আল্লাহু আকবর, আল্লাহ্ মহান, সমবেত কাতার থেকে সাথে সাথে প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
ভোজসভা শুরু করার আগে এই সম্পদের কিছু অংশ আমি তোমাদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। আজকের এই সমাবেশে প্রত্যেক বরিষ্ঠ আধিকারিককে তাঁর ঢাল নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। কেন সেটা তোমরা শীঘ্রই দেখতে পাবে। আকষ্মিক আক্রমণের ভয়ে সেটা বলা হয়নি। আমাদের শত্রুরা হতোদ্যম আর ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছে। বলা হয়েছে নিজের এবং তার লোকদের জন্য উপহার বহনের উদ্দেশ্যে। আধিকারিকেরা নিজ বর্ম নিয়ে সামনে এগিয়ে এসো। বাবা ইয়াসভালো, প্রথমে আপনি!
মুণ্ডিত-মস্তক বাবা ইয়াসভালো সামনে এগিয়ে যায় এবং হুমায়ুনের সামনে নতজানু হয়।
পিঠ থেকে আপনার বর্মটা নামিয়ে সেটা উল্টো করে মাটিতে রাখুন।
বাবা ইয়াসভালো আদেশ পালন করে।
পরিচারকের দল। সোনা আর রূপার পিণ্ড ঢালের উপরে স্তূপ করে সেটার উপরে মূল্যবান পাথর স্থাপন কর।
পরিচারকের দল মশালের আলোয় দীপ্তিময় আর ঝলমল করতে থাকা মূল্যবান ধাতবপিণ্ড আর রত্নপাথর নিয়ে এসে সেগুলো বর্মের উপরে স্তূপ করে রাখে। বাবা ইয়াসভালো আমার আন্তরিক শুভেচ্ছার সাথে এবার বর্মটা নিয়ে যান এবং গতরাতের সুরাপানের কারণে যদি আপনি এখনও দুর্বল বোধ করেন তাহলে আপনার লোকদের ডাকে সাহায্য করতে।
যুবক কিংবা বৃদ্ধ, খোয়ারি আক্রান্ত হোক বা না হোক, যেকোনো মানুষের বহনের পক্ষে বোঝাটা অনেক বেশী, এবং মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বাবা ইয়াসভালো আবারও মাথা নত করে, একহাত মুষ্ঠিবদ্ধ অবস্থায় নিজের হৃৎপিণ্ডের উপরে স্থাপিত এবং নিজের লোকদের ইশারায় সাহায্য করতে বলে। তারা তাদের অর্জিত ধনরাশি একত্রে বয়ে নিয়ে যেতে, হুমায়ুন পরবর্তী আধিকারিক, দীর্ঘদেহী, ক্লান্ত এক আফগানিকে ইঙ্গিত করে পাটাতনে উঠতে এবং পুরো প্রক্রিয়াটা পুনরাবৃত্তি করে। পুরোটা সময় আমাদের সুলতান, আমাদের পাদিশাহ, হুমায়ুন মহান, এই রব শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পেতে থাকে। দুহাত মাথার উপরে তুলে, হাসিমুখে তাঁদের এই ধ্বনিকে স্বাগত জানায় হুমায়ুন। সম্রাট হিসাবে নিজের প্রথম অভিযানে সফল হয়েছে সে। তার পূর্বে তার মরহুম আব্বাজানের মতো তাঁর নিজের এবং লোকদের জন্য গৌরব আর ধনরাশি অর্জন করেছে সে। জীবন বেশ মধুময়- সৌভাগ্যের এই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হোক।
১.৪ অনিশ্চিত ভারসাম্য
০৪. অনিশ্চিত ভারসাম্য
