ঠিক আছে, হুমায়ুন বলে এবং সাথে সাথে স্বস্তির একটা জোয়ার তাঁকে আপুত করে ফেলে। সম্রাট হিসাবে সে তাঁর প্রথম অভিযানে বিজয়ী হয়েছে। আমরা একটা দারুণ বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। আমাদের আহত যোদ্ধাদের যথাযথ শুশ্রূষার বন্দোবস্ত করা হোক। তারপরে রাজকোষের সিন্দুকগুলো খোঁজা শুরু কর।
*
সুলতান, রাজকোষের ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডারের প্রবেশ পথ আমরা এখনও খুঁজে পাইনি, ছত্রিশ ঘন্টা পরে হুমায়ুনের এক আধিকারিক তাঁকে জানায়। আমরা কি যারা বাকি ছিল সেইসব বন্দি গুজরাতিদের কাউকে নির্যাতন করে দেখবো?
না, পবিত্র কোরআন শরীফের নামে আমি শপথ করেছি কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন না হয়ে নিরাপদে তাঁরা প্রস্থান করতে পারবে। রাজকোষ নিরাপদ করা আমাদের দরকার। কিন্তু নির্যাতন ছাড়া মানুষের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের আরও অনেক পথ আছে। বাবা ইয়াসভালোকে বল বন্দি বলিষ্ঠ গুজরাতি আধিকারিকদের জন্য একটা ভোজসভার আয়োজন করতে যার উদ্দেশ্য হবে তাদের সাহসিকতাকে সম্মান জানান। তারপরে যখন অসংখ্য শুভকামনায় পানপাত্র উজাড় হবে এবং সুরা তাঁদের জীহ্বার জড়তা আলগা করবে তখন আলোচনার বিষয়বস্তু ঘুরিয়ে রাজকোষে নিয়ে এসো আর তখন দেখো এভাবে তাঁদের কাছ থেকে তুমি কি জানতে পার।
সেদিনই মধ্যরাত্রি নাগাদ, হুমায়ুনের অস্থায়ী বাসস্থানের দরজায় টলতে টলতে বাবা ইয়াসভালো এসে উপস্থিত হয়। তাঁর হাঁটায় যদিও জড়তা রয়েছে এবং চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে, একটা চওড়া হাসি তার এক কান থেকে আরেক কান পর্যন্ত লেপ্টে রয়েছে। মহামান্য সুলতানের সাথে আমি কি কথা বলতে পারি?
কয়েক মুহূর্ত পরে তাঁকে হুমায়ুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। সুলতান আমি নিশ্চিত আমি উত্তরটা জানি। আজ রাতের বেশীর ভাগ সময় আমি আঙ্গিনায় গুজরাতি আধিকারিকদের সাথে আহার আর সুরাপানে অতিবাহিত করেছি। তাঁদের একজন- আলুম খান তার নাম- গজনীর উত্তম লাল মদিরা আকণ্ঠ পান করতে তার দেহমন প্রশমিত হয় এবং সে আরও বেশী বাঁচাল হয়ে উঠে, গুজরাতি রাজপরিবার এবং তাঁর সাথী আধিকারিকদের সম্বন্ধে প্রচলিত রটন্তির রসালো অংশ বলতে শুরু করে। আমার যখন মনে হয় যে সময় হয়েছে তখন আমি রাজকোষ সম্পর্কে একটা প্রশ্ন আলতো করে উপস্থাপন করি। সে চমকে উঠে, রাজকোষের অবস্থান কথায় প্রকাশ করে সে বিশ্বাসভঙ্গের কাজ করেনি কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য মার্বেলের জলাধারের একটার দিকে স্থির তাকিয়ে ছিল এবং সে বিচলিত বোধ করতে থাকে।
