আমাদের সাথে এখন কম করে হলেও চারশ লোক রয়েছে, আহমেদ খান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে। এখন কি করবো?
আমাদের কেউ দেখে ফেলার আগে আমরা চেষ্টা করবো যতটা সম্ভব দূর্গের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে।
লোকগুলো সামনে কামানের ঝলসানি দেখতে পায় এবং তাঁদের বুম শব্দ আর মাস্কেটের কড়াৎ আওয়াজের সাথে সাথে যুদ্ধের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ আর চিৎকারও তাঁদের কানে আসে। আঙ্গিনাটার উপর দিয়ে ধোয়া ভেসে যায় বিশেষ করে বিপরীত দিকে দেয়ালে অবস্থিত একটা বিশাল তোরণদ্বার দিয়ে ধোয়া প্রবেশ করছে। হুমায়ুন ভাবে এর মানে এই যে এই তোরণটা দিয়ে সরাসরি দূর্গের মূল অংশে প্রবেশ করা সম্ভব যেখানে দূর্গের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সৈন্যরা সমবেত হয়েছে। আমাদের লোকদের দুভাগে বিভক্ত হয়ে তোরণটার দুপাশে দাঁড়াতে বল এবং তারপরে শত্রুকে পেছন থেকে আক্রমণ করার পূর্বে আমরা তূর্যনিনাদ আর ঢাকের বোলে দূর্গের সামনের দেয়াল আক্রমণকারী আমাদের সাথী যোদ্ধাদের হুশিয়ার করে দেব, সে আদেশ দেয়। তার আদেশ দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং হুমায়ুন সংকেত দিতে তার লোকেরা তোরণদ্বারের দিকে ধেয়ে যায়। তোরণের এক কোণ থেকে চারপাশে উঁকি দিয়ে, হুমায়ুন ধোয়ার কুণ্ডলীর ভিতরেও সামনের দেয়ালে অবস্থিত কামানের অবস্থান দেখতে পায় এবং প্রতিরোধকারীরা সেই সাথে গুলিবর্ষণ করছে এবং ফুটন্ত আলকাতরা এবং তেল নীচে আক্রমণরত তার লোকদের উপরে ঢালছে।
তূর্যবাদক আর ঢাকির দল, সংকেত দিতে শুরু কর এবং আমি আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত দিতে থাকো। তোমাদের ভেতর বাকীরা, আমাকে অনুসরণ কর! বাদ্যযন্ত্র থেকে সংকেত প্রদান শুরু হবার সাথে সাথে হুমায়ুন তোরণ অতিক্রম করে ভেতরের দিকে ধেয়ে যায়। ভেতরে প্রবেশের সাথে সাথে, তাঁর তীরন্দাজদের বর্ষিত প্রথম পশলা তীর বেশীরভাগ গুজরাতির পিঠে বিদ্ধ হয়, একটা কামানের সব গোলন্দাজ একসাথে ভূপাতিত হয়। বিস্ময় আর বিভ্রান্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ প্রত্যাঘাতের চেষ্টা করে। অন্যদের দেখে মনে হয় তারা মনোবল হারিয়ে ফেলেছে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে আশ্রয়ের জন্য ভবনের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে শুরু করে।
মূল তোরণদ্বারের দিকে এগিয়ে চল। প্রতিরোধকারীদের হত্যা করে সেটা আমাদের সৈন্যদের জন্য খুলে দাও।
