষা করতে করতে হুমায়ুন নিজের ভিতরে বিরক্তির একটা ঝলক অনুভব করে।
