আপনারা উঠে দাঁড়াতে পারেন।
দরবার হলের দূরবর্তী প্রান্তে পদ্মপাতার আকৃতির একটা মার্বেলের জলাধারের মাঝে সারিযুক্ত ফোয়ারায় জলপ্রপাতের মতো প্রবাহিত গোলাপজলের সুগন্ধ, চারটা সুরু পদযুক্ত সারসের মতো দেখতে, যাদের চোখের বদলে রুবী বসান রয়েছে, লম্বা সোনালী দাহকে পুড়তে থাকা ধূপের ঝাঁঝালো গন্ধের সাথে এসে মিশে। হুমায়ুনের পায়ের নীচে পাথরের মেঝের উপরে বিছান লাল এবং নীল রঙের কার্পেট, সে যখন ধীরে ধীরে সোনালী ঝালর দেয়া সবুজ মখমলের শামিয়ানার নীচে স্থাপিত উঁচু বেদীর দিকে এগিয়ে যায়, নরম লাগে এবং পা ডুবে যায়, বেদীর উপরে সোনালী রঙের একটা অতিকায় দাড়িপাল্লা দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা শক্ত কাঠের আড়া থেকে সোনার শেকলের সাহায্যে দুটো অতিকায় তশতরি ঝুলান হয়েছে, তাঁদের প্রান্তের ধুসর গোলাপী বর্ণের খনিজ পাথরের হীরকাকার খণ্ডের কিনারা মুক্তাখচিত।
দাড়িপাল্লার ঠিক বিপরীত দিকে সাজান রয়েছে দান সামগ্রী যা তার বিপরীতে ওজন করা হবে- কারুকার্যখচিত হাতির দাঁতের বাক্স ভর্তি আকাটা রত্নপাথর, স্বর্ণ আর রৌপ্য মুদ্রা ভর্তি সোনার গিল্টি করা কাঠের গুঁড়ি যার প্রতিটা কক্ষে বয়ে আনতে আটজন করে লোকের দরকার হয়েছে, পশমিনা ছাগলের পশমী কাপড়ের গাঁট যা এতটাই নমনীয় আর কোমল যে একটা ছোট আংটির ভিতর দিয়ে ছয় ফিট চওড়া কাপড়ের বিস্তার অনায়াসে পার হয়ে যেতে পারে, রংধনু রঙের বেলনাকারে পাকানো রেশম কাপড় এবং পিতলের ট্রে যার উপরে মশলা স্তূপ করে রাখা।
বেদীর সামনে এবং দুপাশে দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শণার্থীদের হুমায়ুন জরিপ করে, যাদের ভিতরে তাঁর নানাজান বাইসানগার এবং তাঁর শুভ্র শুশ্রুমণ্ডিত উজির কাশেমও রয়েছে। দুই প্রবীণ ব্যক্তি সমর্থনের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং এক মুহূর্তের জন্য হুমায়ুন বাবরের কথা ভাবে যার শাসনামলের শুরুর দিকে তাঁরাই তাঁকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছিল…কিন্তু এটা শোক বা আক্ষেপের মুহূর্ত না বরং আড়ম্বর আর আনুষ্ঠানিকতার সময়। সে আজ একটা রাজকীয় বিবৃতি দেবে।
নয় বছর পূর্বে পানিপথের যুদ্ধে আমি আমার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছিলাম। আল্লাহতালা আমাদের একটা মহান বিজয় এবং একটা নতুন রাজ্য দান করেছিলেন। এটাও আল্লাহ্তালার ইচ্ছা যে আমার আব্বাজান তিনি যা জয় করেছিলেন সেটা উপভোগের জন্য বেশীদিন জীবিত থাকেননি। হিন্দুস্তানের মোগল সম্রাট হিসাবে আমাকে ঘোষণা করে খুতবা পাঠের আজ তৃতীয় বার্ষিকী। আমার সাম্রাজ্য এখনও নবীন কিন্তু এর আয়তন বৃদ্ধি পাবে…বস্তুতপক্ষে অটোমান সুলতান বা পারস্যের শাহদের স্নান করে দিয়ে এই সাম্রাজ্য ক্ষমতাধর হয়ে উঠবে। মধ্যাহ্নের সূর্যের ন্যায় মোগলদের জৌলুস দ্যুতি ছড়াবে, যারাই এর চোখের দিকে তাকাবার সাহস দেখাবে অন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের সীমান্তে যারা হুমকির কারণ হয়ে উঠেছিল আমি ইতিমধ্যে তাদের পরাজিত করে আমার ক্ষমতা প্রমাণ করেছি। বাহাদুর শাহ এবং লোদি রাজ্যাভিযোগী তার্তার খান অসৎ উদ্দেশ্যে পাহাড়ে লুকিয়ে রয়েছে এবং তাঁদের একদা যে বিপুল ধনসম্পদ ছিল এখন আমার কোষাগারে গচ্ছিত রয়েছে। কিন্তু তোমরা যারা আমার এবং আমার বংশের প্রতি বিশ্বস্ত তাঁরা আজ থেকে শুরু হওয়া গৌরব আর প্রাচুর্যের অংশীদার হবে।
