সুলতান, আমার মনে হয় আমি ওটা ধরতে পারবো এবং শেষ দূরত্বটুকু ওটা ব্যবহার করে বেয়ে উঠে যাব আর ওঠার সময়ে আমি কীলক গাঁথতে গাঁথতে যাব, আর আপনার চেয়ে আমার ওজন কম বলে আমাকেই চেষ্টাটা করতে হবে, এবং আমাকে মার্জনা করবেন, সুলতান- সেটা করতে হলে আমার সিঁড়ি হিসাবে আপনাকে আমার সাহায্য করতে হবে।
হুমায়ুন মাথা নাড়ে এবং শেষ কীলকগুলো ধরে নিজের দেহকে ডানপাশে কাত করে। সে অচিরেই আহমেদ খানের পায়ের ওজন নিজের বাম কাঁধে অনুভব করে, তারপরে তার গলার পাশে সেটা যন্ত্রণাদায়ক ভঙ্গিতে একবার পিছলে যায় এবং হঠাৎ ভরটা গায়েব হয়ে যায়। আহমেদ খান লতাগুল্মের ঝাড় ধরে ঝুলতে ঝুলতে, পাথরের গায়ে সজোরে কীলক ঢুকিয়ে দিচ্ছে ঝুলে থাকা শিলাস্তর ঘুরে উপরে পৌঁছাবার একটা রাস্তা তৈরী করতে। তারপরে সে ফাটলের শীর্ষে পৌঁছে যায়, হুমায়ুনের দিকে হাত নেড়ে সে যেভাবে এসেছে সেটা অনুসরণ করতে বলে, সে ঝুলে থাকা বাধা ঘুরে এবং দড়াবাজের ভঙ্গিমায় উপরে ওঠার সময়ে বহু কষ্টে চোখ বন্ধ করে রাখার প্রবণতা দমন করে। তারপরে সে হঠাৎ নিজেকে উপরে আবিষ্কার করে। জোরে জোরে হাঁফাতে থাকার কারণে সে ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না, হুমায়ুন কোনোমতে ফিসফিস করে বলে, আহমেদ খান, তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার সাহসিকতা আমার মনে থাকবে।
পরবর্তী আধঘন্টার ভিতরে যথেষ্ট সংখ্যক লোক ফাটলের দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে আসে, আসবার সময়ে তারা আরও বেশী সংখ্যক কীলক দেয়ালে প্রবিষ্ট করায় এবং দড়ির সাহায্যে চলনসই মই তৈরী করে, দূর্গ অভিমুখে অগ্রসর হবার জন্য অগ্রগামী দল গঠন করতে যারা পরবর্তীতে অনুসরণ করবে, তাদের জন্য উপরে ওঠাটা সহজ করতে। হুমায়ুন তাঁর পাশে সমবেত হওয়া প্রথম একশ জনের মতো লোকের উদ্দেশ্যে একটা ভাষণ দেয়। মনে রাখবে আমরা কোনো প্রকার শব্দ করবো না, এবং সেজন্য আমাদের পুরাতন নিরব আয়ুধের উপরে নির্ভর করবো তীর, ধনুক আর তরবারি- কোনো শত্রুকে খুঁজে পেলে খালি হাতে আমরা তাদের বধ করবো। একবার ভেতরে প্রবেশ করলে, তোমাদের ভিতরে যাঁরা তূর্য আর ঢাক বহন করছে, তাঁদের চারজনকে বাইরে থেকে আক্রমণরত আমাদের বাহিনীকে সতর্ক করতে পূর্বনির্ধারিত সংকেত ধ্বনি করতে আমি নির্দেশ দেব যার অর্থ আমরা ভেতরে প্রবেশ করেছি আর তাই এবার তারা তাদের আক্রমণ উদ্যোগ দ্বিগুন করতে পারে। আর এখন আমরা সবাই সামনে অগ্রসর হব।
ঝোপঝাড়ের আড়ালে অগ্রসর হয়ে, আঁধারের গা বেয়ে উঠে আসা লোকগুলো সন্তপনে আরও আধ মাইল এগিয়ে যাবার পরে ঝোপঝাড়ের আড়াল হাল্কা হয়ে আসে এবং সম্মুখে প্রায় এক হাজার গজ দূরত্বে দূর্গের পেছনের দেয়ালের দিকে তাদের অগ্রসর হতে আর কোনো বাধা থাকে না। সামনের আর পাশের দেয়ালের চেয়ে পেছনের দেয়ালটা অনেকটাই নীচু আর প্রহরীর কোনো চিহ্ন দৃশ্যমান হয় না। নীচু হয়ে বসে এবং অবশিষ্ট গুটিকয়েক ঝোপঝাড়ের আড়ালের সুযোগ নিয়ে আর চাঁদকে ঢেকে দিয়ে উড়ে যাওয়া মেঘের ফলে সৃষ্ট অন্ধকারে, আগন্তুক লোকগুলো মধ্যবর্তী খালি জমি দৌড়ে অতিক্রম করে নিজেদের দূর্গের দেয়ালের সাথে মিশিয়ে দেয়, তাঁদের নড়াচড়ার ফলে যদি কোনো শব্দ হয়েও থাকে তবে দূর্গের সামনের অংশ থেকে আগত যুদ্ধের হৈ-হট্টগোলে সেটা চাপা পড়ে যায়। আগন্তুক লোকগুলোর অনেকেই সাথে করে দড়ি নিয়ে এসেছে, এবং হুমায়ুনের একটা আদেশে, আহমেদ খান একটা দড়ির গোছা আকড়ে ধরে আর এক কোণে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে যেখানে ভূমির বাক বরাবর দেয়ালটা প্রায় সমকোণে বেঁকে গিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে, ফাটলের ভিতরে অনুসৃত কৌশল ব্যবহার করে সে দেয়ালের শীর্ষে পৌঁছে যায় এবং অন্যদের অনুসরণের জন্য নিজের হাতের দড়িটা নীচের দিকে ছুঁড়ে ফেলে। অচিরেই আরও কয়েকজন দড়ি নিয়ে উপরে উঠে আসে আর আরও বেশী সংখ্যক দড়ি ঝুলতে দেখা যায়।
