আমি আপনার জন্য একটা উপহার নিয়ে এসেছি, হুমায়ুন তার হাতের মুঠি খুলে এবং তার আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে রুবী আর পান্নার হারটার সৌন্দৰ্য ক্ষরিত হতে দেয়। ভালো করে দেখার জন্য গুলবদন সামনে এগিয়ে আসে, কিন্তু রত্নখচিত হারটা গ্রহণ করে সেটাকে আলোতে ধরার আগে খানজাদা সম্ভবত একটু ইতস্তত করেন। দারুণ সুন্দর কিন্তু আমার জন্য বোধহয় একটু বেশীই মনোরম… এটা। এখন আর আমায় মানাবে না। তুমি যখন বিয়ে করবে তখন তোমার বৌকে আমার হয়ে এটা দিয়ো। হুমায়ুন কিছু বলার আগেই খানজাদা হারটা হুমায়ুনের তালুতে রেখে তার আঙ্গুলগুলো বন্ধ করে সেটাকে তালুবন্দি করে দেয় এবং ইঙ্গিতে তাঁকে পাশে বসতে বলে। গুলবদন- এখন তুমি যাও। আগামীকাল তুমি অবশ্যই আসবে- একটা ফার্সী কবিতা আছে যা আমি তোমাকে দেখাতে চাই।
মেয়েটা বই বন্ধ করে ধীর পায়ে হেঁটে যেতে খানজাদা পেছন থেকে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। গতবছর তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই আমার ভেতরে মেয়েটার প্রতি একটা মমতুবোধ জন্ম নিয়েছে দারুণ বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে এবং চারপাশে কি ঘটছে সবকিছু লক্ষ্য করে।
তার বয়সে আপনি যেমন ছিলেন? আমার আব্বাজান আমাকে প্রায়ই বলতেন কিছুই আপনার দৃষ্টি এড়ায় না।
সে আমার তোষামদ করতো।
আমার সেটা মনে হয় না, এবং সেই কারণেই আমি আরো একবার আপনার কাছে পরামর্শের জন্য এসেছি। বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমার বিজয় প্রমাণ করেছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে অনুসরণ করার জন্য মানুষদের অনুপ্রাণিত করতে পারি এবং নিশ্চিত হয়েছি যে আমি একজন ভালো যোদ্ধা।…আমাকে জীবনে আরও অনেক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে এবং আমি সেজন্য ভীত নই- বস্তুতপক্ষে আমি তাঁদের মুখোমুখি হবার জন্য মুখিয়ে আছি যদি তারা আমার সাম্রাজ্য আরও নিরাপদ করতে আমাকে সাহায্য করে…
তুমি ঠিকই বলেছে। প্রমাণ করেছে যে তুমি একজন জাত নেতা। সেই সাথে নির্ভীক। তাহলে তোমার এই উদ্বেগ কিসের জন্য?
আমি যখন অভিযান শেষে আগ্রায় ফিরে আসছিলাম, যুদ্ধের উদ্বেগ আর উত্তেজনা থিতিয়ে আসতে প্রায়ই নিজের মনেই চিন্তা করেছি, এবার কি? আমি জানি কিভাবে যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয় কিন্তু আমি কি সত্যিই জানি কিভাবে একটা সাম্রাজ্য শাসন করতে হয় এবং টিকিয়ে রাখতে হয়? সোনার কারুকাজ করা সিংহাসনে যখন উপবেশন করি, আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে থাকে উপদেষ্টা, মোসাহেব আর শরণার্থীর দল, সবাই নিজ নিজ সমস্যা বা অনুরোধের প্রতি আমার মনোযোগ আকর্ষনে ব্যস্ত, তখন আমার কেমন আচরণ করা উচিত? মাঝে মাঝে আমার মনে হয় এদের সবাইকে বিতাড়িত করি এবং সালিমা বা আমার অন্য কোনো রক্ষিতার সাথে সময় কাটাই কিংবা শিকারে বেড়িয়ে পড়ি।