তারা ঠিক যেমন যত্নের সাথে পূর্বে মহড়া দিয়েছিল, কাশেম তূর্যবাদকদের ইশারা করতে তারা আরেকদফা দীর্ঘ তূর্যনাদ অনুকীর্তন করে, যা কক্ষের চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। হুমায়ুন দাঁড়িপাল্লার দিকে এগিয়ে যায়। সোনালী তশতরীর একটাতে উঠে দাঁড়াতে সে টের পায়, তার ওজনে সেটা মাটির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কাশেম হাততালি দিতে, পরিচারকের দল বাক্সের পর বাক্স মূল্যবান পাথর অপর তশতরীতে স্তূপীকৃত করতে শুরু করে যতক্ষণ না, ঢাকের সুললিত ধ্বনির সাথে হুমায়ুন ধীরে ধীরে জমিন থেকে উপরে উঠে আসতে থাকে। অবশেষে, পাল্লা যখন ভারসাম্যে আসে তখন আরেকবার তূর্যধ্বনি শোনা যায়।
লাল চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা একটা বই খুলে কাশিম পাঠ আরম্ভ করে। মহামান্য সুলতান, হুমায়ুন, তাঁর অসীম উদারতার বশবর্তী হয়ে ঘোষণা করছেন যে এইসব মূল্যবান রত্নপাথর তাঁর অমাত্য এবং অনুগত প্ৰজাসকল যাদের নাম এখানে রয়েছে তাদের ভিতরে ভাগ করে দেয়া হবে। সে ধীরে কিন্তু সুললিত কণ্ঠে সুর করে একের পর এক নাম পড়তে থাকে। হুমায়ুনের হাসিতে কৃতজ্ঞতা ফুটতে দেখে- এমনকি লোভও।
এবং এভাবেই ব্যাপারটা চলতে থাকে। হুমায়ুনকে এরপরে থলে ভর্তি সোনা আর রূপার বিপরীতে ওজন করা হয় যা তাঁর সেনাপতিদের ভিতরে বাড়তি পুরষ্কার হিসাবে বিতড়িত হবে এবং এরপরে রেশমের থান, মশলা আর কিংখাবের বিপরীতে তাঁকে ওজন করা হয় যা অন্যান্য শহর আর প্রদেশের শীর্ষ আধিকারিক আর প্রজাদের জন্য পাঠান হয়। অবশেষে সে দরিদ্রদের মাঝে খাদ্যশস্য আর রুটি বিতরণের আদেশ দেয় স্মরণ করিয়ে দিতে যে সম্রাট কেবল তাঁর ধনী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রজাদের কথাই না বরং সবার কথাই ভাবেন।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে এবং শুকরিয়া আর সমর্থনের চিৎকারের রেশ মিলিয়ে আসতে হুমায়ুনের মাথা ব্যাথা আরম্ভ হয়। দরবারের আনুষ্ঠানিকতা- সেখান থেকে প্রচারিত বক্তব্য- রাজবংশের জন্য গুরুতুবহ। সে এখন সেটা বোঝে এবং নিজের প্রজাদের মাঝে সম্ভ্রম জাগ্রত করতে তাকে অবশ্যই আরো উপায় খুঁজে বের করতে হবে কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের কক্ষে ফিরে আসতে পেরে সে স্বস্তি পায় এবং পরণের ভারী আলখাল্লাটা ছুঁড়ে ফেলে। তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারকেরা তাঁকে যখন আরামদায়ক চোগা আর আচকানে সজ্জিত করে তখন জওহর তার অলঙ্কারগুলো নিয়ে সিন্দুকে তুলে রাখে, সে বুঝতে পারে তার একটু একা থাকা প্রয়োজন, চিন্তা করার জন্য সময় দরকার। যমুনার তীর থেকে সে ঘোড়া নিয়ে ঘুরে আসতে পারে যেখানের বাতাস এখানের এই দূর্গের দমবন্ধ করা পরিবেশের চেয়ে নিশ্চয়ই শীতল হবে। সেখান থেকে ফিরে এসে সে সম্ভবত মিষ্টি-গন্ধযুক্ত হারেম এবং সেখানে বসবাসরত তার কোনো এক সুন্দরী তরুণী রক্ষিতাকে দর্শন দিতে পারে।