সহজাত প্রবৃত্তির বশে আমি বুঝতে পারি যে জলাশয়ের রাজকোষের সাথে একটা সম্পর্ক না থেকেই যায় না তাই আমি তাকে এ বিষয়ে আরও প্রশ্ন করতে আরম্ভ করি। আপনি বুঝতেই পারছেন- জলাশয়টা কতদিনের পুরাতন, এর গভীরতা কত, এর নির্মাণশৈলী, কতদিন পর পর একে জলশূন্য করে পুনরায় জলপূর্ণ করা হয়। প্রতিটা প্রশ্নের সাথে সাথে সে উত্তরোত্তর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকে সেই সাথে সে অপ্রত্যয়জনকভাবে তোতলাতে থাকে এবং পরস্পরবিরোধী উত্তর দেয়। আমি নিশ্চিত রাজকোষে প্রবেশের পথ জলাশয়ের নীচে লুকান রয়েছে। বাবা ইয়াসভালো কথা শেষ করে, তার ব্যাপক পানাহারের পরে এতো প্রাঞ্জলভাবে কথা বলতে নিজেকে বাধ্য করার প্রয়াস তাঁকে আপাতদৃষ্টিতে ক্লান্ত করে দিয়েছে।
আপনি আপনার যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। দিনের আলো ফোঁটার সাথে সাথে আমরা জলাশয়ের পানি নিষ্কাশন করে এর তলদেশ খনন করবো। এখন যান এবং পড়ে যাবার আগে একটু বিশ্রাম করে নিন।
পরের দিন খুব সকালে, দূর্গের চারপাশের জঙ্গল থেকে সবুজ তোতাপাখির পাখির কর্কশ ডাকের মাঝে, হুমায়ুন কিছুটা বিপর্যস্ত আর নোংরা বাবা ইয়াসভালোকে পাশে নিয়ে, তাকিয়ে দেখে কেবল সাদা নেংটি পরিহিত মজুরদের একটা দল তাদের চামড়ার থলে নিয়ে জলাশয় পানিশূন্য করতে একটা মানবশেকল তৈরী করেছে। তারপরে জলাশয় পানিশূন্য হতে তাঁরা হামাগুড়ি দিয়ে তলদেশে নেমে এর তলদেশের আস্তরণ গঠনকারী মার্বেলের টুকরো একটা একটা করে চাপ দিয়ে খুলতে শুরু করে। সেগুলো জলাশয়ের পাশেই স্তূপাকারে রাখতে থাকে যেখান থেকে অন্যেরা সেগুলো যত্নের সাথে আঙ্গিনায় নিয়ে গিয়ে সতর্কতার সাথে একটার উপরে একটা সাজিয়ে রাখে।
প্রথম পাথরের খণ্ডগুলো সরিয়ে নেয়ার পরে, বাবা ইয়াসভালো নিশ্চিতভাবেই বিমর্ষ হয়ে পড়ে, নীচে লালচে রঙের বেলেমাটি দেখে। তারপরে, হুমায়ুন যখন অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে জলাশয়ের পাশে পায়চারি করছে, বাবা ইয়াসভালো আচমকা চেঁচিয়ে উঠে, সুলতান, দেখেন! মাঝের ঐ চারটে খণ্ডে খাঁজ রয়েছে এবং তাঁদের চারপাশে পাথরের কুচি পড়ে রয়েছে। পাথরের টুকরোগুলো আগেও ওঠান হয়েছে।
আপনি ঠিক বলেছেন, হুমায়ুন জবাব দেয়। টুকরোগুলো সরাবার ব্যবস্থা করেন।
বাঁকা প্রান্তবিশিষ্ট লৌহদণ্ড পাথরের খণ্ডগুলোর নীচে প্রবিষ্ট করাবার সাথে সাথে সেগুলো দ্রুত উঠে আসে এবং দরদর করে ঘামতে থাকা মজুরদের দল সেগুলো তুলতে, হুমায়ুন কাঠের একজোড়া ঝুলন্ত দরজার একাংশ তাঁদের নীচ থেকে বের হতে দেখে।
পাওয়া গেছে! বাবা ইয়াসভালো আপনার সহজাত প্রবৃত্তি আপনার সাথে প্রতারণা করেনি, আমি নিশ্চিত। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না আপনার এই মাথা ব্যাথার জন্য আমি আপনাকে কি পুরষ্কার দেব।
