হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং ধীরে জানালার দিকে হেঁটে যায়। বৃষ্টি থেমে এসেছে। এবং বিপ্ন আকাশের ধুসর বুক চিরে সূর্যালোকের কয়েকটা ম্লান রশ্মি নীচে নেমে আসে। তার ফুপুজান ঠিকই বলেছে- দরবারের রাজনীতি অনুধাবনে যে প্রয়াস আর সময় সে ব্যয় করেছে সেজন্য অসন্তষ্ট হওয়া তার উচিত হবে না। কেবল বিজয় না, সে তার লোকদের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী আর বিনোদনের ব্যবস্থা করবে…একজন নশ্বর মানুষ হিসাবে না তাঁরা তাঁকে ক্ষমতা আর উত্তর্ষের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করবে।
হুমায়ুন- এটা একবার দেখো…
ঘুরে তাকিয়ে সে দেখে খানজাদা একটা ঢাউস বইয়ের হাতির দাঁতের তৈরী মলাটের সাথে যুক্ত দুটো রূপার ক্ষুদ্রাকৃতি কজা খুলছে যা তার এক পরিচারিকা তার কাছে নিয়ে এসেছে। বইটা চন্দন কাঠের তৈরী একটা রেহেলের উপরে রেখে সে পাতা উল্টাতে আরম্ভ করে, লাইনের পর লাইন চোখ বুলিয়ে যাবার সময় তাঁর ভ্র কুচকে থাকে, সে যা খুঁজছিলো সেটা পাবার পরেই কেবল সন্তুষ্টির সাথে সে মাথা নাড়ে।
তুমি যখন এখানে ছিলে না, আমি সুলতান ইব্রাহিমের ঘরোয়া নথীপত্র আমাদের ভাষায় অনুবাদের আদেশ দিয়েছিলাম। হিন্দুস্তানের শাসকদের দরবারের রীতিনীতি আমাদের দৃষ্টিতে কেমন অদ্ভুত মনে হয় খানিকটা উদ্ভটও- সেগুলো যত্নের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন ধরো, এখানে লেখা রয়েছে যে প্রতিবছর তাঁর সিংহাসনে আরোহণের দিনটিতে একটা সর্বজনীন উৎসবের আয়োজন করে সুলতান ইব্রাহিমের ওজন নেয়া হত এবং ওজনের সমপরিমাণ রূপা, খাদ্যবস্তু আর উৎকৃষ্ট কাপড় তাঁর অমাত্য আর প্রজাদের মাঝে তাদের যোগ্যতা আর পদমর্যাদা অনুযায়ী বিলিয়ে দেয়া হত। তুমিও এমন কিছু একটা করতে পার? প্রজাদের কাছে নিজের ক্ষমতা আর সম্পদ-এবং তোমার উদারতা প্রদর্শন করে তুমি তোমার ধনী আর দরিদ্র প্রজাদের আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পার। দেখ- অনুষ্ঠানটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে…।
খানজাদার কাছে এসে হুমায়ুন তাঁর কাঁধের উপর দিয়ে লেখাটা পড়ে। প্রথমে, ওজন নেবার অনুষ্ঠানে পালনীয় আচারের বিশদ বর্ণনা পড়ে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। বিস্মিত হবার কোনো কারণ নেই মোগলরা পানিপথে সুলতান ইব্রাহিমের বাহিনীকে সহজেই পরাস্ত করেছিল যদি সুলতান এসব বিষয় প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। কঠিন যুদ্ধ আর রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে যে সম্পদ অর্জিত হয়নি সেটা অপুরুষোচিত, দুর্বলচিত্তের পরিচায়ক। সে তুলনায় বিজয়ের অব্যবহিত পরেই তাঁর যোদ্ধাদের ঢালে লুষ্ঠিত সম্পদ স্তূপীকৃত করাটা বরং অনেক উত্তম…