একজন প্রাণবন্ত যুবকের জন্য সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু তোমাকে এমন প্রলোভন দমন করতে হবে। একজন শাসককে তাঁর চারপাশে কি ঘটছে সে বিষয়ে অবশ্যই সজাগ থাকবে এবং অসন্তোষ ঘনিয়ে উঠে বিদ্রোহের রূপ নেবার আগেই সেটা আঁচ করার মতো সংবেদনশীল হতে হবে। তোমার আব্বাজান যেমন শিখেছিলেন তুমিও তেমনি শিখে নিবে। তার জন্য বিষয়টা মোটেই সহজ ছিল না। আল্লাহতালা যখন তাকে সিংহাসনের অধিকারী করেছিল তখন তোমার চেয়েও তার বয়স অল্প ছিল কিন্তু তিনি একজন মহান শাসকে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর রোজনামচাগুলো পড়–তুমি যা সন্ধান করছে সেখানের পাতায় তুমি তা খুঁজে পাবে, কঠিন অভিজ্ঞতা আর রক্ত থেকে সৃষ্ট… খানজাদা দম নেবার জন্য থামেন, তারপরে খানিকটা বিষণ্ণ ভঙ্গিতে হেসে উঠেন। বাবর যদি এখন এই মুহূর্তে আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকতেন, দরবারে তুমি যাদের তোমার নিকটে অবস্থান করতে দাও তাঁদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে তিনি হয়ত তোমায় বলতেন… যাকে তুমি ক্ষমতা প্রদান করছে তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবে, সবাইকে বিশ্বাস করবে না। সবসময়ে নিজেকে প্রশ্ন করবে কেন- কেন এই লোকটা আমাকে এই পরামর্শ দিচ্ছে? আমি যদি সম্মতি দেই তাহলে তার কি লাভ? আমি যদি সম্মতি না দেই তাহলে তার কি ক্ষতি? তাকে যা দেয়া হয়েছে সেজন্য কি সে কৃতজ্ঞ থাকবে নাকি সে চিন্তা করবে অধিকার বলেই এটা তাঁর প্রাপ্য?
আমার মনে হয় এসব অনেকটাই এখন বুঝতে পারি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যেন সন্দেহপরায়নতাই একজন শাসকের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। সঙ্গত কারণেই বিষয়টা আমাকে পীড়িত করে, আমার সৎ-ভাইদের বিদ্রোহ মানুষের উপরে কম আস্থা আরোপ এবং বেশী মাত্রায় সতর্ক হবার শিক্ষা আমাকে দিয়েছে, এমনকি পরিবারের সেইসব ঘনিষ্ঠ সদস্যদের ক্ষেত্রেও যাদের আমি অকৃত্রিম মিত্র হিসাবে বিবেচনা করতাম। কিন্তু সাধারণ মানুষ, আমার প্রজারা, যাদের কেবল আমার শরণার্থী হিসাবে দেখি কিংবা রাষ্ট্রীয় ভ্রমণের সময়ে যাদের আনুগত্য আমার প্রয়োজন তাঁদের ক্ষেত্রে আমি কি করবো?
তাদের কাছে তুমি সবসময়ে অন্তরঙ্গতাবর্জিত একজন হিসাবে অবস্থান করবে। তুমি কেমন তারচেয়ে তারা তোমাকে কিভাবে প্রত্যক্ষ করে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। তোমার পক্ষে যখনই সম্ভব হবে তুমি তাদের সামনে উপস্থিত হবে এবং যখন দর্শন দেবে তাঁদের কাছে সেটা যেন সূর্যের মতো মনে হয়, দৃষ্টি আরোপের ক্ষেত্রে বড় বেশী দীপ্রময়। তাঁদের সুরক্ষিত রাখতে তোমার ক্ষমতার প্রতি যেন তারা বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে…এবং কেউ তোমার বিরুদ্ধাচারণ করলে তোমার শাস্তি দেয়ার ক্ষমতায়। আমাদের পূর্বপুরুষ তৈমূর তার প্রজাদের কেবল নিজের বিজয় না, সেই সাথে তাঁর ব্যক্তিত্বের ঝলকে কিভাবে বিমোহিত করতেন সেটা স্মরণ কর। সমরকন্দে যেসব প্রাসাদ আর মসজিদ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তিনি যে অভাবিত সম্পদ প্রদর্শন আর দান করেছেন, সেসব তার প্রতিটা বিজয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, পৃথিবীর বুকে তাঁর পদচিহ্ন চিরস্থায়ী করতে।