হুমায়ুনের লোকেরা তাঁর আদেশ পালন করতে ধেয়ে যায়, তাদের সামনে থাকে তার এক তূর্যবাদক, তখনও সে তাঁর আদেশ বাজিয়ে চলেছে। অবশ্য নিজের মৃত সাথীদের লাশের স্তূপের আড়াল থেকে এক গুজরাতি তীর নিক্ষেপ করলে সেটা তূর্যবাদকের কণ্ঠনালীতে বিদ্ধ হয় এবং সে মাটিতে পড়ে গেলে তাঁর শেষ নিঃশ্বাসের সাথে রক্তের বুদ্বুদ মিশে গিয়ে তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্র থেকে এক বিকট আর্তনাদ বের হয়ে আসে। সে যাই হোক, হুমায়ুন সাথে আহমেদ খান এবং কমপক্ষে পঞ্চাশজন লোক নিয়ে তোরণদ্বারে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে বা এর প্রতিরোধকারীদের পলায়নপর মনোবৃত্তিকে চাঙ্গা করে তুলে। তারা শীঘ্রই কপিকলের সাহায্যে মূল তোরণ খুলে দেয়। তোরণ-দ্বারের সিকি অংশ খোলা হতেই স্রোতের মতো মোগল সেনারা ভিতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। মোগলদের প্রবেশ করতে দেখে অবশিষ্ট প্রতিরোধকারীরা হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে পালাতে শুরু করে কিন্তু কয়েকজন দূর্গের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়ে হুমায়ুনের লোকদের উপরে নিয়মিত বিরতিতে গুলিবর্ষণ করতে থাকে, তাঁদের অনেকেই মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
আমাদের লোকদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে এসো। আমাদের আর প্রাণহানির ঝুঁকি নেয়ার প্রয়োজন নেই। দূর্গ এখন আমাদের দখলে। আমাদের হাতে ধৃত সবচেয়ে বরিষ্ঠ গুজরাতিকে আমার সামনে এনে হাজির কর।
অচিরেই, দীর্ঘদেহী, বিরলকেশ এক আধিকারিককে, যার হাত এবং পা থেকে তরবারির আঘাতজনিত ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে, টানতে টানতে হুমায়ুনের সামনে হাজির করে জোর করে নতজানু করা হয়। আমি বর্বর নই, হুমায়ুন তাঁকে বলে। আমি অনর্থক রক্তপাত করবো না। দূর্গের ভিতরে যারা অবস্থান করছে আপনি তাঁদের কাছে গিয়ে বলবেন তাঁদের এই প্রতিরোধ মূল্যহীন। তারা যদি এই মুহূর্তে আত্মসমর্থন করে তবে আমি পবিত্র কোরআন শরীফের নামে শপথ করে বলছি তাঁদের আমি প্রাণ ভিক্ষা দেব। যদি তাঁরা বাঁধা দেয়, সবাই মারা পড়বে, সেই সাথে আমি ইতিমধ্যে যাদের বন্দি করেছি তারাও বেঘোরো প্রাণ হারাবে।
হুমায়ুন বৃদ্ধ লোকটার চোখে একসাথে ভয় আর আশঙ্কা খেলা করতে দেখে। সে তাঁর কথা বিশ্বাস করেছে এবং তার অনুসারীদের বোঝাতে চেষ্টা করবে।
আপনি এবার যেতে পারেন। আপনাকে দশ মিনিট সময় দিলাম এর ভিতরে আপনাকে একটা উত্তর আনতে হবে।
হুমায়ুন তার লোকদের গুলিবর্ষণ বন্ধ করতে বলে যখন বৃদ্ধ আধিকারিক খোঁড়াতে খোঁড়াতে প্রতিরোধকারীদের সুরক্ষিত অবস্থানের দিকে গমন করে। আধিকারিককে চিনতে পেরে, প্রতিরোধকারীরা ঘুন্টি শোভিত ওক কাঠের ভারী দরজাটা খুলে দেয় এবং সে ভিতরে হারিয়ে যায়। পাঁচ মিনিট পরে সে পুনরায় দরজার কাছে হাজির হয় এবং স্থান পরিবর্তন করে হুমায়ুনের অবস্থানের দিকে আসে। তারা আত্মসমর্পন করতে রাজি আছে যদি তাদের ব্যক্তিগত অস্ত্র সাথে রাখতে দেয়া হয়।