বর্ষায় মুষলধারে বৃষ্টি হতে আগ্রা দূর্গের ভিতরের আঙ্গিনা পানিতে থৈ থৈ করছে। বৃষ্টির ভারী ফোঁটা পাথরের আস্তরণে ঠিকরে যাচ্ছে এবং পানির প্রস্রবনগুলো যা থেকে জলের বুদ্বুদ বের হবার কথা সেগুলো জলমগ্ন করে তুলেছে। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার জন্য কাপড়ে ক্ষয়কারী ছত্রাক জন্মাতে শুরু করেছে এবং রাজকীয় পাঠাগারে উদ্বিগ্ন পণ্ডিতেরা হিন্দুস্তানে যেসব পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছিলেন বাবর সেগুলোকে আর্দ্র আবহাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে তাদের বাৎসরিক প্রয়াসে ব্যস্ত। পাণ্ডুলিপিগুলোর ভিতরে বাবরের রোজনামচাও রয়েছে, যেগুলোকে আর্দ্র আবহাওয়া আর কীটপতঙ্গের ঝাঁকের হাত থেকে বাঁচাতে ভিতরের দিকে সীসার আস্তরণযুক্ত বিশেষভাবে তৈরী ধাতব বাক্সে সংরক্ষণের জন্য তাঁর গ্রন্থাগারিকদের আদেশ দিয়েছে হুমায়ুন। বাক্সটা যে কক্ষে রাখা হয়েছে সেখানের বাতাস শুষ্ক করতে বর্ষা মৌসুমে অবিরত কর্পূর কাঠ জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে।
গতকাল গভীর রাতে, মুষলধারে হতে থাকা বৃষ্টি সম্পর্কে উদাসীন হুমায়ুন তাঁর গুজরাত অভিযান শেষে বিজয়ীর বেশে আগ্রায় ফিরে এসেছে। তার লোকদের পুরস্কৃত করার পরেও সোনা, রূপা আর মূল্যবান রত্নপাথরের বেঁচে যাওয়া অবশিষ্টাংশ ইতিমধ্যে রাজকীয় কোষাগারে স্তূপীকৃত করা হয়েছে। কয়েকটা স্মারক ব্যাতীত- মুক্তাখচিত রূপার একটা পরিকর সালিমার নমনীয় কটিদেশে যা দারুণ মানাবে, তার মা মাহামের জন্য একটা সবুজ জেড পাথরের তৈরী পানপাত্র এবং খানজাদার জন্য রুবী আর আকাটা পান্না খচিত সোনার তৈরী একটা দুই-লহর বিশিষ্ট হার যা বংশ পরম্পরায় গুজরাতের রাজবংশের মহিলাদের কণ্ঠে সুনামের সাথে শোভা পেয়েছে। একটা কলাই করা সিন্দুক খুলে সে হারটা বের করে, গাঢ় সবুজ পান্নার সাথে আগ্নেয় প্রভায় বিন্যস্ত রুবীর দিকে আরও একবার মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
হুমায়ুন যখন তাঁর ফুপুজানের বাসস্থানের দিকে হেঁটে চলে, তখনও হারটা তাঁর হাতে ধরা। হুমায়ুন জানে অভিযানের খুঁটিনাটি বর্ণনা তাঁকে আগ্রহী করে তুলবে কিন্তু সেই সাথে ফুপুজানের পরামর্শও তার প্রয়োজন। ফুপুজানের কক্ষে প্রবেশ করতে, সে দেখে যে খানজাদা কিছু একটা পাঠ করছে এবং তাঁর পাশে বইয়ের ভিতরে মাথা গুঁজে বসে রয়েছে তার এগার বছর বয়সী সৎ-বোন গুলবদন। মেয়েটা তার মা দিলদার এবং ভাই হিন্দালের মতো গাঢ় তামাটে বর্ণের উজ্জ্বল আর কৌতূহলী চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকায়।
খানজাদা সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায় এবং তাঁর দুই কাঁধ চেপে ধরে তাঁর দুগালে পরম মমতায় চুম্বন করে। হুমায়ুন, তোমাকে স্বাগতম। তুমি বিজয়ী হয়েছে যেমনটা আমি জানতাম তুমি হবে…তোমার অগ্রগতির প্রতিটা বিবরণী আমাকে গর্বিত করেছে।
