লাফিয়ে জলাশয়ের তলদেশে নেমে, হুমায়ুন নিজে ঝুলন্ত দরজা ধরে টানতে শুরু করে। দরজাটার পাল্লা সহজেই উঠে আসলে এর নীচে চেটালো সিঁড়ির বেশ কয়েকটা ধাপ দেখা যায় যা একটা নীচু, লোহার গজালশোভিত দরজার কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে একটা বিশাল ধাতব তালা দিয়ে দরজাটা বন্ধ করা।
আমাকে একটা বাঁকান প্রান্তযুক্ত লৌহদণ্ড দিন, সে আদেশ করে। দণ্ডটা নিয়ে সে এর প্রান্তদেশ তালার ভিতরে প্রবেশ করিয়ে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে দ্বিখণ্ডিত করে। ধাক্কা দিয়ে দরজার পাল্লা খুলে সে মাথা নীচু করে ভিতরে প্রবেশ করে। আধো আলোতে সোনার জ্বলজ্বলে আভা তার চোখে ধরা দেয়। তার চোখ আলোতে সয়ে আসতে সে দেখে যে মেঝেতে পুরু সোনার পিণ্ড সাজিয়ে রাখা আছে এবং খোলা সিন্দুক দেখে মনে হয় রত্নপাথরে ভর্তি। প্রথম কক্ষের ন্যায় আলো বিকিরণকারী আরো কয়েকটা প্রকোষ্ঠ আছে বলে মনে হয়। হুমায়ুন চেঁচিয়ে মশাল নিয়ে আসতে বলে এবং ভৃত্যের দল মশাল আনতে সে দেখে যে সিন্দুকে আসলেই পান্না, রুবি, পোখরাজ আর অন্যান্য দীপ্তিময় পাথর রয়েছে এবং অন্য প্রকোষ্ঠগুলোতে আরও ধনসম্পদ রয়েছে যার ভিতরে আছে রূপার বাসনকোসন আর পানপাত্র এবং কারুকার্যখচিত অস্ত্রশস্ত্র আর বর্ম। তাঁর বিশ্বস্ত আর সাহসী যোদ্ধাদের পুরস্কৃত করার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সে এখানে পেয়েছে।
সব স্বর্ণপিণ্ড, রত্নপাথর আর অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য সরিয়ে নাও। সেগুলো ভালো করে পাহারার ব্যবস্থা কর আর সবকিছু নথীভুক্ত কর। আজ রাতে আমরা উৎসব পালন করবো এবং লুটের মাল ভাগ করে নেব।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে, পরিচারক আর সৈন্যরা একসাথে কঠোর পরিশ্রম করে। তাঁদের প্রথম কাজ দূর্গ প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে একটা নীচু কাঠের পাটাতন নির্মাণ করা যেখান থেকে হুমায়ুন তার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে পারবে এবং লুটের মালে তাঁদের প্রত্যেকের অংশ বিতরণ করবে যা পাটাতনের পেছনে প্রহরাধীন অবস্থায় স্তূপীকৃত করে রাখা হয়েছে। এরপরে দূর্গপ্রাঙ্গণে তারা যেখানে যে কাপড় খুঁজে পেয়েছে, হোক সেটা পশমের, সুতার বা কেবল পাটের তৈরী, হোক সেটা উজ্জ্বল লাল বা বেগুনী রঙের বা কেবল ধুসর পিঙ্গল এবং সবুজ বর্ণের, সুন্দর কারুকার্যখচিত কিংবা সাদামাটা, সব ব্যবহার করে অতিরিক্ত চাদোয়া লাগাতে ব্যস্ত হয়ে উঠে। চাঁদোয়ার নীচে তারা কোনোমতে নীচু কাঠের টেবিল পাতে এবং তার চারপাশে ভোজসভায় আগত অতিথিদের হেলান দেবার জন্য যেখানে যা গদি, তোষক বা তাকিয়া খুঁজে পায় সব এনে বিছিয়ে রাখে। মশালের জন্য তারা কোনমতে মশালদানি তৈরী করে এবং সেগুলো এমন জায়গায় স্থাপন করে যেসব জায়গায়, ভোজসভার আনন্দ আয়োজন বুনো উদ্দামতায় রূপান্তরিত হলে যা অভ্যাগতরা নিশ্চিতভাবেই পরিণত হবে, সুগুলোর উল্টে পরার সম্ভাবনা কম।