হুমায়ুন নিজে দ্রুত সমতল দূর্গপ্রাকারে উঠে আসে এবং অন্যদের সাথে উঁকি দিয়ে দেখে পেছনে প্রহরীদের কোনো চৌকি আছে কিনা। হ্যাঁ, প্রহরীদের একটা চৌকি দেখা যায়- প্রায় একশ গজ দূরে অবস্থিত। সহসা সেটার দরজা খুলে যায় এবং মশাল হাতে সেখানে ছয়জন লোকের আবির্ভাব ঘটে- সম্ভবত ন্যূনতম সংখ্যক প্রহরী পেছনে রেখে বাকিরা সামনের দেয়ালে যোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে ছুটে গিয়েছে। হৈচৈ আর উত্তেজনার শব্দ শুনে বলা যায় যে সেখানে পূর্ণোদমে আক্রমণ করা হয়েছে। প্রহরীর দল নীচের দিকে দেখার জন্য দেয়ালের দিকে এগিয়ে আসে এবং, তারা যখন এগিয়ে আসছে হুমায়ুন তখন তাঁর তীরন্দাজদের আদেশ দেয় প্রহরীরা কোনো ধরনের হুশিয়ারী উচ্চারণ করার পূর্বেই যত দ্রুত সম্ভব তীর ছুঁড়তে। ফলায় মৃত্যুর শীষ বাজিয়ে প্রায় সাথে সাথে তীরের ঝাক বাতাসে ভাসে এবং হতভাগ্য ছয় প্রহরীকে বিদ্ধ করে, যে দেয়ালের উপর দিয়ে তাঁরা তাকিয়েছিল দুজন সেখান থেকে মাথা নীচের দিকে দিয়ে শূন্যে ভাসে, প্রাকারবেষ্টিত দূর্গের সমতল পাথরের ছাদে আরেকজনের পা যন্ত্রণায় মৃত্যুর বোল তুলে আছড়াতে থাকে, বাকি তিনজন কিছু বুঝে উঠার আগেই নিথর হয়ে যায়।
প্রহরীচৌকির দিকে হুমায়ুন আক্রমণ পরিচালনা করে। সে যখন সেখানে পৌঁছে, ভিতরে লুকিয়ে থাকা আরেক গুজরাতি ছিটকে বের হয়ে এসে মাত্র দশ গজ দূরে ছাদ দেয়া একটা সিঁড়ির দিকে দৌড়ে যায় যেটা নীচের আঙ্গিনার দিকে নেমে গিয়েছে। সে সিঁড়িটার এতত নিকটে যে তীর নিক্ষেপের আগেই সে এর রক্ষাকারী ছাদের নীচের নির্ভরতায় পৌঁছে যাবে। হুমায়ুন তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে লোকটার পিছু ধাওয়া করে, তার হাত পা দপদপ করতে থাকে, এবং প্রথম ধাপের কাছে পৌঁছে দেখে প্রহরীটা সিঁড়ির বিশটা বা কিছু কম বেশী হতে পারে- পাথুরে ধাপের বেশীরভাগই অতিক্রম করে নীচে নেমে গিয়েছে। চিন্তা করার জন্য সময় ক্ষেপন না করে, হুমায়ুন উপরের ধাপ থেকে প্রহরীকে লক্ষ্য করে লাফ দেয়, আর তাকে নীচের চাতালে আছড়ে ফেলে। পতনের কারণে দুজনেরই ফুসফুসের সব বাতাস বের হয়ে যায় কিন্তু প্রহরী লোকটাই প্রথমে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ায় আর পালাবার পায়তারা করে। হুমায়ুন শোয়া অবস্থা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে তাঁকে ধরতে যায় এবং পায়ের গোড়ালি ধরে তাকে আবারও মাটিতে পেড়ে ফেলে। কুস্তিগীর হিসাবে নিজের সমস্ত নৈপুণ্য প্রয়োগ করে সে পাগলের মতো হাত-পা ছুঁড়তে থাকা লোকটাকে নিজের নীচে এমন করে আটকায় যাতে বেচারা নড়তে না পারে, হুমায়ুন এবার লোকটার গলা আঙ্গুল দিয়ে আকড়ে ধরতে সমর্থ হয় এবং তার দেহ থেকে প্রাণবায়ু নিংড়ে বের করতে শুরু করে যতক্ষণ না সে লোকটার নিঃশ্বাস তার গলার কাছে এসে ঘড়ঘড় করতে না শোনে এবং তারপর অসাড় দেহটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। হুমায়ুনের লোকেরা পুনরায় তাকে ঘিরে অবস্থান গ্রহণ করে।