সে অবজ্ঞায় ঠোঁট বাঁকায়। হিন্দুস্তানের অতীতের নৃপতিরা যেভাবে শাসন করেছে সেভাবে শাসন করার জন্য মোগলরা হিন্দুস্তানের উপরে প্রভুত্ব স্থাপন করেনি। কিন্তু খানজাদা আগ্রহী চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকলে সে নিজের ভাবনার রাশ সংযত করে এবং সে যখন সংযত হয় তার নিশ্চয়তায় ফাটল ধরে। তাঁর প্রতিক্রিয়া এখনও সম্ভবত মধ্য এশিয়ার বিশুষ্ক তৃণপ্রধান প্রান্তর থেকে আগত সেইসব যাযাবর যোদ্ধাদের মতোই রয়েছে…কিন্তু সে এখন হিন্দুস্তানে রয়েছে এবং অবশ্যই পরিবর্তিত হওয়া শিখতে হবে। খানজাদা সম্ভবত ঠিকই বলেছেন। একজন নৃপতির যুদ্ধের ময়দানে জয়লাভের সাথে সাথে তার পুরস্কৃত করার এবং সম্ভ্রম উদ্রেকের সামর্থ্যের দ্বারাই ক্ষমতার অধিকারী হয়। এইসব পুরাতন আনুষ্ঠানিকতার মাঝে নিশ্চয়ই কিছু একটা রয়েছে। সুলতান ইব্রাহিমের কিছু কিছু রীতি বোধহয় তার গ্রহণ করা উচিত কিন্তু সেগুলোকে নতুন জৌলুসে… জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী হিসাবে গড়ে তুলতে হবে…
হুমায়ুন খানজাদার কাঁধে হাত রাখে। আরও একবার আমার কর্তব্য করণীয় সম্পর্কে আপনি আমাকে পথ দেখালেন…
*
জওহরের ধরে থাকা ঘষা-মাজা করা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে হুমায়ুন তাকিয়ে থাকে। তার পরনে ধুসর নীল বুটিদার রেশমের উপরে সোনার কারুকাজ করা আলখাল্লা এবং তাঁর আঙ্গুলে আর গলার চারপাশে মূল্যবান সব পাথর ঝলমল করছে। নিজের আঁকালো পোষাক আর অলঙ্কারে মুগ্ধ, নিজের উপস্থাপিত অবয়ব দেখে প্রীত হয়ে হাসে সে। বস্তুত পক্ষে, তাঁর কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ যে অলঙ্কারটা সেটা হল কোহ-ঈ-নূর হীরক খণ্ড, তাঁর আলোর পর্বত, যা স্বর্ণখচিত অবস্থায় তার বুকে শোভা পাচ্ছে, এবং– এমনকি এর চেয়েও বেশী। ডান হাতের মধ্যমায় পরিহিত তৈমুরের স্বর্ণ অঙ্গুরীয়। আংটিটা হুমায়ুনের সৌভাগ্যে কবচ- এর পৌরুষত্ব, বস্তুগত দৃঢ়তা তাঁর কাছে সবার প্রত্যাশার মাত্রা অবিরত তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়, তাকে এখনও কত কিছু অর্জন করতে হবে…
হুমায়ুন ইশারায় জানায় যে আগ্রা দূর্গের বিশাল দর্শনার্থী কক্ষের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হবার জন্য সে প্রস্তুত। ব্রোঞ্জের তৈরী দুটো লম্বা সূর্যের তূর্যনাদ আর পাদিশাহ্ সালামাত, সম্রাটের জয় হোক, সে বহু-স্তম্ভ বিশিষ্ট দরবার হলে প্রবেশ করে যেখানে তার নেতৃস্থানীয় প্রজাবৃন্দ- তাঁর রাষ্ট্রীয় আধিকারিকেরা, তাঁর সেনাপতিরা, তাঁর অমাত্যবৃন্দ এবং তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া হিন্দুস্তানী রাজারা অপেক্ষা করছে। তারা অধোমুখে প্রণত হতে, তাঁদের কপাল মাটি স্পর্শ করে, উজ্জ্বল আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায় তাদের তীব্র বাতাসের ঝাপটায় নুয়ে পড়া ফুলের বাগিচার মতো দেখায়।