তারা যখন তাদের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে, তখন কাছাকাছি মাঠে স্থাপিত রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা খাবারের গন্ধে তাঁদের রসনা তীব্র হয়ে উঠে। লম্বা সরু ধাতব শলাকায় বিধিয়ে আস্ত ভেড়া ঝলসানো হচ্ছে, ভোজসভা উপলক্ষ্যে রাধুনির দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকে বিশাল তামার পাত্রে ফুটন্ত সজির ভিতরে মশলা দিয়ে নাড়ছে, বেশী অভিজ্ঞ রাধুনির দল ছোট ছোট তামার পাত্রে মিষ্টি তৈরী করতে দই, চিনি, গোলাপজল আর নানা পদের মশলা মিশাচ্ছে। অনেক সৈনিকরা মনে, হুমায়ুন এবং তাঁর বেশীর ভাগ অমাত্যদের মতোই, ভালো মুসলমান কিন্তু সুরাপান একেবারে নিষিদ্ধ এই বিষয়টা পুরোপুরি মেনে নিতে অপারগ, দূর্গ থেকে প্রাপ্ত এবং হুমায়ুনের নিজস্ব ভাড়ার থেকে যোগান দেয়া সুরার- যার ভিতরে গজনীর লাল মদিরাও রয়েছে যা আলুম খানের বেঁফাস কথাবার্তার জন্য দায়ী ভাগ নিতে যেখানে যে পাত্র পেয়েছে সেটা নিয়ে সমবেত হয়েছে, সম্ভবত তাঁদের কাছে পানের মোহ বেশী গুরুত্বপূর্ণ।
সূর্যাস্তের একঘন্টা পরে, বাদুরের দল যখন উষ্ণ নিকষ অন্ধকারের মাঝে বিচরণ করতে আরম্ভ করেছে এবং ঝি ঝি পোকার ডাক সপ্তমে পৌঁছেছে, হুমায়ুনের দুই খাস তূর্যবাদক ছয়-ফুট-লম্বা পিতলের বাদ্যযন্ত্রে নিজেদের ঠোঁট স্থাপন করে। তাঁদের বাজনার প্রতিধ্বনি শুনে যখন সেনাপতি আর সাধারণ সৈনিকের গলার স্বর একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায় তখন সোনালী রঙের কাপড়ে তৈরী চোগা ও আচকান পরিহিত উপরে রাজকোষের গোপন ভাণ্ডারে প্রাপ্ত একটা সোনার শৃঙ্খলে নির্মিত বর্ম পরিধান করে হুমায়ুন দূর্গের মূল তোরণ-দ্বারে এসে দাঁড়ায়। সূর্যের অবিরাম আওয়াজ এবং উপরে দূর্গপ্রাকারে স্থাপিত যুদ্ধের দামামার গম্ভীর ধ্বনির মাঝে হুমায়ুন তাঁর সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকদের ভিতর দিয়ে নীচু পাটাতনের দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটায় আরোহন করে, তার সবচেয়ে বলিষ্ঠ আধিকারিকেরা তাকে অনুসরণ করে এবং স্তূপীকৃত ধনরাশির সামনে দাঁড়ায়। তূর্যবাদক আর ঢালিদের ইঙ্গিতে থামতে বলে সে তার লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়।
আজ রাতে আমরা গুজরাতে আমাদের অভিযানের সাফল্য উদযাপন করতে সমবেত হয়েছি। আমাদের শত্রুরা যেখানেই আমাদের মুখোমুখি হবার সাহস দেখিয়েছে সেখানেই আমরা তাদের পরাস্ত করেছি। সুলতান বাহাদুর শাহ এমনকি সে সাহসটুকুও না দেখিয়ে, ভীরু ইঁদুরেব মতো আদতেই তিনি যা তাঁর রাজ্যের দুর্গম প্রান্তে গিয়ে লুকিয়েছেন। আমরা তাঁর ভূখণ্ড দখল করেছি এবং আমার পেছনে তোমরা যে ধনরাশির স্তূপ দেখছো সেটা আমরা আমাদের করে নিয়েছি। আমাদের এই বিজয়ের জন্য এসে প্রথমে আমরা আল্লাহ্তালাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
